×
ঢাকা, শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬

উত্তরাধিকারী জমির নামজারিতে নতুন নিয়ম, জানুন বিস্তারিত

২০২৬ অক্টোবর ২৩ ১৭:১৭:৪৭
উত্তরাধিকারী জমির নামজারিতে নতুন নিয়ম, জানুন বিস্তারিত

নিজস্ব প্রতিবেদক: জমি উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়ার পর নামজারি করতে গিয়ে অনেকেই প্রয়োজনীয় নিয়ম ও কাগজপত্র নিয়ে জটিলতায় পড়েন। তবে প্রচলিত বিধান অনুযায়ী, মৃত ব্যক্তির রেখে যাওয়া জমির নামজারি করার সময় সব আইনগত ওয়ারিশের নাম অন্তর্ভুক্ত করে যৌথ নামজারি করা যায়। অন্যদিকে, ওয়ারিশদের মধ্যে জমি ভাগ করে প্রত্যেকের নামে পৃথক খতিয়ান তৈরি করতে হলে প্রয়োজন হবে নিবন্ধিত বণ্টননামা। তাই জমির রেকর্ড হালনাগাদ করার আগে ওয়ারিশদের সঠিক তথ্য এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র প্রস্তুত রাখা জরুরি।

জমি কেনার পর কিংবা উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়ার পর সরকারি ভূমি রেকর্ডে নতুন মালিকের তথ্য অন্তর্ভুক্ত বা হালনাগাদ করার প্রক্রিয়াকে নামজারি বলা হয়। জমির মালিকানা-সংক্রান্ত রেকর্ড হালনাগাদ রাখা, ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক কার্যক্রম সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে নামজারি গুরুত্বপূর্ণ।

উত্তরাধিকার সূত্রে জমির নামজারিতে যা জানা জরুরি

সব ওয়ারিশের নাম অন্তর্ভুক্ত করতে হবে

উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমির নামজারির আবেদন করার সময় মৃত ব্যক্তির সব আইনগত ওয়ারিশের নাম উল্লেখ করতে হবে। প্রত্যেক ওয়ারিশের আইন অনুযায়ী প্রাপ্য অংশ বিবেচনায় নিয়ে তাঁদের সহ-অংশীদার হিসেবে খতিয়ানে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। কোনো ওয়ারিশের নাম বাদ পড়লে ভবিষ্যতে জমির অংশ, মালিকানা বা বণ্টন নিয়ে জটিলতা তৈরি হতে পারে।

বণ্টননামা ছাড়াই করা যায় যৌথ নামজারি

ওয়ারিশদের মধ্যে জমি আনুষ্ঠানিকভাবে ভাগ না হলেও যৌথ নামজারির আবেদন করা যায়। এ ক্ষেত্রে নিবন্ধিত বণ্টননামা না থাকার কারণ দেখিয়ে শুধু সে জন্য আবেদন বাতিল করা যাবে না। যৌথ নামজারির মাধ্যমে সব ওয়ারিশের নাম একই খতিয়ানে অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব।

তবে ওয়ারিশরা নিজেদের মধ্যে জমি ভাগ করে প্রত্যেকের জন্য আলাদা খতিয়ান করতে চাইলে নিয়ম অনুযায়ী নিবন্ধিত বণ্টননামা প্রয়োজন হবে। অর্থাৎ, যৌথ নামজারি ও জমি ভাগ করে পৃথক খতিয়ান তৈরি করা এক বিষয় নয়।

নামজারির আবেদনে ওয়ারিশ সনদ গুরুত্বপূর্ণ

উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমির নামজারির ক্ষেত্রে ওয়ারিশ সনদ একটি গুরুত্বপূর্ণ নথি। সংশ্লিষ্ট এলাকার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, পৌরসভার মেয়র অথবা সিটি করপোরেশনের ওয়ার্ড কাউন্সিলরের কাছ থেকে এ সনদ সংগ্রহ করা যায়।

ওয়ারিশ সনদে সব আইনগত ওয়ারিশের নাম ও প্রয়োজনীয় তথ্য নির্ভুলভাবে উল্লেখ থাকা জরুরি। সনদে ভুল, অসম্পূর্ণ তথ্য কিংবা অন্যান্য নথির সঙ্গে অসংগতি থাকলে আবেদন যাচাই ও নিষ্পত্তির সময় জটিলতা দেখা দিতে পারে।

পৃথক খতিয়ান করতে লাগবে নিবন্ধিত বণ্টননামা

ওয়ারিশদের মধ্যে জমি ভাগ করে আলাদা খতিয়ান তৈরির ক্ষেত্রে নিবন্ধিত বণ্টননামা প্রয়োজন। এ দলিলের মাধ্যমে প্রত্যেক ওয়ারিশের জন্য নির্ধারিত জমির অংশ উল্লেখ করা হয়। বণ্টননামা নিবন্ধনের পর সংশ্লিষ্ট বণ্টন অনুযায়ী প্রত্যেকে নিজের অংশের জন্য পৃথক নামজারির আবেদন করতে পারবেন।

নামজারির জন্য যেসব কাগজপত্র লাগতে পারে

জমির মালিকানা কীভাবে অর্জিত হয়েছে, জমির ধরন এবং বিদ্যমান ভূমি রেকর্ডের ওপর নির্ভর করে আবেদনের প্রয়োজনীয় কাগজপত্রে কিছু পার্থক্য থাকতে পারে। সাধারণত নিচের নথিগুলো প্রয়োজন হতে পারে—

১. নিবন্ধিত দলিলের কপি: জমি কেনার মাধ্যমে মালিকানা অর্জন করা হলে সংশ্লিষ্ট দলিলের কপি।

