×
ঢাকা, শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বিয়ের জন্য পাত্রী না পেয়ে ৬ মাসে ২৯ পুরুষের আত্মহত্যা

২০২৬ সেপ্টেম্বর ০৫ ১৮:৪৬:৫৭
বিয়ের জন্য পাত্রী না পেয়ে ৬ মাসে ২৯ পুরুষের আত্মহত্যা

নিজস্ব প্রতিবেদক : ভারতের মহারাষ্ট্রের জলগাঁও জেলায় চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ৩৮৩ জন পুরুষ আত্মহত্যা করেছেন। মহারাষ্ট্র পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, এসব ঘটনার মধ্যে ২৯টিতে বিয়ের জন্য পাত্রী না পাওয়ার বিষয়টি কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

গত ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত এসব তথ্য সংগ্রহ করা হয়। তবে বিয়ে না হওয়াকে এসব আত্মহত্যার একমাত্র কারণ হিসেবে দেখছে না পুলিশ। মাদকাসক্তি, হতাশা, পারিবারিক সমস্যা, ঋণসহ নানা ধরনের চাপও আত্মহত্যার ঘটনাগুলোতে ভূমিকা রেখেছে।

২৯টি ঘটনায় বিয়ের বিষয়টি সামনে আসার পর জলগাঁওয়ে শুরু হয়েছে আলোচনা। প্রশ্ন উঠেছে—শুধু পাত্রী না পাওয়াই কি এসব মৃত্যুর কারণ, নাকি এর পেছনে রয়েছে আরও গভীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকট?

জলগাঁওয়ের বিভিন্ন গ্রামে তরুণ, তাদের পরিবার, নারী এবং বিষয়টি নিয়ে গবেষণা করা বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে উঠে এসেছে জটিল এক চিত্র। সেখানে বিয়ে এখন শুধু ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের বিষয় নয়। চাকরি, আয়, জমি, বাড়ি, জাতি, পারিবারিক দায়িত্ব, অভিবাসন এবং নারী-পুরুষের বদলে যাওয়া প্রত্যাশা—সবকিছুই বিয়ের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছে।

জলগাঁওয়ের ৩০ বছর বয়সী অধ্যাপক বিশাল পাতিল জানান, তার পরিবারও চান তিনি বিয়ে করুন। তবে তিনি আপাতত ক্যারিয়ার ও আর্থিক স্বাবলম্বিতাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।

তার মতে, ভারতীয় সমাজে বিয়ের একটি ‘উপযুক্ত বয়স’ নিয়ে প্রচলিত ধারণা রয়েছে। অনেকেই মনে করেন, ২৪ থেকে ২৬ বছর বা সর্বোচ্চ ২৮-২৯ বছরের মধ্যে বিয়ে হয়ে যাওয়া উচিত।

বিশাল পাতিল বলেন, বয়স ৩০ পেরিয়ে গেলে অবিবাহিত ব্যক্তিকে নিয়ে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে শুরু করে। অনেক সময় বিয়ে না হওয়ার পেছনে ওই ব্যক্তির কোনো ‘খামতি’ রয়েছে—এমন ধারণাও তৈরি হয়।

মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাউন্সেলিং করা মুকেশের মতে, বিয়েকে যখন সামাজিক মর্যাদা ও ব্যক্তিগত সাফল্যের সঙ্গে যুক্ত করা হয়, তখন দীর্ঘদিন অবিবাহিত থাকা কিছু তরুণের কাছে নিজের ব্যর্থতা হিসেবে মনে হতে পারে।

তবে জলগাঁও পুলিশের হিসাবে, বিয়ে-সংক্রান্ত সমস্যা থাকলেও এসব আত্মহত্যার পেছনে অন্যান্য কারণও থাকতে পারে।মহারাষ্ট্রের জনসংখ্যাগত চিত্রও বিষয়টিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

২০১৯ থেকে ২০২১ সালের ন্যাশনাল ফ্যামিলি হেলথ সার্ভে-৫ অনুযায়ী, মহারাষ্ট্রে ২০ থেকে ৪৯ বছর বয়সী প্রায় ১১ শতাংশ নারী অবিবাহিত। পুরুষদের ক্ষেত্রে এই হার প্রায় ৩০ শতাংশ।

অর্থাৎ একই বয়সসীমায় মহারাষ্ট্রে অবিবাহিত পুরুষের হার নারীদের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।

