×
ঢাকা, সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সাজ্জাদ বাহিনীর নেপথ্যে তিন প্রভাবশালী এমপির নাম

২০২৬ সেপ্টেম্বর ০৭ ১৫:৩০:৪৮
সাজ্জাদ বাহিনীর নেপথ্যে তিন প্রভাবশালী এমপির নাম

নিজস্ব প্রতিবেদক: বিদেশে পলাতক সাজ্জাদ আলী খান, যিনি ‘বড় সাজ্জাদ’ নামে পরিচিত। একসময় ইসলামী ছাত্রশিবিরের ‘দুর্ধর্ষ’ ক্যাডার হিসেবে পরিচিত এই ব্যক্তির বাহিনীর রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ। সম্প্রতি তার দুই অনুসারী পুলিশের কাছে দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তিন সংসদ সদস্য ও এক প্রভাবশালী নেতার নাম সামনে এসেছে বলে জানা গেছে।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, বড় সাজ্জাদ ও তার ঘনিষ্ঠ অনুসারীদের সঙ্গে এসব রাজনৈতিক ব্যক্তির পর্দার আড়ালের যোগাযোগ ছিল কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে। চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার (এসপি) মাসুদ আলমও বিষয়টি তদন্তের কথা নিশ্চিত করেছেন।

জাতীয় দৈনিক ‘আগামীর সময়’কে এসপি মাসুদ আলম বলেন, গ্রেপ্তার ডেভিড ইমন ও মোবারককে তাদের রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। স্থানীয় কোনো রাজনৈতিক সংগঠন বা নেতার সঙ্গে তাদের যোগাযোগ আছে কি না, জানতে চাওয়া হলেও তারা সুনির্দিষ্ট তথ্য দেয়নি। তবে পলাতক রায়হানের সঙ্গে একজন সংসদ সদস্যের ছবি ফেসবুকে রয়েছে। পুলিশ সেটি যাচাই করেছে। তার ভাষ্য, ছবি থাকা মানেই পরিচয়ের বেশি কিছু প্রমাণ করে না। মোবারক একসময় আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিল এবং ফটিকছড়ির তৈয়ব বাহিনীর হয়ে কাজ করত।

এসপি জানান, সাজ্জাদ বাহিনীর ভারী অস্ত্রগুলো উত্তর চট্টগ্রামের রাউজান, রাঙ্গুনিয়া, হাটহাজারী ও ফটিকছড়ির বিভিন্ন এলাকায় এবং নগরীর একাধিক গোপন আস্তানায় রাখা হয় বলে তথ্য পাওয়া গেছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গত দুই বছরে চট্টগ্রাম নগরী ও আশপাশের উপজেলায় অন্তত ৩০টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এর মধ্যে বাকলিয়ার জোড়া খুন এবং বর্তমান সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহকে গুলি করে আহত করার ঘটনা ও তার সঙ্গে থাকা সন্ত্রাসী সরোয়ার বাবলাকে হত্যাসহ ২৬টি ঘটনায় সাজ্জাদ বাহিনীর সম্পৃক্ততার তথ্য পেয়েছে পুলিশ। এসব ঘটনায় নির্দেশদাতা হিসেবে বড় সাজ্জাদের নাম এবং সহযোগী হিসেবে রায়হান, ডেভিড ইমন, মোবারক, বোরহান, দিদার ও হেলালসহ কয়েকজনের নাম এসেছে।

নগর পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির সময় তৎকালীন সিএমপি কমিশনার হাসিব আজিজ সাজ্জাদ বাহিনীর কর্মকাণ্ড এবং তাদের রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকদের বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন দিয়েছিলেন। বালুমহাল দখল এবং এলাকাভিত্তিক বিএনপি নেতাদের আধিপত্য ধরে রাখতে সাজ্জাদ বাহিনীর সদস্যদের ব্যবহারের তথ্যও ওই প্রতিবেদনে ছিল। তবে সংসদ নির্বাচনের আগে হওয়ায় বিষয়টি তখন আর সামনে এগোয়নি।

বর্তমানে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) প্রধান অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক হাসিব আজিজও বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছেন। তার ভাষ্য, বাকলিয়ার জোড়া হত্যাকাণ্ডের পর তিনি বালুমহাল বন্ধ করে দিয়েছিলেন। আসলাম চৌধুরীর অনুরোধ সত্ত্বেও বালু উত্তোলনের অনুমতি দেওয়া হয়নি। এরশাদ উল্লাহকে গুলি করার ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। তার মতে, নির্বাচন সামনে না থাকলে আড়ালে সন্ত্রাসীদের পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া ‘হোয়াইট-কলার’ রাজনীতিকদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া যেত।

আসলাম চৌধুরী বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য এবং চট্টগ্রাম-৪ আসন থেকে বিএনপির মনোনয়নে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। তবে খেলাপি ঋণসংক্রান্ত জটিলতায় উচ্চ আদালতের রায়ে তার সংসদ সদস্যপদ বাতিল হয়েছে। ৫ আগস্টের পর বাকলিয়ায় কর্ণফুলী নদীর বালুমহাল নিয়ন্ত্রণে তার ভূমিকা ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত সরোয়ার বাবলাকে তিনি বালুমহালের ব্যবসা দেখভালের কাজে ব্যবহার করতেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসলাম চৌধুরী বলেন, তিনি নিজে বালুমহাল লিজ নেননি। তার পরিচিত কয়েকজন ব্যক্তি আগের তুলনায় চার-পাঁচগুণ বেশি দামে সেগুলো ইজারা নিয়েছিলেন। তাদের জন্যই তিনি সিএমপি কমিশনারের সঙ্গে কথা বলেছিলেন।

