×
ঢাকা, শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬

জাপানি বিনিয়োগে নতুন দিগন্ত, গাড়ি উৎপাদনের পথে বাংলাদেশ

২০২৬ অক্টোবর ২৩ ২০:৪২:০৩
জাপানি বিনিয়োগে নতুন দিগন্ত, গাড়ি উৎপাদনের পথে বাংলাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেক: জাপানের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর করা, বাংলাদেশের রপ্তানি সম্প্রসারণ এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণকে অগ্রাধিকার দিয়ে টোকিও সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আগামী ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবরের এ সফরে দুই দেশের অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) বাস্তবায়নের অগ্রগতি, তৈরি পোশাক রপ্তানি বৃদ্ধি এবং বাংলাদেশে টয়োটার গাড়ি উৎপাদন কারখানা স্থাপনের সম্ভাবনা বিশেষ গুরুত্ব পাবে। পাশাপাশি অবকাঠামো, জ্বালানি, প্রযুক্তি, কৃষি ও দক্ষ জনশক্তি উন্নয়নেও সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব (এফটিএ-১ অধিশাখা) মো. ফিরোজ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ইপিএ কার্যকর হলে জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণের সুযোগ বাড়বে। আগামী সংসদ অধিবেশনে চুক্তিটি অনুমোদন হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ সামনে রেখে এ চুক্তিকে দুই দেশের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা হিসেবে দেখছে সরকার। প্রধানমন্ত্রীর সফরে ইপিএ বাস্তবায়নের বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, চুক্তির সুবিধা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ বাড়ানো সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। আগামী ২৭ অক্টোবর জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৈঠকে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পাশাপাশি কৃষি, জ্বালানি, প্রযুক্তি, দক্ষ জনশক্তি এবং চলমান উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে আলোচনা হতে পারে।

বাংলাদেশে টয়োটার গাড়ি কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা

প্রধানমন্ত্রীর সফরে জাপানি গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টয়োটার বাংলাদেশে উৎপাদন কারখানা স্থাপনের উদ্যোগ বিশেষ গুরুত্ব পেতে পারে। গত ৬ অক্টোবর টয়োটা তসুশো করপোরেশনের ভাইস চেয়ারম্যান ইচিরো কাশিতানির নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করে বাংলাদেশে গাড়ি উৎপাদনের কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা জানায়। প্রতিষ্ঠানটি ২০২৭ সালে একটি অর্থনৈতিক অঞ্চলে হাইব্রিড বৈদ্যুতিক গাড়ির কারখানা স্থাপনের কাজ শুরু করার পরিকল্পনা করছে।

কারখানাটি বাস্তবায়িত হলে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি ভবিষ্যতে বিদেশে গাড়ি রপ্তানির সুযোগও তৈরি হতে পারে। ইপিএর আওতায় জাপানি গাড়ির যন্ত্রাংশসহ বিভিন্ন শিল্পপণ্যে শুল্কসংক্রান্ত সুবিধা এবং বিনিয়োগের নিয়ম সহজ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে জাপানি গাড়ি বাংলাদেশের শুল্কমুক্ত আমদানির তালিকায় না থাকায় স্থানীয়ভাবে উৎপাদনের মাধ্যমে বাজারে প্রবেশের বাণিজ্যিক সুযোগ তৈরি হতে পারে।

জাপানি গাড়ি নির্মাতাদের বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে ইতোমধ্যে কিছু অগ্রগতিও হয়েছে। জাপানের মিতসুবিশি করপোরেশন বাংলাদেশের রানকন অটো ইন্ডাস্ট্রিজের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারত্ব গড়ে তুলেছে। সংশ্লিষ্ট উদ্যোগগুলো সফল হলে গাড়ি আমদানিনির্ভর বাজার থেকে স্থানীয় উৎপাদন ও সম্ভাব্য রপ্তানিমুখী শিল্পের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

৭ হাজার ৩৭৯ পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধার সম্ভাবনা

গত ৬ ফেব্রুয়ারি টোকিওতে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) সই হয়। ২০২৪ সালে শুরু হওয়া আলোচনা শেষে স্বাক্ষরিত এ চুক্তিকে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের নতুন কাঠামো হিসেবে দেখা হচ্ছে। চুক্তি কার্যকর হলে বাংলাদেশের রপ্তানি ঝুড়ির প্রায় ৯৭ শতাংশ, অর্থাৎ ৭ হাজার ৩৭৯টি পণ্য জাপানের বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশের সুযোগ পাবে।

বিপরীতে বাংলাদেশ জাপানের ১ হাজার ৩৯টি পণ্যে তাৎক্ষণিক শুল্কমুক্ত সুবিধা দেবে। অন্যান্য অনেক পণ্যের ক্ষেত্রে পর্যায়ক্রমে ১৮ বছর পর্যন্ত শুল্ক কমানোর ব্যবস্থা রয়েছে। চুক্তিতে শুধু পণ্যের শুল্ক কমানো নয়, সেবা বাণিজ্য, বিনিয়োগ, ই-কমার্স, মেধাস্বত্ব, শুল্ক প্রক্রিয়া এবং বাণিজ্য সহজীকরণের বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