তবে এই ব্যবধানের জন্য শুধু নারী-পুরুষের সংখ্যাগত ভারসাম্যকে দায়ী করা যায় না। অর্থনৈতিক সক্ষমতা, শিক্ষা, চাকরি, সামাজিক অবস্থান, জাতি এবং বিয়ের ক্ষেত্রে পরিবারের প্রত্যাশাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

জলগাঁওয়ের কৌস্তুভ পোটদারের ঘটনাটি এ ক্ষেত্রে একটি উদাহরণ হিসেবে সামনে এসেছে।বি-ফার্ম ডিগ্রি শেষ করে নাসিকের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন কৌস্তুভ। মায়ের মৃত্যুর পর পরিবার তার বিয়ের জন্য পাত্রী খুঁজতে শুরু করে। কিন্তু নিজের বাড়ি না থাকা এবং সরকারি চাকরি না থাকার কারণে একাধিক পাত্রীপক্ষের কাছ থেকে প্রত্যাখ্যাত হন তিনি।

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে আত্মহত্যা করেন কৌস্তুভ।তবে তার ঘটনা দিয়ে সব বিয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের কারণ ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। বরং এটি দেখায়, কিছু ক্ষেত্রে পাত্রের চাকরি, আয় ও পারিবারিক আর্থিক অবস্থান বিয়ের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

জলগাঁওয়ের এক প্রবীণ নারী জানান, তার ৪০ বছর বয়সী ছেলের জন্য দীর্ঘদিন ধরে পাত্রী খোঁজা হচ্ছে। বারবার প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর তিনি এখন ছেলের জন্য একটি পাকা বাড়ি তৈরি করছেন।তার আশা, বাড়ি তৈরি হলে ছেলের জন্য পাত্রী পাওয়া সহজ হবে।

মহারাষ্ট্রের গ্রামীণ সমাজ নিয়ে গবেষণা করা ময়ূর কুডুপলে ও জোয়েল কাবালিয়ানের গবেষণাতেও বিয়ের ক্ষেত্রে পরিবর্তিত প্রত্যাশার বিষয়টি উঠে এসেছে।

গবেষক ময়ূর কুডুপলের মতে, একসময় গ্রামে পাত্রের কত জমি আছে, সেটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা। এখন অনেক ক্ষেত্রে জমির চেয়ে পাত্রের চাকরি আছে কি না এবং নিয়মিত আয় কত—সেটিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

গ্রামীণ অর্থনীতির পরিবর্তনের সঙ্গে বিয়ের প্রত্যাশাও বদলেছে। নিয়মিত আয়, কর্মসংস্থান, শহরে থাকার সুযোগ এবং নিজের বাড়ি এখন অনেক পরিবারের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

অর্থনৈতিক পরিবর্তনের পাশাপাশি জাতি ও উপজাতিভিত্তিক সামাজিক কাঠামোও বিয়ের ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখছে।

ময়ূর কুডুপলের মতে, অনেক পরিবার এখনো নিজেদের জাতি বা উপজাতির মধ্যেই পাত্র-পাত্রীর খোঁজ করে। ফলে সম্ভাব্য জীবনসঙ্গীর পরিধি অনেক ক্ষেত্রে সীমিত হয়ে যায়।

লিঙ্গ সমতা প্রশিক্ষক দর্শনা পাওয়ারের মতে, কোনো পুরুষ আন্তঃজাতি বিয়েতে আগ্রহী হলেও পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়স্বজন সেই সম্পর্ক মেনে নেবেন কি না, সেটি বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।

জলগাঁওয়ের কিছু পুরুষের অভিযোগ, বিয়ে নিয়ে নারীদের প্রত্যাশা আগের তুলনায় বেড়েছে। তাদের দাবি, অনেক নারী এখন চাকরি, শহরে বসবাস এবং আর্থিকভাবে স্থিতিশীল পুরুষকে জীবনসঙ্গী হিসেবে চান।

তবে নারীদের সঙ্গে কথা বলে ভিন্ন বাস্তবতাও সামনে এসেছে।দর্শনা পাওয়ার বলেন, স্বামীর সঙ্গে কথা বলা, একসঙ্গে সময় কাটানো বা পারস্পরিক বোঝাপড়ার প্রত্যাশা কোনো অস্বাভাবিক দাবি নয়। বরং এগুলো একটি সুস্থ দাম্পত্য সম্পর্কের স্বাভাবিক প্রত্যাশা।

