ঢাকা, শুক্রবার, ৫ জুন ২০২৬

তারপর মৃত্যুপুরীতে পরিণত হলো সাহারা মরুভূমি

২০২৬ জুন ০৫ ১৯:৩৪:৫০
তারপর মৃত্যুপুরীতে পরিণত হলো সাহারা মরুভূমি

নিজস্ব প্রতিবেদক: আফ্রিকার বিশাল সাহারা মরুভূমিতে ঘটে গেল এক হৃদয়বিদারক মানবিক বিপর্যয়। নাইজারের প্রত্যন্ত মরু অঞ্চলে একটি ট্রাক বিকল হয়ে যাওয়ার পর তীব্র গরম, পানিশূন্যতা এবং খাদ্যের অভাবে অন্তত ৫০ জনের মৃত্যু হয়েছে। মরুভূমির উত্তপ্ত বালুর মধ্যে আটকে পড়া এসব যাত্রী কয়েকদিন ধরে বেঁচে থাকার লড়াই চালালেও শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর কাছে হার মানেন।

তবে এই ভয়াবহ ঘটনার মধ্যে অলৌকিকভাবে প্রাণে বেঁচে গেছেন দুজন। তাদের সাহসিকতা ও বেঁচে থাকার সংগ্রামের কারণেই সামনে আসে পুরো ট্র্যাজেডির ঘটনা।

ফরাসি সংবাদমাধ্যম ফ্রান্স ২৪–এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিহতরা প্রতিবেশী দেশ মালি থেকে একটি মুসলিম ধর্মীয় উৎসব পালন শেষে নিজ গন্তব্যে ফিরছিলেন।

যাত্রাপথে নাইজার-আলজেরিয়া সীমান্তের কাছাকাছি সাহারা মরুভূমির গভীরে তাদের বহনকারী ট্রাকটি হঠাৎ বিকল হয়ে পড়ে। ঘটনাস্থলটি ছিল আসামাকা শহর থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার পশ্চিমে, যেখানে জনবসতি ও সহায়তা পাওয়ার সুযোগ প্রায় নেই বললেই চলে।

স্থানীয় প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ট্রাক বিকল হওয়ার পর চালক, সহকারী এবং যাত্রীরা মিলে গাড়িটি মেরামতের চেষ্টা করেন। কিন্তু বারবার চেষ্টা করেও তারা সফল হননি।

একপর্যায়ে তাদের সঙ্গে থাকা পানির মজুত শেষ হয়ে যায়। সাহারা মরুভূমির ভয়ংকর তাপমাত্রা, শুষ্ক বাতাস এবং পানির অভাবে যাত্রীরা দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়েন।

গভর্নর কার্যালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, ‘সেখানে বেঁচে থাকার মতো কোনো পরিবেশ ছিল না। পানির উৎস ছিল না, আশ্রয়ের ব্যবস্থা ছিল না এবং সাহায্য চাওয়ারও কোনো উপায় ছিল না।’

সবাই যখন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছিলেন, তখন দুই যাত্রী শেষ চেষ্টা হিসেবে মরুভূমি পায়ে হেঁটে পার হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, তারা প্রায় ৫০ কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে অতিক্রম করেন। প্রচণ্ড গরমের মধ্যে দীর্ঘ সময় হাঁটার পর তারা একটি পানির উৎস খুঁজে পান, যা তাদের প্রাণ বাঁচাতে সাহায্য করে।

পরে তারা আসামাকা শহরে পৌঁছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে পুরো ঘটনার কথা জানান। এরপরই উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়।বেঁচে ফেরা দুই ব্যক্তির দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে উদ্ধারকারী দল মরুভূমির নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে ৫০ জনের মরদেহ উদ্ধার করে।

প্রতিকূল পরিবেশ এবং দূরবর্তী অবস্থানের কারণে নিহতদের মরদেহ অন্যত্র নেওয়া সম্ভব হয়নি। ফলে প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে মরুভূমিতেই তাদের গণকবর দেওয়া হয়।

স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, এটি সাম্প্রতিক সময়ে ওই অঞ্চলের অন্যতম ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়।বিশেষজ্ঞদের মতে, সাহারা মরুভূমির এই অংশ বহু বছর ধরে আফ্রিকা থেকে ইউরোপগামী মানুষের অন্যতম প্রধান রুট হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

নাইজার, মালি, চাদ, সুদানসহ বিভিন্ন দেশের মানুষ উন্নত জীবনের আশায় এই পথ ধরে উত্তর আফ্রিকার দিকে যাত্রা করেন। অনেক সময় মানব পাচারকারী চক্রও এই রুট ব্যবহার করে থাকে।

তবে তীব্র গরম, দীর্ঘ জলশূন্য পথ, ধূলিঝড় এবং দুর্গম পরিবেশের কারণে প্রায়ই এখানে দুর্ঘটনা ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটে।

বিশ্লেষকদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সাহারা অঞ্চলে তাপমাত্রা আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে মরুভূমি অতিক্রম করা আগের চেয়ে আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠছে।

পর্যাপ্ত পানি, যোগাযোগ ব্যবস্থা কিংবা জরুরি উদ্ধার সুবিধা না থাকায় যেকোনো যান্ত্রিক ত্রুটি বা দুর্ঘটনা মুহূর্তেই বড় ধরনের প্রাণহানির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

সাম্প্রতিক এই ঘটনা আবারও প্রমাণ করল, পৃথিবীর অন্যতম কঠিন পরিবেশ সাহারা মরুভূমিতে সামান্য একটি দুর্ঘটনাও কয়েক ডজন মানুষের প্রাণ কেড়ে নিতে পারে।

ওমর আলী/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

আন্তর্জাতিক এর সর্বশেষ খবর

আন্তর্জাতিক - এর সব খবর



রে