×
ঢাকা, শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬

লুকানো ঋণ খেলাপি হয়ে বেরিয়ে আসছে, গভীর সংকটে ব্যাংক খাত

২০২৬ অক্টোবর ২৩ ১৭:০২:০৩
লুকানো ঋণ খেলাপি হয়ে বেরিয়ে আসছে, গভীর সংকটে ব্যাংক খাত

নিজস্ব প্রতিবেদক: বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ব্যাংক খাতে প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর ঋণ গ্রহণ, ঋণ অনুমোদনে অনিয়ম এবং ঋণের তথ্য গোপন রাখার অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় ছিল। এস আলম, বেক্সিমকো ও নাসা গ্রুপের নজরুল ইসলাম মজুমদারের মতো বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠীকে কেন্দ্র করে ব্যাংক খাতের সুশাসন, ঋণ বিতরণ এবং আর্থিক জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

খাতসংশ্লিষ্টরা অভিযোগ করছেন, নিয়মনীতি ও প্রচলিত ঋণশৃঙ্খলার ব্যত্যয় ঘটিয়ে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে বিপুল অঙ্কের অর্থ বের করে নেওয়া হয়েছে। এসব ঋণের একটি অংশ যথাসময়ে খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত না হওয়ায় প্রকৃত ঝুঁকিও আড়ালে থেকে যায়।

এখন সেই ঋণগুলোর বড় অংশ খেলাপি হিসেবে সামনে আসায় দেশের ব্যাংক খাতের আর্থিক অবস্থার ওপর চাপ বাড়ছে। বিপুল পরিমাণ শ্রেণীকৃত ঋণ, মূলধনের ঘাটতি এবং ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণে ব্যর্থতা ব্যাংকগুলোর আর্থিক সক্ষমতাকে দুর্বল করে তুলেছে। এর প্রভাব শুধু ব্যাংকের মুনাফা ও ঋণ দেওয়ার সক্ষমতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; আমানতকারীদের আস্থা এবং সামগ্রিক আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্যও এটি বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন শেষে দেশের ব্যাংক খাতে শ্রেণীকৃত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। মোট ঋণের বিপরীতে এর হার ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। অর্থাৎ, ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা প্রতি ১০০ টাকার ঋণের মধ্যে প্রায় ৩৩ টাকাই খেলাপি বা শ্রেণীকৃত ঋণে পরিণত হয়েছে। ঋণের এত বড় অংশ অনাদায়ি হয়ে পড়ায় ব্যাংকগুলোর আয়, সম্পদের মান এবং আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

মাত্র ১০ ব্যাংকে কেন্দ্রীভূত ৭২ শতাংশের বেশি খেলাপি ঋণ

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, ব্যাংক খাতের সংকট সব প্রতিষ্ঠানে সমানভাবে ছড়িয়ে পড়েনি। বরং অল্প কয়েকটি ব্যাংকে খেলাপি ঋণের বড় অংশ কেন্দ্রীভূত হয়েছে। ২০২৬ সালের জুন শেষে মাত্র ১০টি ব্যাংকের কাছে খাতের মোট খেলাপি ঋণের ৭২ শতাংশের বেশি ছিল। এসব ব্যাংক হলো জনতা ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, এবি ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক।

এই ১০ ব্যাংকের সম্মিলিত খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৪ লাখ ৩৯ হাজার ৫২৭ কোটি টাকা। বিপুল অঙ্কের এই ঋণ অনাদায়ি থাকায় সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর আর্থিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়েছে। খেলাপি ঋণের বিপরীতে পর্যাপ্ত অর্থ সংরক্ষণ করতে না পারলে এসব প্রতিষ্ঠানের লোকসান সামাল দেওয়া এবং নতুন ঋণ বিতরণের সক্ষমতা আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ব্যাংকভিত্তিক পরিসংখ্যানেও পরিস্থিতির ভয়াবহতা স্পষ্ট। কয়েকটি ব্যাংকে খেলাপি ঋণের অনুপাত এত বেশি যে তাদের মোট ঋণপোর্টফোলিওর বড় অংশই এখন ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের আর্থিক দুর্বলতা দীর্ঘায়িত হলে শুধু সংশ্লিষ্ট ব্যাংক নয়, আন্তব্যাংক লেনদেন ও সামগ্রিক আর্থিক ব্যবস্থার ওপরও চাপ তৈরি হতে পারে।

