×
ঢাকা, শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬

ট্রাম্পের ভরসায় বড় ভুল করলেন সালমান

২০২৬ অক্টোবর ২৪ ১৬:৩৫:০২
ট্রাম্পের ভরসায় বড় ভুল করলেন সালমান

নিজস্ব প্রতিবেদক: মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে বাড়তে থাকা সামরিক উত্তেজনা সৌদি আরবের নিরাপত্তা, আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য এবং যুক্তরাষ্ট্রের কৌশল নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠীর ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা, সৌদি আরবকে সহায়তায় যুক্তরাজ্যের সামরিক পদক্ষেপ এবং ইরানকে ঘিরে ওয়াশিংটনের কঠোর অবস্থান—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।

বিশ্লেষণধর্মী আলোচনায় প্রশ্ন উঠছে, সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষা কতটা কার্যকর, পশ্চিমা সামরিক সহায়তা কতটা নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনা আঞ্চলিক সংঘাতকে আরও বিস্তৃত করবে কি না।

সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের নেতৃত্বে দেশটি অর্থনৈতিক ও সামাজিক রূপান্তরের উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। ভিশন ২০৩০-এর মাধ্যমে তেলনির্ভরতা কমানো, পর্যটন ও অন্যান্য খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং অর্থনীতিকে বহুমুখী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব সৌদি নীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

কিন্তু দেশটির গুরুত্বপূর্ণ শহর, জ্বালানি অবকাঠামো ও বিমানবন্দরকে লক্ষ্য করে হামলার হুমকি এসব পরিকল্পনার জন্য নিরাপত্তাজনিত চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার আশঙ্কা শুধু সামরিক প্রতিরক্ষার বিষয় নয়; বিনিয়োগকারীদের আস্থা, জ্বালানি সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগের ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে।

২৪ অক্টোবরের এক প্রতিবেদনে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠীর ছোড়া দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তাইফ ও ইয়ানবুর দিকে যাওয়ার পথে প্রতিহত করার কথা জানিয়েছে। এর আগে সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলার দাবিও সামনে আসে। তবে সব হামলার দাবি সৌদি কর্তৃপক্ষ স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করেনি।

সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষা জোরদার করতে যুক্তরাজ্য নতুন সামরিক সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে। ২০ অক্টোবর ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, রয়্যাল এয়ার ফোর্সের টাইফুন যুদ্ধবিমান সৌদি শহর ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো রক্ষায় প্রতিরক্ষামূলক অভিযান পরিচালনা করবে।

এ ছাড়া সামরিক সরঞ্জাম পরিবহনে এ৪০০এম পরিবহন বিমান এবং সৌদি সামরিক কর্মকর্তাদের সহায়তায় ব্রিটিশ সামরিক উপদেষ্টা দেওয়ার কথাও জানানো হয়েছে। এর আগে সৌদি আরবের প্রতিরক্ষায় আকাশ প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও আকাশে জ্বালানি সরবরাহের সহায়তা দেওয়া হচ্ছিল।

তবে ব্রিটিশ সরকার যুদ্ধবিমানগুলো কতটি হবে, তা আনুষ্ঠানিক ঘোষণায় নির্দিষ্ট করেনি। তাই ১২টি টাইফুন পাঠানোর দাবি নিশ্চিত তথ্য হিসেবে উল্লেখ করা যাচ্ছে না। যুক্তরাজ্য বলেছে, বিমানগুলো প্রতিরক্ষামূলক দায়িত্ব পালন করবে; হুতিদের বিরুদ্ধে ইয়েমেনে সরাসরি আক্রমণ চালানো তাদের ঘোষিত মিশনের অংশ নয়।

এই সহায়তা সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও অন্যান্য আকাশপথের হুমকি মোকাবিলায় কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে হামলার ধরন, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সমন্বয় এবং পরিস্থিতির পরিবর্তনের ওপর।

মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র তার নাগরিকদের নিরাপত্তা নিয়ে সতর্ক করেছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ২২ জুলাইয়ের বৈশ্বিক সতর্কবার্তায় মধ্যপ্রাচ্যের জটিল নিরাপত্তা পরিস্থিতি, সম্ভাব্য বিমান চলাচল বিঘ্ন এবং আকস্মিক উত্তেজনা বৃদ্ধির আশঙ্কার কথা বলা হয়েছিল।

এ ছাড়া ২৩ অক্টোবরের গোয়েন্দা মূল্যায়নের ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি কূটনৈতিক মিশনে কর্মীসংখ্যা কমানোর পদক্ষেপ নিয়েছে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জর্ডান, লেবানন, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে মার্কিন কূটনৈতিক মিশনে কর্মীসংখ্যা কমানো হয়েছে। এ পদক্ষেপের পেছনে মার্কিন কর্মীদের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য হুমকির উদ্বেগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে এ তথ্য থেকে সরাসরি সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না যে যুক্তরাষ্ট্র নিশ্চিতভাবে বড় ধরনের নতুন সামরিক অভিযান শুরু করতে যাচ্ছে। নিরাপত্তা সতর্কতা ও কূটনৈতিক কর্মীসংখ্যা কমানোর সিদ্ধান্ত সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলার ব্যবস্থাও হতে পারে।

ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নীতি মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক। ইরানের সামরিক সক্ষমতা, আঞ্চলিক মিত্রগোষ্ঠী এবং মার্কিন স্বার্থের ওপর সম্ভাব্য হুমকি নিয়ে দুই দেশের নিরাপত্তা উদ্বেগ রয়েছে। অন্যদিকে ইরানও মার্কিন সামরিক উপস্থিতি ও ইসরায়েলের পদক্ষেপকে নিজের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখে।

এই পারস্পরিক অবিশ্বাসের কারণে সরাসরি সামরিক সংঘাতের পাশাপাশি গোয়েন্দা তৎপরতা, নিষেধাজ্ঞা, কূটনৈতিক চাপ ও সীমিত সামরিক পদক্ষেপের বিষয়গুলোও আলোচনায় থাকে।

তবে ইরানের শীর্ষ রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে হত্যা অভিযান চালানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যৌথভাবে নির্দিষ্ট পরিকল্পনা করছেন—এমন দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে এ ধরনের দাবিকে নিশ্চিত সামরিক কৌশল হিসেবে উপস্থাপন করা সমীচীন নয়।

মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা দীর্ঘস্থায়ী হলে এর প্রভাব জ্বালানি বাজার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বিমান চলাচল এবং সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনের ওপর পড়তে পারে। বিশেষ করে লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব প্রণালির নিরাপত্তা বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

যুক্তরাজ্যও জানিয়েছে, উপসাগরীয় অঞ্চলে সহিংসতা বৃদ্ধি পেলে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়া এবং ব্যবসার ব্যয় বাড়ার মতো প্রভাব তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে ইয়েমেনের বেসামরিক জনগণের মানবিক পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা জোরদার করা, পশ্চিমা দেশগুলোর সামরিক সহায়তা, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনা এবং কূটনৈতিক উদ্যোগ—সবগুলো বিষয়ই গুরুত্বপূর্ণ। তবে এসব পদক্ষেপের ভিত্তিতে বড় ধরনের যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী বলে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।

পরিস্থিতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে হামলা ও পাল্টা হামলার মাত্রা, আঞ্চলিক দেশগুলোর অবস্থান এবং কূটনৈতিক আলোচনার অগ্রগতির ওপর। সামরিক উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন মধ্যপ্রাচ্যের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

মুয়াজ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

আন্তর্জাতিক এর সর্বশেষ খবর

আন্তর্জাতিক - এর সব খবর

উ
প
রে