×
ঢাকা, রবিবার, ৮ নভেম্বর ২০২৬

২০৩০ সালে দুবাইয়ের পতন, ইয়েমেন হবে নতুন দুবাই 

২০২৬ নভেম্বর ০৮ ১২:৪০:৫৯
২০৩০ সালে দুবাইয়ের পতন, ইয়েমেন হবে নতুন দুবাই 

নিজস্ব প্রতিবেদক: ২০২৪ সালে দুবাই ১ কোটি ৮৭ লাখ আন্তর্জাতিক পর্যটক বরণ করে রেকর্ড গড়েছে এবং আয় করেছে প্রায় ২৫৭ বিলিয়ন দিরহাম। মরুভূমির বুকে হাজার হাজার কোটি টাকা ঢেলে কৃত্রিম সমুদ্র, পাহাড় আর বরফের পার্ক বানিয়ে গড়ে তোলা এই নগরীকে আপাতদৃষ্টিতে অপরাজেয় মনে হলেও ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা ভিন্ন এক চিত্র তুলে ধরছেন। দুবাই থেকে মাত্র দুই হাজার কিলোমিটার দূরে অবস্থিত যুদ্ধবিধ্বস্ত ইয়েমেনের মধ্যেই লুকিয়ে আছে দুবাই ও সৌদি আরবের মতো ধনী দেশগুলোর অর্থনৈতিক একচেটিয়া রাজত্ব ভেঙে দেওয়ার মতো প্রকাণ্ড সম্ভাবনা। আর সে কারণেই কি এক দশকেরও বেশি সময় ধরে এক প্রকার ইচ্ছে করেই যুদ্ধে বন্দি করে রাখা হয়েছে ইয়েমেনকে?সোকোত্রা: প্রকৃতির আসল স্বর্গ ও কৃত্রিম পর্যটনের ভবিষ্যৎ

দুবাই যখন বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ করে মরুভূমিতে কৃত্রিম সৌন্দর্য তৈরি করছে, ইয়েমেনের রয়েছে ‘সোকোত্রা’ (Socotra) নামক এক অনন্য দ্বীপ।

২০০৮ সালে ইউনেস্কো এটিকে বিশ্ব ঐতিহ্য ঘোষণা করে। নাসা এই দ্বীপকে আখ্যায়িত করেছে ‘পৃথিবীর বাইরের দ্বীপ’ হিসেবে।

এই দ্বীপে ৮২৫ প্রজাতির উদ্ভিদ রয়েছে, যার ৩৭ শতাংশই পৃথিবীর আর কোথাও জন্মায় না (যেমন বিখ্যাত ‘ড্রাগন ব্লাড ট্রি’)। এছাড়া ৯০ শতাংশ সরীসৃপ ও ৯৫ শতাংশ শামুকের প্রজাতি কেবল এখানেই বিদ্যমান।

আধুনিক পর্যটকরা যখন কৃত্রিম বিলাসিতার চেয়ে প্রাকৃতিক ও অনাবিল অভিজ্ঞতাকে প্রাধান্য দিচ্ছেন, তখন সোকোত্রা উন্মুক্ত হলে দুবাইয়ের আকাশচুম্বী মূল্যের কৃত্রিম পর্যটন বাজার বড় ধরনের ধাক্কা খাবে।

বাব আল-মান্দেব: বিশ্ব বাণিজ্যের লাইফলাইন

ইয়েমেনের ভৌগোলিক অবস্থান বৈশ্বিক অর্থনীতির সবচেয়ে স্পর্শকাতর পয়েন্টে অবস্থিত।

ইয়েমেনের নিয়ন্ত্রণাধীন মাত্র ২৯ কিলোমিটার চওড়া ‘বাব আল-মান্দেব’ (Bab el-Mandeb) প্রণালী দিয়ে বিশ্বের প্রায় ৭ থেকে ১৪ শতাংশ সামুদ্রিক বাণিজ্য পরিচালিত হয়, যার বাৎসরিক মূল্য প্রায় ৭০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

প্রতিদিন এই পথ দিয়ে প্রায় ৯৩ লাখ ব্যারেল তেল পরিবাহিত হতো (যদিও হুতিদের সাম্প্রতিক সংঘাতের পর তা কমে প্রায় ৪১-৪২ লাখ ব্যারেলে দাঁড়িয়েছে)।

এই পথ বন্ধ হলে জাহাজগুলোকে পুরো আফ্রিকা মহাদেশ ঘুরে (উত্তমাশা অন্তরীপ দিয়ে) ইউরোপে যেতে হয়, যা ১৪ দিন অতিরিক্ত সময় এবং প্রতি জাহাজে প্রায় ১০ লাখ ডলার অতিরিক্ত খরচ বাড়িয়ে দেয়।

সিঙ্গাপুর বা পানামার মতো ইয়েমেন যদি স্থিতিশীল হয়ে এই পথে আন্তর্জাতিক টোল আদায় শুরু করে, তবে দুবাইয়ের বিখ্যাত ‘জাবেল আলী’ বন্দরের বাণিজ্যিক একচ্ছত্র আধিপত্য হুমকির মুখে পড়বে।