তার মতে, নারীদের প্রত্যাশা বদলালেও অনেক ক্ষেত্রে সেগুলো প্রকাশ করার স্বাধীনতা এখনো সীমিত।

জলগাঁওয়ের বিভিন্ন গ্রামে বিয়ে নিয়ে কথা বলার সময় অনেক পুরুষ ক্যামেরার সামনে আসতে চাননি। একজন যুবক এমনকি বলেছেন, ক্যামেরার সামনে নিজের কথা বললে হয়তো কেউ তাকে বিয়ে করতে চাইবে না।

দীর্ঘদিন ধরে ছেলের জন্য পাত্রী খুঁজেও সফল না হওয়ায় অনেক পরিবার এখন বিয়ের জন্য চাপ দেওয়া কমিয়ে দিয়েছে। আবার কেউ কেউ বাড়ি তৈরি করছেন, জমি কিনছেন বা ছেলের আয় বাড়ানোর চেষ্টা করছেন।

অনেকে ঘটকের ওপর নির্ভর করছেন। তবে কিছু পরিবারের অভিযোগ, বিয়ের ব্যবস্থা করে দেওয়ার নামে প্রতারণার ঘটনাও ঘটছে।পাত্রী খুঁজতে কেউ কেউ মহারাষ্ট্রের অন্য এলাকাতেও যাচ্ছেন। এমনকি কিছু পরিবার পাত্রী পাওয়ার জন্য অর্থ খরচ করতেও রাজি হচ্ছে।

ফলে প্রচলিত আত্মীয়স্বজনের গণ্ডি পেরিয়ে বিয়ের বাজারে এখন মধ্যস্বত্বভোগী, অর্থের লেনদেন এবং দূরবর্তী এলাকায় পাত্র-পাত্রীর সন্ধানের মতো বিষয়ও যুক্ত হয়েছে।

লিঙ্গ সমতা প্রশিক্ষক দর্শনা পাওয়ার আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেছেন। তার মতে, কয়েক দশক ধরে কন্যাভ্রূণ হত্যার যে প্রবণতা ছিল, তার প্রভাব এখন বিবাহযোগ্য বয়সের প্রজন্মে দেখা যেতে পারে।

তার বক্তব্য অনুযায়ী, বর্তমানে ৩০ থেকে ৩৫ বছর বয়সী যেসব পুরুষ জীবনসঙ্গী খুঁজে পাচ্ছেন না, তাদের একটি অংশ এমন সময়ে জন্মেছেন যখন ছেলে সন্তানের প্রতি পক্ষপাতের কারণে অনেক কন্যাভ্রূণ নষ্ট করা হয়েছিল।

তবে মেয়ের সংখ্যা কমে যাওয়াকে সরাসরি নারীদের বেশি ক্ষমতাবান হয়ে যাওয়ার প্রমাণ হিসেবে দেখা যায় না। গবেষকদের মতে, পারিবারিক প্রত্যাশা, জাতি ও সামাজিক কাঠামো এখনো নারীদের বিয়ের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে।

সব মিলিয়ে জলগাঁওয়ের পরিস্থিতি দেখাচ্ছে, বিয়ের সংকটকে শুধু ‘পাত্রী পাওয়া যাচ্ছে না’—এভাবে ব্যাখ্যা করলে বিষয়টির পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না।

এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে জনসংখ্যাগত ভারসাম্য, চাকরি ও আয়, জমি ও বাড়ি, জাতিগত বাধা, পারিবারিক প্রত্যাশা এবং নারী-পুরুষের বদলে যাওয়া দৃষ্টিভঙ্গি।বিশাল পাতিলের কথায়, ‘বিয়েই জীবনের সবকিছু নয়।’

মানসিক চাপ বা হতাশা তীব্র হয়ে উঠলে একা না থেকে পরিবার, বন্ধু বা বিশ্বস্ত মানুষের সঙ্গে কথা বলা এবং প্রয়োজনে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সহায়তা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। আত্মহত্যার চিন্তা দেখা দিলে দ্রুত স্থানীয় জরুরি সেবা বা পেশাদার সহায়তার সঙ্গে যোগাযোগ করা উচিত।

মুসআব/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

আন্তর্জাতিক এর সর্বশেষ খবর

আন্তর্জাতিক - এর সব খবর



রে