ইসলামী ব্যাংকসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে খেলাপি ঋণের ভার

ব্যাংক খাতের সংকটের আলোচনায় ইসলামী ব্যাংকের নাম বিশেষভাবে উঠে এসেছে। ২০১৭ সালে চট্টগ্রামভিত্তিক ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এস আলম গ্রুপ ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ নেয়। পরবর্তী সময়ে ব্যাংকটির ঋণ বিতরণ ও বড় অঙ্কের অর্থের ব্যবহার নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ সামনে আসে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থার বিভিন্ন সময়ের তথ্যের ভিত্তিতে ব্যাংকটি থেকে এক লাখ কোটি টাকার বেশি অর্থ ঋণের নামে বের করে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে এস আলম গ্রুপের বিরুদ্ধে। গ্রুপটির প্রধানকে ঘিরে অর্থ স্থানান্তর ও ঋণ পরিশোধের বিষয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

এসব ঋণের বড় অংশ আদায় না হওয়ায় ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়েছে বলে সংশ্লিষ্ট পরিসংখ্যানে দেখা যায়। সর্বশেষ উল্লিখিত তথ্য অনুযায়ী, ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৯৮ হাজার ৯১৪ কোটি টাকা, যা ব্যাংকটির মোট বিতরণ করা ঋণের ৫২ দশমিক ১৫ শতাংশ।

অন্য ব্যাংকগুলোর অবস্থাও উদ্বেগজনক। জনতা ব্যাংকের খেলাপি ঋণের অনুপাত প্রায় ৭৫ শতাংশ। ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকে এ হার প্রায় ৯৭ শতাংশ এবং ইউনিয়ন ব্যাংকে ৯৬ শতাংশের কাছাকাছি। এক্সিম ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৩৮ হাজার ৫৩ কোটি টাকা, যা ব্যাংকটির মোট ঋণের প্রায় ৭১ শতাংশ। আইএফআইসি ব্যাংক ও ন্যাশনাল ব্যাংকের ক্ষেত্রেও খেলাপি ঋণের অনুপাত যথাক্রমে ৬৩ ও ৬৫ শতাংশের বেশি।

এই পরিসংখ্যান দেখায়, কয়েকটি ব্যাংকের ঋণপোর্টফোলিওতে ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি। অতীতের ঋণ বিতরণে অনিয়ম, বড় ঋণগ্রহীতাদের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং ঋণ আদায়ে দুর্বলতা এসব প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থাকে জটিল করে তুলেছে বলে সংশ্লিষ্ট মহলে উদ্বেগ রয়েছে।

অন্যদিকে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও কিছু ব্যাংক থেকে প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠী একই মাত্রায় ঋণ নিতে পারেনি বলে সংশ্লিষ্ট আলোচনায় উঠে এসেছে। এসব ব্যাংকের কয়েকটির খেলাপি ঋণের অনুপাত ৫ শতাংশের নিচে রয়েছে। অর্থাৎ, ব্যাংক খাতের সব প্রতিষ্ঠানের অবস্থা এক নয়। কিছু ব্যাংকের তুলনামূলক ভালো ঋণমানের বিপরীতে অন্য কয়েকটি ব্যাংক গুরুতর সংকটে পড়েছে। এই বৈষম্য ব্যাংকভিত্তিক তদারকি ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তাকে আরও স্পষ্ট করে।

মূলধন ঘাটতি দুই লাখ কোটি টাকার বেশি

খেলাপি ঋণের পাশাপাশি ব্যাংক খাতের আরেকটি বড় দুর্বলতা হলো মূলধনের ঘাটতি। ব্যাংকের মূলধন সম্ভাব্য ঋণক্ষতি মোকাবিলা এবং আমানতকারীদের অর্থের নিরাপত্তা বজায় রাখার অন্যতম প্রধান আর্থিক সুরক্ষা। ঋণের বড় অংশ অনাদায়ি হয়ে পড়লে ব্যাংকের সম্পদের মান কমে যায়; একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় মূলধন ধরে রাখাও কঠিন হয়ে পড়ে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদনে দেখা যায়, ব্যাংক খাতের ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের বিপরীতে মূলধনের অনুপাত বা সিআরএআর ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬৪ শতাংশে নেমে আসে। একই সময়ে খাতের নিট মূলধন ঘাটতি দাঁড়ায় প্রায় ২ লাখ ১৭ হাজার কোটি টাকা। বিশ্বব্যাংকের ২০২৬ সালের জুনের মূল্যায়নেও বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের দুর্বল মূলধন পরিস্থিতির বিষয়টি উঠে এসেছে।

