×
ঢাকা, শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬

বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামে বড় উল্লম্ফন

২০২৬ অক্টোবর ২৩ ১৭:২৩:৪১
বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামে বড় উল্লম্ফন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়া এবং হরমুজ প্রণালিতে তেলবাহী জাহাজে হামলার ঘটনায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। এর প্রভাবে বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম গত পাঁচ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক বাজারের অন্যতম মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৩ শতাংশ বেড়ে প্রতি ব্যারেল ১১২ ডলারে পৌঁছেছে। গত ১৮ মে’র পর এই প্রথম তেলের দাম এই পর্যায়ে উঠল।

বুধবার ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায়। এর মধ্যে দাম্মামের একটি বেসামরিক বিমানবন্দরে হামলায় দুজন নিহত ও আটজন আহত হন। একই দিনে সৌদি আরবের একটি তেলক্ষেত্রে ড্রোন হামলায় আরও দুজনের প্রাণহানি ঘটে।

এদিকে, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) দাবি করেছে, বুধবার উত্তর উপসাগরীয় এলাকায় ‘অবৈধ’ তেল স্থানান্তরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট চারটি জাহাজে আঘাত হানা হয়েছে। হামলার পর জাহাজগুলোতে আগুন ধরে যায় বলে জানায় ইরানি বাহিনী। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, জাহাজগুলোকে অনুসরণ করার পর এ অভিযান চালানো হয়।

আইআরজিসি সূত্রে জানা গেছে, হরমুজ প্রণালির পশ্চিম অংশে তিনটি জাহাজ মাইনের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করে ইরান বলেছে, উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড অব্যাহত থাকলে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোর বিরুদ্ধে আরও বিস্তৃত পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে। এসব ঘটনায় গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ দিয়ে জ্বালানি পরিবহন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

সংঘাতের প্রেক্ষাপটে সৌদি আরবে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করার পাশাপাশি কূটনৈতিক পর্যায়েও সতর্কতা বাড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটি সৌদি আরবে অবস্থিত কয়েকটি কূটনৈতিক মিশন থেকে কিছু কূটনীতিক ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের চলে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের আরও কয়েকটি মিশন থেকে কূটনীতিকদের পরিবারের সদস্যদের সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি আরবের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি আরামকো ধাহরানে তাদের সদর দপ্তরের কর্মীদের সরিয়ে নিয়ে দূর থেকে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছে। এতে অঞ্চলটির নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।

হরমুজ প্রণালি ঘিরে সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা

বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনা নতুন নয়। প্রায় আট মাস আগে এই প্রণালিতে ইরানের কার্যত অবরোধের কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন দেখা দিয়েছিল। তখন আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল, পরিস্থিতি জ্বালানি বাজারের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সরবরাহ সংকটের জন্ম দিতে পারে।

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর সংঘাতের প্রথম কয়েক সপ্তাহেই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাজার বিশ্লেষকদের কেউ কেউ তখন দাম ১৫০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছানোর পূর্বাভাস দিয়েছিলেন।

সংঘাতের সময় গত এপ্রিলে তেলের দাম সর্বোচ্চ ১২৬ ডলারে উঠেছিল। মে মাসের শেষ দিকে তা আবার ১০০ ডলারের নিচে নেমে আসে। পরে জুলাইয়ের শুরুতে যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা তৈরি হলে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম কমে ৭১ ডলারে দাঁড়ায়।

তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতা স্মারক নিয়ে আলোচনা ব্যর্থ হওয়া এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ার পর বাজারে আবার ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা দেয়। সর্বশেষ সৌদি আরবে হামলা ও হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে আঘাতের ঘটনা তেলের সরবরাহ নিয়ে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।

তবে জ্বালানি তথ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, পারস্য উপসাগর থেকে তেল রপ্তানির পরিমাণ এখন যুদ্ধের আগের মাত্রা ছাড়িয়েছে। স্থলপথে পাইপলাইনের মাধ্যমে লোহিত সাগর ও ওমান উপসাগরীয় এলাকায় তেল পরিবহন বাড়ানোকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ফলে সমুদ্রপথে ঝুঁকি বাড়লেও বিকল্প পরিবহনব্যবস্থা সরবরাহের ক্ষেত্রে কিছুটা ভূমিকা রাখছে।

তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে বিশ্ব শেয়ারবাজারে চাপ

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি ও ঋণ গ্রহণের ব্যয় বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক শেয়ারবাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। জ্বালানির উচ্চমূল্য পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় বাড়াতে পারে—এমন উদ্বেগ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে। এর ফলে ইউরোপ ও এশিয়ার প্রধান শেয়ারসূচকগুলোতে দরপতন দেখা যায়।

ইউরোপের প্রধান কোম্পানিগুলোর শেয়ার নিয়ে গঠিত স্টক্স ইউরোপ ৬০০ সূচক ১ শতাংশ কমেছে। যুক্তরাজ্যের এফটিএসই ১০০ সূচকের পতন হয়েছে ০ দশমিক ৭ শতাংশ।

এশিয়ার বাজারেও দরপতন ছিল উল্লেখযোগ্য। জাপানের নিক্কেই ২২৫ সূচক ২ দশমিক ৭ শতাংশ এবং দক্ষিণ কোরিয়ার কোস্পি সূচক ৩ দশমিক ৫ শতাংশ কমেছে। হংকংয়ের হ্যাং সেং সূচক নেমেছে ৩ শতাংশ।

চাপে বিমান পরিবহন খাত

তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে বিমান পরিবহন খাতেও। জ্বালানি বিমান সংস্থাগুলোর অন্যতম বড় পরিচালন ব্যয় হওয়ায় তেলের দাম দীর্ঘ সময় বেশি থাকলে তাদের মুনাফায় চাপ তৈরি হতে পারে। এর প্রতিফলন দেখা গেছে যুক্তরাষ্ট্রের আমেরিকান এয়ারলাইনসের শেয়ারদরে। বৃহস্পতিবার প্রাক্-বাজার লেনদেনে কোম্পানিটির শেয়ার প্রায় ৪ শতাংশ কমেছে।

আমেরিকান এয়ারলাইনস জানিয়েছে, জ্বালানি তেলের অস্বাভাবিক উচ্চ ব্যয়ের কারণে চলতি বছর তাদের লোকসান হতে পারে। এ পরিস্থিতিতে প্রতিষ্ঠানটি চলতি বছরে মুনাফা অর্জনের আগের পূর্বাভাস থেকে সরে এসেছে।

মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে তেল উৎপাদন, পরিবহন ও সরবরাহব্যবস্থায় আরও বিঘ্ন ঘটতে পারে। তাতে জ্বালানির দাম, মূল্যস্ফীতি, পরিবহন ব্যয় এবং বৈশ্বিক শেয়ারবাজারের ওপর চাপ বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে। তবে বিকল্প পাইপলাইন ও স্থলপথে পরিবহন কতটা সরবরাহ সচল রাখতে পারে, তার ওপরও বাজারের ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ভর করবে। সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, রয়টার্স ও কেপলার।

মিরাজ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

অর্থনীতি এর সর্বশেষ খবর

অর্থনীতি - এর সব খবর

উ
প
রে