ঢাকা, মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সাংবাদিকদের ‘গোপন বৈঠক’ নিয়ে যা বললেন উপদেষ্টা ডা. জাহেদ

২০২৬ সেপ্টেম্বর ০১ ১৪:০১:৩৬
সাংবাদিকদের ‘গোপন বৈঠক’ নিয়ে যা বললেন উপদেষ্টা ডা. জাহেদ

নিজস্ব প্রতিবেদক: চীন থেকে জে-১০ যুদ্ধবিমান কেনার পরিকল্পনার কারণ ব্যাখ্যা করেছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। তিনি বলেছেন, চীনের কাছ থেকে যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়টি সরকারের হঠাৎ নেওয়া কোনো সিদ্ধান্ত নয়; বরং এটি সরকারের সুনির্দিষ্ট প্রতিরক্ষা পরিকল্পনার অংশ। আধুনিক মাল্টিরোল ফাইটার কেনার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও চীনের বিভিন্ন বিকল্প পর্যালোচনা করার পর বাংলাদেশের জন্য চীনের বিকল্পটি তুলনামূলকভাবে সুবিধাজনক মনে হয়েছে।

মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়ে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন তিনি।

জাহেদ উর রহমান বলেন, একই ধরনের সক্ষমতা ও কার্যকারিতা সম্পন্ন যুদ্ধবিমান তুলনামূলকভাবে কম খরচে কেনার সুযোগ রয়েছে। বিভিন্ন দিক বিবেচনা করে হিসাব করলে চীনের যুদ্ধবিমান কেনার ক্ষেত্রে ব্যয় অন্য কিছু বিকল্পের তুলনায় অর্ধেকেরও কম হতে পারে। এমনকি কোনো কোনো হিসাব অনুযায়ী খরচ প্রায় এক-তৃতীয়াংশের কাছাকাছি নেমে আসতে পারে।

বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর বর্তমান সক্ষমতার বিষয়টিও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা। তিনি বলেন, দেশের সবচেয়ে আধুনিক যুদ্ধবিমানগুলোর মধ্যে থাকা মিগ-২৯ এখন খুব অল্পসংখ্যক রয়েছে এবং সেগুলোর সবগুলোও পুরোপুরি কার্যকর অবস্থায় নেই। অন্যদিকে বিমানবাহিনীর বহরে থাকা এফ-৭ যুদ্ধবিমানগুলো বেশ পুরোনো। ফলে ভবিষ্যতের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা ধরে রাখতে আধুনিক যুদ্ধবিমান যুক্ত করার প্রয়োজন রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, আধুনিক মাল্টিরোল ফাইটার কেনার বিষয়টি বাংলাদেশের ‘ফোর্সেস গোল’-এর মধ্যেই রয়েছে। অর্থাৎ এটি কোনো আকস্মিক সিদ্ধান্ত নয়; দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরক্ষা পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই আধুনিক যুদ্ধবিমান সংগ্রহের বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।

যুদ্ধবিমান কেনার ক্ষেত্রে অতীতের অভিজ্ঞতা থেকেও সরকার সতর্ক রয়েছে বলে জানান জাহেদ উর রহমান। তিনি বলেন, অতীতে মিগ-২৯ কেনার সময় দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল এবং এ নিয়ে মামলা ও নানা ধরনের ঘটনা ঘটেছিল। এবার যুদ্ধবিমান কেনার প্রক্রিয়ায় যাতে কোনো ধরনের অনিয়ম বা দুর্নীতির সুযোগ না থাকে, সে বিষয়ে সরকার সতর্ক থাকবে।

তার বক্তব্য অনুযায়ী, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনার ক্ষেত্রে শুধু সক্ষমতা ও দাম নয়, ক্রয়প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতাও গুরুত্বপূর্ণ। সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে যাতে অতীতের বিতর্কের পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সতর্ক থাকতে হবে।

বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নতুন করে বোয়িং বিমান কেনার চুক্তি হয়েছে কি না—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা বলেন, সরকার এখনো এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি। ফলে সরকারের পক্ষ থেকে এ নিয়ে মন্তব্য করার সুযোগ নেই।

তিনি বলেন, যদি এ ধরনের কোনো চুক্তি হয়ে থাকে, তাহলে সরকারই যথাসময়ে তা জানাবে। এ ধরনের চুক্তি গোপন রাখার কোনো বিষয় নয়। সরকার কোনো চুক্তি করলে সেটি অবশ্যই প্রকাশ করা হবে।

প্রেস ব্রিফিংয়ে জনস্বাস্থ্যসংক্রান্ত আরেকটি উদ্যোগের কথাও জানান জাহেদ উর রহমান। ভোজ্যতেলে ভিটামিন ডি যুক্ত করার প্রস্তাবকে তিনি ‘চমৎকার আইডিয়া’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তার কাছে জানানো হয়েছে, একটি গবেষণায় কক্সবাজারের জেলেদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষের শরীরে ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি পাওয়া গেছে। অথচ জেলেরা দীর্ঘ সময় সূর্যের আলোতে কাজ করেন।