মূলধনের ঘাটতি বাড়তে থাকলে ব্যাংকগুলোর আর্থিক ধাক্কা সামাল দেওয়ার সক্ষমতা কমে যায়। নতুন ঋণ বিতরণ, বিদ্যমান ঋণঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার ক্ষেত্রেও চাপ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে যেসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণের অনুপাত অত্যন্ত বেশি, তাদের জন্য মূলধন পুনর্গঠন আরও জরুরি হয়ে পড়েছে।

প্রভিশন ঘাটতি বাড়াচ্ছে আর্থিক চাপ

ঋণের সম্ভাব্য ক্ষতি মোকাবিলায় ব্যাংকগুলোকে নিয়ম অনুযায়ী নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ প্রভিশন বা সংরক্ষণ হিসেবে রাখতে হয়। খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণ করা না গেলে ভবিষ্যতে ঋণক্ষতি ব্যাংকের আয় ও মূলধনের ওপর আরও বড় চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন শেষে ব্যাংক খাতে ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় প্রভিশন ঘাটতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ২২ হাজার ৩৫৭ কোটি টাকা। এই ঘাটতি ব্যাংকগুলোর আর্থিক দুর্বলতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় অর্থ সংরক্ষণ করতে না পারলে কাগজে-কলমে সম্পদের যে মূল্য দেখানো হয়, বাস্তবে তার মান নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।

প্রভিশন ঘাটতি পূরণে ব্যাংকগুলোর আয় ও মূলধনের ওপর বাড়তি চাপ পড়তে পারে। একই সঙ্গে নতুন ঋণ বিতরণের সক্ষমতা সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। যেসব ব্যাংক ইতোমধ্যে মূলধন সংকটে রয়েছে, তাদের জন্য এ পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। ফলে খেলাপি ঋণ কমানোর পাশাপাশি প্রভিশন ঘাটতি পূরণও ব্যাংক খাত পুনরুদ্ধারের অন্যতম প্রধান শর্ত।

পাঁচ ইসলামী ব্যাংক একীভূত করে নতুন প্রতিষ্ঠান

দুর্বল ব্যাংকগুলোর সংকট মোকাবিলায় পাঁচটি ইসলামী ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি গঠন করা হয়েছে। ব্যাংকগুলো হলো ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও এক্সিম ব্যাংক। একীভূতকরণের মাধ্যমে দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালী করা এবং আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, নতুন ব্যাংকটির মূলধন শক্তিশালী করতে ২০ হাজার কোটি টাকা দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংক সম্পদের প্রকৃত মান যাচাই, পরিচালনা কাঠামো পুনর্গঠন এবং আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।

তবে শুধু ব্যাংক একীভূত করলেই সংকটের স্থায়ী সমাধান হবে না। পুরোনো ঋণের প্রকৃত আদায়যোগ্যতা নির্ধারণ, ঋণ বিতরণে অনিয়মের তদন্ত, দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহি এবং বাস্তবসম্মত ঋণ আদায় পরিকল্পনা নিশ্চিত করতে হবে। বড় ঋণগ্রহীতাদের কাছ থেকে অর্থ আদায় না হলে নতুন ব্যাংকের মূলধন বাড়ানোর পরও ভবিষ্যতে আবার আর্থিক চাপ তৈরি হতে পারে।

একীভূতকরণের সাফল্য নির্ভর করবে নতুন প্রতিষ্ঠানের পরিচালন দক্ষতা, সম্পদের গুণগত মান, ঋণ আদায়ের অগ্রগতি এবং আর্থিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার ওপর। পাশাপাশি পুরোনো ঋণ ও দায়ের স্বচ্ছ হিসাব প্রকাশ করা প্রয়োজন, যাতে আমানতকারী ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত আর্থিক অবস্থা বুঝতে পারে।

