×
ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ইউক্রেনকে পেছনে ফেলে খেলাপি ঋণে বিশ্বসেরা বাংলাদেশ!

২০২৬ সেপ্টেম্বর ০৩ ১৭:৩০:৪১
ইউক্রেনকে পেছনে ফেলে খেলাপি ঋণে বিশ্বসেরা বাংলাদেশ!

নিজস্ব প্রতিবেদক : ক্রমেই ভয়াবহ আকার ধারণ করছে দেশের খেলাপি ঋণের পরিস্থিতি। ব্যাংক থেকে বিতরণ করা প্রতি ১০০ টাকা ঋণের প্রায় ৩৩ টাকাই এখন খেলাপি। পরিস্থিতি এতটাই নাজুক যে, খেলাপি ঋণের হারের দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বে শীর্ষস্থানে উঠে এসেছে। পেছনে ফেলেছে যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেনকেও।

এর আগে বিশ্বে সবচেয়ে বেশি খেলাপি ঋণের হার ছিল ইউক্রেনে। তবে পুরোনো খেলাপি ঋণ অবলোপন, ঋণ আদায় এবং ভালো মানের নতুন ঋণ বাড়ানোর মাধ্যমে দেশটি এই হার দ্রুত কমিয়েছে। বিপরীতে বাংলাদেশে আগে আড়ালে থাকা অনিয়মিত ও বেনামি ঋণ খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হওয়ায় ব্যাংক খাতের প্রকৃত চিত্র সামনে এসেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, ২০২৬ সালের জুন শেষে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। এটি ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা মোট ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ।

২০২৬ সালের মার্চ শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ মাত্র তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা।

এর আগে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে দেশে খেলাপি ঋণ রেকর্ড ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকায় উঠেছিল।

খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, বর্তমান খেলাপি ঋণের বড় অংশ হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। বিগত সরকারের সময়ে দীর্ঘদিন ধরে ঋণ পুনঃতফসিল, বিশেষ ছাড় এবং হিসাবগত পরিবর্তনের মাধ্যমে অনেক সমস্যাগ্রস্ত ঋণ নিয়মিত হিসেবে দেখানো হয়েছিল।

রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ব্যাংকগুলোর সম্পদের মান পর্যালোচনা এবং দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানের নিরীক্ষায় অনিয়ম, জালিয়াতি ও বেনামি ঋণের প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে শুরু করে। ফলে আগে আড়ালে থাকা বিপুল পরিমাণ ঋণ এখন খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।

সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় রয়েছে একীভূত হওয়া পাঁচটি ব্যাংক। এসব ব্যাংকের বিতরণ করা ঋণের ৮০ শতাংশের বেশি খেলাপি। এ ছাড়া সরকারি-বেসরকারি আরও কয়েকটি ব্যাংকের অর্ধেকের বেশি ঋণ খেলাপিতে পরিণত হয়েছে।

রাজনৈতিক প্রভাবে দেওয়া ভুয়া ও বেনামি ঋণ, দুর্বল তদারকি, ব্যবসায়িক মন্দা এবং জ্বালানি সংকটও খেলাপি ঋণ বাড়ার পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

খেলাপি ঋণের উচ্চহার কমাতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এরই মধ্যে ঋণ শ্রেণীকরণ ও সঞ্চিতি সংরক্ষণের নিয়ম আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা হয়েছে। পাশাপাশি দুর্বল ব্যাংকগুলোর সম্পদের মান পর্যালোচনা করা হচ্ছে এবং কয়েকটি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করা হয়েছে। চালু করা হয়েছে ঝুঁকিভিত্তিক তদারকিও।

এসব পদক্ষেপের ফলে আগে নিয়মিত হিসেবে দেখানো অনেক সমস্যাগ্রস্ত ঋণ এখন খেলাপি হিসেবে শনাক্ত হচ্ছে।

পরিস্থিতি থেকে বের হতে ঋণখেলাপিদের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের ছাড়ও দেওয়া হচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, ঋণ অবলোপন বা পুনঃতফসিলের মাধ্যমে কাগজে-কলমে খেলাপি ঋণ কমানো সম্ভব হলেও এতে প্রকৃত পাওনা আদায় হয় না। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)ও সতর্ক করেছে, কঠোর শ্রেণীকরণনীতি ও সম্পদের মান পর্যালোচনার ফলে সামনে আরও খেলাপি ঋণ বেরিয়ে আসতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিস্থিতির টেকসই সমাধানের জন্য ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের সম্পদ জব্দ করে অর্থ আদায়, দ্রুত মামলা নিষ্পত্তি, ব্যাংকের পরিচালনা ও ঋণ অনুমোদনে রাজনৈতিক প্রভাব বন্ধ এবং নতুন করে খারাপ ঋণ সৃষ্টি ঠেকানো জরুরি।

তাদের মতে, এসব পদক্ষেপ ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে মধ্যমেয়াদে খেলাপি ঋণ কমানো সম্ভব। তবে আবারও নির্বিচারে ঋণ পুনঃতফসিল ও বিশেষ সুবিধা দেওয়া হলে খেলাপি ঋণের হার সাময়িকভাবে কমলেও ব্যাংক খাতের মূল সমস্যার সমাধান হবে না।

মুসআব/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

অর্থনীতি এর সর্বশেষ খবর

অর্থনীতি - এর সব খবর



রে