তিনি জানান, প্রতি লিটার ভোজ্যতেলে ভিটামিন ডি যুক্ত করতে আনুমানিক ৬৭ পয়সা অতিরিক্ত খরচ হতে পারে। পাশাপাশি প্যাকেজিংয়েও কিছু পরিবর্তনের প্রয়োজন হতে পারে। বিষয়টি দ্রুত বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হবে বলেও জানান তিনি।

বাংলাদেশ এরই মধ্যে ভোজ্যতেলে ভিটামিন এ এবং লবণে আয়োডিন ফোর্টিফিকেশন করেছে উল্লেখ করে জাহেদ উর রহমান বলেন, এসব উদ্যোগের মাধ্যমে ভিটামিন এ ও আয়োডিনের ঘাটতি মোকাবিলায় সুফল পাওয়া গেছে। একইভাবে ভোজ্যতেলে ভিটামিন ডি যুক্ত করা গেলে তা জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হলে আইনের ভিত্তি প্রয়োজনসাংবাদিকদের কোনো কর্মকাণ্ডকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করে তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি ব্যবস্থা নিতে হলে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আইন থাকা প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন জাহেদ উর রহমান। তিনি বলেন, কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই তাকে অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। আইন ও প্রমাণের ভিত্তিতেই ব্যবস্থা নিতে হবে।

সাংবাদিকদের একাংশ সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মানবতাবিরোধী অপরাধের সহযোগী হিসেবে ভূমিকা রেখেছে—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যাদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধে সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে এবং সেই অভিযোগের আওতায় নেওয়ার মতো তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে, তাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার চলছে। কয়েকজন সাংবাদিকও ইতোমধ্যে এ ধরনের মামলায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন বলে জানান তিনি।

জাহেদ উর রহমান বলেন, শেখ হাসিনার সরকারের বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগগুলোর একটি ছিল সেখানে ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয়নি এবং অনেক ক্ষেত্রে আইনের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এমনকি কিছু আইন থাকলেও সেগুলো পরিকল্পিতভাবে খারাপভাবে ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তাই বর্তমান সরকার বা ভবিষ্যতের কোনো গণতান্ত্রিক সরকারের আমলে যেন কেউ অন্যায়ের শিকার না হন, সেটি নিশ্চিত করা জরুরি।

সাংবাদিকদের একটি অংশের বিরুদ্ধে গোপন বৈঠক বা ষড়যন্ত্রের অভিযোগ রয়েছে—এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, কোনো গোপন বৈঠক হয়েছে কি না, সেটি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর দেখার বিষয়। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যাহত হতে পারে এমন কোনো তৎপরতা হলে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।

সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও নির্যাতনের ঘটনায় আলাদা ‘সাংবাদিক সুরক্ষা আইন’ প্রয়োজন কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, হামলা বা নির্যাতনের ঘটনায় প্রচলিত আইনেই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। নতুন আইন করা যেতে পারে, তবে শুধু নতুন আইন প্রণয়ন করলেই সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে—এমন নয়।

তার মতে, যেখানে সাংবাদিকদের ওপর হামলা বা নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে, সেসব ঘটনার বিচার বিদ্যমান আইনেই অব্যাহত রাখা উচিত। আইনের যথাযথ প্রয়োগই সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপায়।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাংস্কৃতিক কর্মীদের নাম অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে জাহেদ উর রহমান তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কারও নাম নিয়ে অনুমাননির্ভর আলোচনা না করার আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, প্রধান প্রসিকিউটর কোনো সাংস্কৃতিক কর্মীর সম্পৃক্ততার বিষয়ে প্রাথমিক তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছেন। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ বা চার্জ গঠন না হওয়া পর্যন্ত কারও নাম প্রকাশ করা ঠিক নয়।

তার ভাষ্য, শুধু আলোচনায় বা সেনসেশন তৈরির জন্য কারও নাম প্রকাশ করা উচিত নয়। কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তদন্তের মাধ্যমে তা যাচাই করতে হবে। তদন্তের পর আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ বা চার্জ গঠন করা হলে তখন গণমাধ্যমে বিষয়টি প্রকাশ করা যেতে পারে।

সব মিলিয়ে, সচিবালয়ের প্রেস ব্রিফিংয়ে প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানো থেকে শুরু করে যুদ্ধবিমান কেনাকাটায় স্বচ্ছতা, বোয়িং কেনার সম্ভাব্য চুক্তি, ভোজ্যতেলে ভিটামিন ডি যুক্ত করা, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা এবং তদন্তাধীন ব্যক্তিদের নাম প্রকাশ—বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সরকারের অবস্থান তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা।

মুসআব/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

জাতীয় এর সর্বশেষ খবর

জাতীয় - এর সব খবর



রে