আমানত সুরক্ষায় নতুন আইন, তবে রয়েছে সীমাবদ্ধতা

ব্যাংক খাতের সংকটের মধ্যে আমানতকারীদের অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ২০২৬ সালের আমানত সুরক্ষা আইনে সুরক্ষার সীমা এক লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে দুই লাখ টাকা করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর ফলে কোনো ব্যাংক ব্যর্থ হলে যোগ্য আমানতকারীরা নির্ধারিত সীমার মধ্যে সুরক্ষা পাওয়ার সুযোগ পাবেন।

তবে সুরক্ষার সীমা দুই লাখ টাকা হওয়া মানে এই নয় যে প্রত্যেক আমানতকারী তাঁর পুরো জমা অর্থ স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফেরত পাবেন। আইন অনুযায়ী যোগ্যতা, প্রযোজ্য শর্ত ও নির্ধারিত প্রক্রিয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। তাই আমানতকারীদের সুরক্ষার পাশাপাশি ব্যাংকের সম্পদের মান, ঋণ আদায় এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনার উন্নয়নও জরুরি।

বাংলাদেশ ব্যাংক ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি, সম্পদের মান যাচাই, ঋণ শ্রেণীকরণ এবং প্রভিশন সংরক্ষণের নিয়ম কার্যকর করার উদ্যোগ নিয়েছে। এ ছাড়া বিশ্বব্যাংকের ৪৫০ মিলিয়ন ডলারের সহায়তা আমানত সুরক্ষা, ব্যাংক পুনর্গঠন এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যে নেওয়া হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

এসব উদ্যোগের কার্যকারিতা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের গতি, তদারকির স্বচ্ছতা এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সক্ষমতার ওপর। শুধু নীতিমালা প্রণয়ন নয়, ব্যাংকগুলোর আর্থিক তথ্য নিয়মিত প্রকাশ এবং ঋণগ্রহীতাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।

সংকট কাটাতে প্রয়োজন ঋণ আদায়, মূলধন পুনর্গঠন ও সুশাসন

২০২৬ সালের জুনের তথ্য বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের সামনে থাকা সংকটের গভীরতা তুলে ধরে। খেলাপি ঋণের বিপুল পরিমাণ, মূলধন ঘাটতি, প্রভিশন সংরক্ষণে ব্যর্থতা এবং দুর্বল সুশাসন—সব মিলিয়ে খাতটির আর্থিক ভিত্তি চাপে রয়েছে। তবে সব ব্যাংকের অবস্থা সমান নয়; কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি হলেও অন্য কিছু ব্যাংকের খেলাপি ঋণের অনুপাত তুলনামূলক কম।

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে প্রথমত, খেলাপি ঋণ আদায়ে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। বড় ঋণগ্রহীতাদের কাছ থেকে অর্থ আদায়, ঋণ বিতরণে অনিয়মের তদন্ত এবং দায় নির্ধারণের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। দ্বিতীয়ত, ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি পূরণ ও প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। তৃতীয়ত, ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি জোরদার করে ব্যাংকভিত্তিক আর্থিক তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করতে হবে।

একই সঙ্গে ঋণ অনুমোদন ও বিতরণে রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপ ঠেকানো, পরিচালনা পর্ষদের জবাবদিহি বাড়ানো এবং ঋণগ্রহীতাদের আর্থিক সক্ষমতা যথাযথভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। ব্যাংক খাতের প্রতি আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যকর তদারকি ও নিয়মের সমান প্রয়োগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

শেষ পর্যন্ত ব্যাংক খাতের সংকটের সমাধান শুধু খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ব্যাংকগুলো কতটা ক্ষতি সামাল দিতে পারছে, মূলধন ও প্রভিশন ঘাটতি কীভাবে পূরণ হচ্ছে এবং আমানতকারীদের অর্থ সুরক্ষায় কতটা কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে—এসব প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে পুনরুদ্ধার কতটা টেকসই হবে।

মামুন/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর

উ
প
রে