সরোয়ার বাবলার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার বিষয়ে আসলাম চৌধুরী বলেন, কারাগারে তার সঙ্গে পরিচয় হয় এবং বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করে তাকে ভালো পথে আনার চেষ্টা করেছিলেন। বাবলা তাকে অনুসরণ করত এবং কারাগার থেকে বের হওয়ার পর তার ছবি ব্যবহার করে পোস্টারও ছাপিয়েছিল। তার দাবি, বালুমহালের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বাবলারও যোগাযোগ ছিল। তবে বালুমহালের ব্যবসার কারণে তাকে হত্যা করা হয়েছে বলে তিনি মনে করেন না; এর পেছনে রাজনৈতিক কারণ থাকতে পারে বলে তার ধারণা।

নিহত সরোয়ার বাবলার পরিবারের সদস্যরাও বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। প্রকাশ্যে তাকে হত্যার ঘটনায় পরিবারের পক্ষ থেকে দুই সংসদ সদস্যকে দায়ী করা হয়েছে। তাদের একজন ছাত্রজীবনে চট্টগ্রামের একটি স্কুলে সাজ্জাদের সহপাঠী ছিলেন বলে জানা গেছে।

সরোয়ার বাবলা হত্যা নিয়ে সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহর বক্তব্য জানতে তার সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি সরাসরি সাক্ষাৎ ছাড়া এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি। পরদিন সকালে চট্টগ্রামে দেখা করার কথা বলা হলেও তিনি জানান, ওই সময় তিনি চট্টগ্রামে থাকবেন না। যদিও দুপুর ১২টার দিকে তাকে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে ডিআইজি প্রিজনের কার্যালয়ের সামনে দেখা যায়।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, সরোয়ার বাবলাকে মাথায় অস্ত্র ঠেকিয়ে গুলি করেছিলেন সন্ত্রাসী রায়হান আলম। এদিকে চট্টগ্রাম-৬ আসনের সংসদ সদস্য গিয়াসউদ্দিন কাদের চৌধুরীর পাশে দাঁড়ানো একটি ছবি রায়হান নিজের ফেসবুকের কভার ফটো হিসেবে ব্যবহার করেছেন। বিষয়টি পুলিশের নজরেও এসেছে।

গিয়াসউদ্দিন কাদের চৌধুরী বিএনপির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, কেউ দেখা করতে এসে পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তুললে তার দায় তার ওপর বর্তায় না। রায়হানকে তিনি চেনেন না এবং তার পরিচয় সম্পর্কেও কিছু জানেন না। তার দাবি, শুধু একটি ফেসবুক ছবির ভিত্তিতে প্রতিটি ঘটনার পর তাকে প্রশ্ন করা যৌক্তিক নয়। পুলিশকে তিনি বলেছেন, তার ও রায়হানের মোবাইল ফোন ট্র্যাক করা হয়। তাদের মধ্যে কখনো কোনো যোগাযোগের প্রমাণ পাওয়া গেলে তিনি তার জবাব দেবেন।

এদিকে সাজ্জাদ বাহিনীর শীর্ষ সদস্য ডেভিড ইমন ও মোবারককে ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। মোবারক রাউজানে যুবদল নেতা মাসুদুল হক চৌধুরীকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যার কথা আদালতে স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন। পুলিশ জানিয়েছে, ডেভিড ইমন ও মোবারক দুজনই দাবি করেছেন, একজন সংসদ সদস্যের নির্দেশে রায়হান ওই হত্যার পরিকল্পনা করেন এবং রায়হানের নির্দেশেই তারা তা বাস্তবায়ন করেন।

মাসুদুল হক চৌধুরীর বড় ভাই পেয়ারুল হক চৌধুরীর অভিযোগ, অর্থের বিনিময়ে রায়হানকে ভাড়া করে তার ভাইকে হত্যা করা হয়েছে। রায়হান গ্রেপ্তার হলে হত্যার নেপথ্যে কে ছিলেন, তা জানা যাবে বলে তিনি মনে করেন। প্রভাবশালী কারও নাম এলেও ছাড় দেওয়া হবে না বলে প্রশাসন তাদের আশ্বস্ত করেছে বলে জানান তিনি। রাঙ্গুনিয়ার এমপি হুম্মাম কাদের চৌধুরী তাদের সহযোগিতা করছেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

এসপি মাসুদ আলম জানান, রায়হানকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে বিদেশে থাকা সাজ্জাদকে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়েও কাজ করছে পুলিশ। তার ভাষ্য, সাজ্জাদ নিজের নাম পরিবর্তন করেছে এবং তার আগের পাসপোর্টও নেই। পুলিশ এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করছে।

নগর পুলিশের কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ভারতে থাকা সাজ্জাদ ২০১১ সালে নিজের নাম পরিবর্তন করে মোহাম্মদ আবদুল্লাহ নামে নতুন পাসপোর্ট করেন। ওই পাসপোর্টে তার বাবা-মায়ের নামও পরিবর্তন করে হাজি শুক্কুর ও হাজি জাহানারা বেগম উল্লেখ করা হয়। স্থায়ী ঠিকানা হিসেবে বরিশালের গৌরনদী উপজেলার সাহাজিরা গ্রামের ঠিকানা ব্যবহার করা হয়েছিল। সূত্র: আগামীর সময়।

এসআলম/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

জাতীয় এর সর্বশেষ খবর

জাতীয় - এর সব খবর



রে