সৌদি আরবের ‘ভিশন ২০৩০’ এবং ইয়েমেন ভীতি

সৌদি আরব ২০৩০ সালের মধ্যে তেলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে পর্যটন খাতের মাধ্যমে অর্থনীতি পুনর্গঠনের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে।

রিয়াদ তাদের ‘ভিশন ২০৩০’ অর্জনে ৫০০ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে লোহিত সাগরের উপকূলে ‘নিওম’ (NEOM) মেগাসিটি ও বিলাসবহুল রিসোর্ট তৈরি করছে।

সৌদি আরব যা কৃত্রিমভাবে বানাচ্ছে, ইয়েমেনের লোহিত সাগর ও আরব সাগর উপকূলে তা প্রকৃতিগতভাবেই রয়েছে। ইয়েমেনে যদি দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে বিশ্ব পর্যটকরা সৌদির ব্যয়বহুল কৃত্রিম রিসোর্টের চেয়ে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা ইয়েমেনকেই বেছে নেবে। ফলে সৌদির শত শত কোটি ডলারের বিনিয়োগ ঝুঁকিতে পড়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।

তেলের খনি ও পরাশক্তিদের বাণিজ্য সংঘাত (ডলার বনাম ইউয়ান)

ইয়েমেনের মারিব প্রদেশে রয়েছে বিশাল তেলের খনি, যেখানে প্রমাণিত তেলের মজুত প্রায় ৩০০ কোটি ব্যারেল এবং আরও কয়েকশ কোটি ব্যারেলের সম্ভাবনা রয়েছে।

ভূরাজনীতির ছক: হুতিরা ইরানের প্রভাব বলয়ে থাকায় এবং লোহিত সাগরের ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখায় পশ্চিমা ও ইসরায়েলি জাহাজগুলো সরাসরি আক্রান্ত হচ্ছে।

চীনের কৌশল: বাব আল-মান্দেব প্রণালীর মাত্র ৩০ কিলোমিটার দূরে জিবুতিতে সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করেছে চীন। একটি শান্ত ও অনুগত ইয়েমেন পেলে বেইজিং দেশটিতে বন্দর ও অবকাঠামো তৈরি করবে এবং আন্তর্জাতিক তেল বাণিজ্যে মার্কিন ডলারের পরিবর্তে চীনা ‘ইউয়ান’ চালুর পথ সুগম করবে।

যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান: ডলারের বৈশ্বিক আধিপত্য ধরে রাখতে এবং আন্তর্জাতিক নৌপথের ওপর নিয়ন্ত্রণ কায়েম রাখতে ওয়াশিংটন কখনোই ইয়েমেনে চীনা প্রভাব মেনে নেবে না। ফলে স্থানীয় গৃহযুদ্ধটি মূলত বিশ্ব পরাশক্তিদের অর্থনৈতিক প্রভাব বিস্তারের ছায়াযুদ্ধে রূপ নিয়েছে।

বাংলাদেশের লাভ-ক্ষতির সমীকরণ

ইয়েমেনের এই ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েন সরাসরি বাংলাদেশের অর্থনীতিকেও প্রভাবিত করে:

১. তৈরি পোশাক ও শিপিং খরচ: চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ইউরোপমুখী জাহাজগুলো এই বাব আল-মান্দেব প্রণালী দিয়েই যায়। পথটি নিরাপদ ও শান্ত থাকলে বাংলাদেশি রপ্তানিপণ্যের পরিবহন খরচ প্রায় ২০ শতাংশ কমে যেতে পারে, যা বছরে হাজার কোটি টাকার সাশ্রয় ঘটাবে।

২. শ্রমবাজারের বিকল্প: মধ্যপ্রাচ্যের কফলা প্রথার কঠোর নিয়মে বর্তমানে প্রায় এক কোটি বাংলাদেশি কর্মরত আছেন। স্থিতিশীল ইয়েমেনের অর্থনৈতিক পুনর্গঠন শুরু হলে সেখানে উন্মুক্ত ও মানবিক নিয়মে লাখ লাখ দক্ষ ও অদক্ষ শ্রমিকের নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে।

ইয়েমেন কোনো নিঃস্ব বা ক্ষমতাহীন মরুভূমি নয়; বরং এটি প্রাকৃতিক সম্পদ, কৌশলগত জলপথ ও তেলের এক বিপুল ভাণ্ডার। মধ্যপ্রাচ্যের কৃত্রিম ধনী দেশগুলোর অর্থনৈতিক শ্রেষ্ঠত্ব টিকিয়ে রাখা এবং বৈশ্বিক পরাশক্তিদের মুদ্রা ও বাণিজ্যের আধিপত্য রক্ষার দ্বন্দ্বে আজও বলি হচ্ছে দেশটির আড়াই কোটি সাধারণ মানুষ। ইয়েমেনের সংকট কেবল একটি রাজনৈতিক যুদ্ধ নয়, এটি বিশ্ব অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার এক গভীর ভূরাজনৈতিক খেলা।

মুসআব/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

আন্তর্জাতিক এর সর্বশেষ খবর

আন্তর্জাতিক - এর সব খবর

উ
প
রে