×
ঢাকা, সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬

আইএফআইসি ব্যাংকের ১৩ হাজার কোটি টাকা লোপাট

২০২৬ অক্টোবর ২৬ ০৬:৪২:২৭
আইএফআইসি ব্যাংকের ১৩ হাজার কোটি টাকা লোপাট

নিজস্ব প্রতিবেদক: ভুয়া নাম, নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠান ও প্রভাবশালী মহলের ছত্রচ্ছায়ায় শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংক খাতের প্রতিষ্ঠান আইএফআইসি ব্যাংক থেকে বেরিয়ে গেছে ১৩ হাজার ১৬৬ কোটি টাকা। গত ১৫ বছরে ২৮টি প্রতিষ্ঠানের নামে নেওয়া এই বিপুল ঋণের এক টাকাও এখন ফেরত আসেনি, যার পুরোটাই বর্তমানে খেলাপি হয়ে পড়েছে।

প্রকৃত ঋণগ্রহীতার পরিচয় আড়াল করে আত্মীয়, কর্মচারী, ভুয়া কোম্পানি ও সহযোগী প্রতিষ্ঠানের নামে দেওয়া এসব ঋণের পরিমাণ ব্যাংকটির মোট খেলাপি ঋণের প্রায় অর্ধেক। আইএফআইসি ব্যাংকের বিশেষ নিরীক্ষায় উঠে এসেছে, এই ঋণ কেলেঙ্কারির সঙ্গে ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যান ও তৎকালীন সরকারের প্রভাবশালী নীতিনির্ধারক সালমান এফ রহমানের সরাসরি সংশ্লিষ্টতার তথ্য।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, একই ব্যাংক থেকে বিতর্কিত ব্যবসায়ী নজরুল ইসলাম মজুমদারের মালিকানাধীন নাসা গ্রুপ নিয়েছে ১ হাজার ৩ ৩৩ কোটি টাকা এবং জয়নুল হক সিকদারের সিকদার গ্রুপ নিয়েছে ১ হাজার ৫৭ কোটি টাকা।

এমন চরম অনিয়ম ও অনাস্থার পরিস্থিতিতে ২০২৪ সালের ৪ সেপ্টেম্বর সালমান এফ রহমানের নিয়ন্ত্রিত পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়ে নতুন বোর্ড গঠন করেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে দেড় বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই সুশাসনের ঘাটতি, আর্থিক সূচকের অবনতি ও অনিয়ম নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হওয়ায় সেই বোর্ডের ওপর আবারও পর্যবেক্ষক বসিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

বর্তমানে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি, মূলধন ঘাটতি ও বড় অঙ্কের লোকসানে চরম আর্থিক চাপে রয়েছে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত এই ব্যাংকটি। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ব্যাংকের লুকানো বা নিয়মিতভাবে প্রদর্শিত পুরোনো খেলাপি ঋণগুলো পুনরায় শ্রেণিবিন্যাস করায় খেলাপি ঋণের পরিমাণে বড় ধরনের উল্লম্ফন দেখা দিয়েছে। ২০২৫ অর্থবছর শেষে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৭ হাজার ২৫০ কোটি ৫০ লাখ টাকা, যা মোট ঋণ ও অগ্রিমের ৬১ দশমিক ৪৭ শতাংশ। একই সময়ে ব্যাংকটির মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪ হাজার ৭ ৯৯ কোটি টাকা এবং বছর শেষে কর-পরবর্তী নিট লোকসান দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৫৬১ কোটি ৭০ লাখ টাকা।

আইএফআইসি ব্যাংকের ২০২৫ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদন ও নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী, ২০২৪ অর্থবছর শেষে খেলাপি ঋণ ছিল ২৪ হাজার ৫৮৫ কোটি ৬০ লাখ টাকা। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ২ হাজার ৬৬৫ কোটি টাকা। ব্যাংক কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, কয়েকটি বড় ঋণ হিসাবের মানের অবনতির কারণে খেলাপি ঋণ অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় ঋণ আদায়, শ্রেণীকৃত ঋণ নিয়মিত করা ও বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির মাধ্যমে ঋণ পুনরুদ্ধারের চেষ্টা চালানো হচ্ছে।

ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রক মূলধনের চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২৫ অর্থবছর শেষে নিয়ন্ত্রক মূলধন ছিল ১ হাজার ৬৪ কোটি ৩০ লাখ টাকা, যার বিপরীতে প্রয়োজনীয় মূলধন ছিল ৫ হাজার ৮৬৩ কোটি ২০ লাখ টাকা। ফলে মূলধন পর্যাপ্ততার হার (CRAR) ২০২৪ সালের ৭ দশমিক ২৭ শতাংশ থেকে কমে ২০২৫ সালে ১ দশমিক ৮২ শতাংশে নেমে এসেছে, যা বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত ১০ শতাংশ হারের চেয়ে অনেক নিচে। বড় অঙ্কের লোকসান এবং সম্পদের মানের অবনতির কারণেই মূলধনের ভিত্তি এভাবে দুর্বল হয়েছে।

আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী, ২০২৫ অর্থবাজেটে ব্যাংকটির সুদ আয় হয়েছে ২ হাজার ২১০ কোটি ২১ লাখ টাকা, যা আগের বছর ছিল ৪ হাজার ১৪ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। বিপরীতে আমানত ও ঋণের জন্য আমানতকারীদের সুদ বাবদ মেটাতে হয়েছে ৪ হাজার ৪ ১৯ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। ফলে নিট সুদ ক্ষতি দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ২০৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা। এছাড়া ২০২৫ সালে ব্যাংকটির পরিচালন লোকসান হয়েছে ২ হাজার ৩৬৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা এবং শেয়ারপ্রতি লোকসান ৫৩ পয়সা থেকে একলাফে বেড়ে দাঁড়ায় ১৩ টাকা ৩৩ পয়সায়।

অন্যান্য নিরীক্ষা তথ্যে উঠে এসেছে বিপুল সঞ্চিতি (প্রভিশন) ঘাটতির কথা। ব্যাংকটির সাধারণ সঞ্চিতির প্রয়োজন ছিল ২ হাজার ৭০১ কোটি ৬২ লাখ টাকা, কিন্তু সংস্থান করা ছিল ২ হাজার কোটি টাকার কিছুটা বেশি, যার ফলে ৬৯৫ কোটি ৯১ লাখ টাকার সঞ্চিতি ঘাটতি রয়ে যায়। এছাড়া অন্যান্য ব্যাংকে রাখা মেয়াদি আমানত ও অফ-ব্যালান্স শিট দায়ের বিপরীতে সঞ্চিতি ঘাটতি রয়েছে আরও ৩০০ কোটি টাকার বেশি।

তবে বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৬ সালের ৩০ এপ্রিল বিশেষ নির্দেশনার মাধ্যমে এবি ব্যাংকে রাখা অর্থসহ নির্দিষ্ট কিছু ঋণ ও আমানতের বিপরীতে প্রায় ২ হাজার ১৫৮ কোটি টাকা সঞ্চিতি সমন্বয় না করেই ২০২৫ অর্থবছরের আর্থিক বিবরণী চূড়ান্ত করার বিশেষ অনুমতি দেয়।

আইএফআইসি ব্যাংকের নথি থেকে জানা যায়, নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের নামে ব্যাংকটি থেকে সবচেয়ে বেশি ঋণ নিয়েছে শ্রীপুর টাউনশিপ, যার ঋণের স্থিতি ১ হাজার ২৫ কোটি ৯২ লাখ টাকা। বেনামি ঋণের তালিকায় পরবর্তী শীর্ষ স্থানগুলোতে রয়েছে আসাদ ট্রেডিং অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (৭৩৩ কোটি ৩২ লাখ), গ্লোয়িং কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (৭২৩ কোটি ৭৯ লাখ), কুইক রিয়েল এস্টেট (৬৮৫ কোটি ৪২ লাখ), সানস্টার বিজনেস (৬৭৪ কোটি ৫৫ লাখ), ফারইস্ট বিজনেস (৬৭৪ কোটি ৪৯ লাখ), কসমস কমোডিটিজ (৬৭২ কোটি ২০ লাখ), ব্লুমুন ট্রেডিং (৬৬৬ কোটি ৩৯ লাখ), আলফা এন্টারপ্রাইজ (৬৫৫ কোটি ১৪ লাখ), অ্যাক্সিস বিজনেস (৬৪৪ কোটি ২৪ লাখ), এভারেস্ট এন্টারপ্রাইজ (৬০৫ কোটি ২৮ লাখ), স্কাইমার্ক ইন্টারন্যাশনাল (৬০৪ কোটি ৭০ লাখ), ভিস্তা ইন্টারন্যাশনাল (৫২১ কোটি ৩ লাখ) এবং অ্যাবসোলিউট কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (৫০৬ কোটি ৪১ লাখ টাকা)।

এছাড়াও সার্ভ কনস্ট্রাকশন, অলট্রন ট্রেডিং, নর্থস্টোন কনস্ট্রাকশন, টিমবিল্ড কনস্ট্রাকশন, সেন্ট্রাল ল্যান্ড অ্যান্ড বিল্ডিংস, সৃষ্টি রিয়েল এস্টেট, ক্রিস্টাল কনস্ট্রাকশন, গ্লোবাল এলপিজি, এলহাম ফ্যাশন, রাজ হাউজিং, ব্রাইটস্টার বিজনেস, সেন্ট্রাল হাইটস ঢাকা, নিউ ঢাকা ইন্ডাস্ট্রিজ ও এলহাম ইন্টারন্যাশনালের নামে শত শত কোটি টাকার খেলাপি ঋণ ঝুলে রয়েছে, যা ব্যাংকটির সামগ্রিক অবস্থানকে চরম ঝুঁকিতে ফেলেছে।

এসউদ্দিন/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর

উ
প
রে