২. আগের খতিয়ানের কপি: জমির বিদ্যমান রেকর্ড বা খতিয়ানের অনুলিপি।

৩. জমির বিস্তারিত বিবরণ: দাগ নম্বর, জমির পরিমাণ এবং অবস্থানসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় তথ্য।

৪. জাতীয় পরিচয়পত্র: আবেদনকারীর পরিচয় যাচাইয়ের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য।

৫. ওয়ারিশ সনদ: উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমির ক্ষেত্রে সব আইনগত ওয়ারিশের তথ্যসংবলিত সনদ।

৬. মৃত্যুসনদ: মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নথি।

৭. নিবন্ধিত বণ্টননামা: ওয়ারিশদের মধ্যে জমি ভাগ করে পৃথক খতিয়ান করতে চাইলে।

৮. অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র: সরকারি ফি পরিশোধের তথ্যসহ সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় নথি।

আবেদন জমা দেওয়ার আগে দলিল, খতিয়ান, দাগ নম্বর, জমির পরিমাণ এবং মালিকানার তথ্য মিলিয়ে দেখা উচিত। বিভিন্ন নথিতে তথ্যের অমিল থাকলে আবেদন নিষ্পত্তিতে দেরি হতে পারে।

অনলাইনে যেভাবে নামজারির আবেদন করবেন

ভূমি মন্ত্রণালয়ের সরকারি ওয়েবসাইটের মাধ্যমে ই-নামজারি সেবায় প্রবেশ করে অনলাইনে আবেদন করা যায়। আবেদন করার সময় সাধারণত কয়েকটি ধাপ অনুসরণ করতে হয়।

প্রথম ধাপ: ভূমি মন্ত্রণালয়ের সরকারি ওয়েবসাইটে প্রবেশ করে ই-নামজারি সেবা নির্বাচন করতে হবে।

দ্বিতীয় ধাপ: আবেদনকারীর পরিচয়, জমির অবস্থান, খতিয়ান নম্বর, দাগ নম্বর এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য তথ্য পূরণ করতে হবে।

তৃতীয় ধাপ: জমির মালিকানা কেনার মাধ্যমে নাকি উত্তরাধিকার সূত্রে অর্জিত হয়েছে, তা উল্লেখ করতে হবে। উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমির ক্ষেত্রে সব ওয়ারিশের তথ্য সঠিকভাবে দিতে হবে।

চতুর্থ ধাপ: প্রযোজ্য ক্ষেত্রে নিবন্ধিত দলিল, খতিয়ানের কপি, ওয়ারিশ সনদ, মৃত্যুসনদ এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নির্দেশনা অনুযায়ী সংযুক্ত করতে হবে।

পঞ্চম ধাপ: আবেদন জমা দিয়ে নির্ধারিত সরকারি ফি পরিশোধ করতে হবে। পরবর্তী সময়ে আবেদনের অবস্থা যাচাইয়ের জন্য আবেদন নম্বর বা ট্র্যাকিং তথ্য সংরক্ষণ করা জরুরি।

ষষ্ঠ ধাপ: অনলাইনে আবেদনের অগ্রগতি অনুসরণ করতে হবে। সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিস অতিরিক্ত তথ্য বা কাগজপত্র চাইলে নির্ধারিত নিয়মে তা জমা দিতে হবে।

আবেদনের আগে সরকারি পোর্টালে দেওয়া সর্বশেষ নির্দেশনা, প্রয়োজনীয় নথি ও ফি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া ভালো। কাগজপত্রের যথার্থতা, জমির ধরন এবং কোনো আপত্তি রয়েছে কি না—এসব বিষয়ের ওপর আবেদন নিষ্পত্তির সময় নির্ভর করতে পারে।

নামজারি না করলে কী ধরনের জটিলতা হতে পারে

জমি কেনার পর কিংবা উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়ার পর সরকারি রেকর্ডে মালিকানার তথ্য হালনাগাদ না করলে বিভিন্ন প্রশাসনিক ও মালিকানা-সংক্রান্ত জটিলতার মুখে পড়তে হতে পারে। ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ, জমি হস্তান্তর এবং সরকারি রেকর্ডে মালিকানার তথ্য যাচাইয়ের ক্ষেত্রেও সমস্যা দেখা দিতে পারে।

জমি নিয়ে বিরোধ বা প্রতারণার আশঙ্কা দেখা দিলে যথাযথ দলিল ও হালনাগাদ নথি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে নামজারি একাই জমির চূড়ান্ত মালিকানার একমাত্র প্রমাণ নয়। নিবন্ধিত দলিল, উত্তরাধিকার-সংক্রান্ত নথি, দখল এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক কাগজপত্রও মালিকানা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ।

তাই জমির মালিকানা-সংক্রান্ত নথি সঠিকভাবে সংরক্ষণের পাশাপাশি সময়মতো নামজারি সম্পন্ন করা প্রয়োজন। বিশেষ করে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমির ক্ষেত্রে সব আইনগত ওয়ারিশের নাম অন্তর্ভুক্ত করে যৌথ নামজারি করা যায়। আর জমি ভাগ করে পৃথক খতিয়ান করতে চাইলে নিবন্ধিত বণ্টননামার বিধান অনুসরণ করতে হবে। এতে ভূমি রেকর্ড হালনাগাদ রাখা এবং ভবিষ্যতের সম্ভাব্য জটিলতা এড়াতে সুবিধা হবে।

সিরাজ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

জাতীয় এর সর্বশেষ খবর

জাতীয় - এর সব খবর

উ
প
রে