ইপিএ বাস্তবায়িত হলে জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর বাংলাদেশে ব্যবসা পরিচালনা ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নীতিগত পূর্বানুমানযোগ্যতা বাড়তে পারে। তবে চুক্তির সুবিধা পুরোপুরি কাজে লাগাতে সংসদীয় অনুমোদনসহ প্রয়োজনীয় অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর সফরে চুক্তি বাস্তবায়নের প্রস্তুতি, সংশ্লিষ্ট বিধিবিধান এবং ব্যবসায়ীদের জন্য নির্ধারিত সুবিধাগুলো কার্যকর করার বিষয় গুরুত্ব পেতে পারে।

জাপানে পোশাক রপ্তানি ৩০০ কোটি ডলারে নেওয়ার লক্ষ্য

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি বাড়ানোর ক্ষেত্রেও জাপানকে সম্ভাবনাময় বাজার হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জাপানে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির পরিমাণ ছিল প্রায় ১১৮ কোটি ৫০ লাখ ডলার। এ আয় বাড়িয়ে ৩০০ কোটি ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণের উদ্যোগ নিয়েছে সংগঠনটি।

জাপানের বার্ষিক পোশাক আমদানির বাজার প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলারের। ফলে দেশটির বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি সম্প্রসারণের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। ইপিএর আওতায় শুল্ক সুবিধা বহাল থাকলে জাপানি ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশের পোশাকের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়তে পারে। বিশেষ করে নিট ও ওভেন পোশাক, ডেনিম, উচ্চমূল্যের ফ্যাশন পণ্য এবং বৈচিত্র্যময় পোশাক রপ্তানির সম্ভাবনা রয়েছে।

পোশাকের পাশাপাশি চামড়াজাত ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, হিমায়িত মাছ ও চিংড়ি, কৃষি প্রক্রিয়াজাত খাদ্য এবং হালকা প্রকৌশল পণ্যের বাজার সম্প্রসারণেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, জাপানি বিনিয়োগ ত্বরান্বিত করাই এ সফরের অন্যতম লক্ষ্য হওয়া উচিত।

জাপানি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং দুই দেশের ব্যবসায়িক যোগাযোগ বাড়াতে বিজিএমইএ গত মাসে তাদের উত্তরার কার্যালয়ে ‘জাপান ডেস্ক’ চালু করেছে। এ ছাড়া এশীয় পোশাক ব্র্যান্ডগুলোকে আকৃষ্ট করতে আগামী মাসে হংকংয়ে একটি রোডশোর আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে, যেখানে জাপানি ব্র্যান্ডগুলোর উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণ প্রত্যাশা করা হচ্ছে।

১৪ বিলিয়ন ডলারের সহযোগিতা প্যাকেজের উদ্যোগ

বাণিজ্য সম্প্রসারণের পাশাপাশি জাপানের কাছ থেকে উন্নয়ন সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগও নিচ্ছে বাংলাদেশ। সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-৩১ মেয়াদে প্রায় ২ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ইয়েন, অর্থাৎ ১৪ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ ও সহযোগিতা প্যাকেজ প্রস্তাবের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। এতে সহজ শর্তের ঋণ, বেসরকারি বিনিয়োগ এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের সমন্বয় রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রস্তাবিত সহযোগিতার অর্থ পরিবহণ অবকাঠামো, মেট্রোরেল, মাতারবাড়ী বন্দর ও শিল্পাঞ্চল উন্নয়ন, জ্বালানি, প্রযুক্তি এবং উৎপাদনশিল্পে ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। মাতারবাড়ীকে ঘিরে বন্দর, সড়ক ও রেল যোগাযোগ এবং শিল্প অবকাঠামোর উন্নয়ন হলে রপ্তানিমুখী শিল্পের পণ্য পরিবহণ সহজ হতে পারে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পণ্য পৌঁছানোর সক্ষমতাও বাড়ার সুযোগ রয়েছে।

জাপানের অর্থায়নে বাস্তবায়িত মেট্রোরেল ও হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের মতো প্রকল্প দুই দেশের দীর্ঘদিনের উন্নয়ন সহযোগিতার উদাহরণ। এবারের সফরে চলমান প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি, নতুন অর্থায়ন এবং জাপানি ঋণের সুদহার কমানোর বিষয়ও আলোচনায় আসতে পারে।

প্রধানমন্ত্রীর সফরের সময় ঢাকায় থাকছেন জাপানে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত

প্রধানমন্ত্রীর সফরকালে জাপানে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মো. দাউদ আলী ঢাকায় থাকবেন বলে জানিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র। তাঁকে ইতোমধ্যে ঢাকায় ফিরিয়ে আনা হয়েছে। অন্যদিকে, সফরের কূটনৈতিক বিষয় তদারকি ও সার্বিক আয়োজন সমন্বয়ের দায়িত্ব দিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দ্বিপক্ষীয় বিষয়ক সচিব এম নজরুল ইসলামকে টোকিও পাঠানো হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সফর চলাকালে তিনি সেখানে অবস্থান করে দ্বিপক্ষীয় ও কূটনৈতিক কার্যক্রমে সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করবেন।

আগামী ২৭ অক্টোবর জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে তারেক রহমানের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। এতে ইপিএ বাস্তবায়ন, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং অবকাঠামো উন্নয়নে সহযোগিতার বিষয়গুলো আলোচনায় আসতে পারে। সফরের মাধ্যমে দুই দেশের অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব আরও জোরদার করা এবং বাংলাদেশের রপ্তানি ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির নতুন সুযোগ তৈরির প্রত্যাশা করছে সরকার।

সিরাজ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

অর্থনীতি এর সর্বশেষ খবর

অর্থনীতি - এর সব খবর

উ
প
রে