×
ঢাকা, বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬

ভাতা পাবেন ভেবে টিপসই, পরে জানলেন জমি আর তাঁর নেই!

২০২৬ অক্টোবর ২১ ২১:৩৩:৩২
ভাতা পাবেন ভেবে টিপসই, পরে জানলেন জমি আর তাঁর নেই!

নিজস্ব প্রতিবেদক: সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় বয়স্কভাতার কার্ড করে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে ৮৫ বছর বয়সী এক দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ও মানসিক সমস্যায় ভোগা বৃদ্ধের ১৪ শতক ফসলি জমি লিখে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় এক সাবেক ইউপি সদস্যের বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগী আজিজুল হকের পরিবারের অভিযোগ, বয়স্কভাতার ব্যবস্থা করে দেওয়ার কথা বলে তাঁর কাছ থেকে কাগজে টিপসই নেওয়া হয়। পরে তাঁকে মাত্র ৫ হাজার টাকা দিয়ে জানানো হয়, তাঁর জমি অন্যের নামে রেজিস্ট্রি হয়ে গেছে। তবে জমি বিক্রিতে প্রতারণার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত সাবেক ইউপি সদস্য। তাঁর দাবি, তিনি নিয়ম মেনেই জমি কিনেছেন এবং বৃদ্ধকে ৭ লাখ টাকা পরিশোধ করেছেন।

গত ৪ অক্টোবর উল্লাপাড়া উপজেলার কয়ড়া ইউনিয়নের বাঘলপুর গ্রামে এ ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। জমি লিখে নেওয়ার বিষয়টি জানার পর ভুক্তভোগী ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা প্রতিকার চেয়ে উল্লাপাড়া সাব-রেজিস্ট্রার এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। তাঁরা প্রতারণার মাধ্যমে সম্পাদিত হয়েছে বলে দাবি করা দলিল বাতিল এবং ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

দলিলের নকল ও সাব-রেজিস্ট্রি কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বাঘলপুর মৌজায় আজিজুল হকের ১৪ শতক জমি ৫ লাখ ৭১ হাজার টাকা মূল্য দেখিয়ে গত ৪ অক্টোবর রেজিস্ট্রি করা হয়। জমির গ্রহীতা হিসেবে একই গ্রামের মৃত ময়নাল সরকারের তিন ছেলে—সাবেক ইউপি সদস্য আবুল কালাম আজাদ, শাহ আলম ও শাহাদাৎ হোসেনের নাম রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, বৃদ্ধ অসুস্থ থাকায় নিয়মিত সাব-রেজিস্ট্রি কার্যালয়ের পরিবর্তে উল্লাপাড়া পৌর শহরের একটি বাড়িতে কমিশনের মাধ্যমে দলিল সম্পাদন করা হয়।

ভুক্তভোগীর ছেলে ফারুক সরকার জানান, তাঁর বাবা চোখে দেখতে পান না এবং আগে পাবনা মানসিক হাসপাতালেও চিকিৎসা নিয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, বাবার শারীরিক ও মানসিক অসুস্থতার সুযোগ নিয়ে বয়স্কভাতার কার্ড করে দেওয়ার কথা বলে জমি লিখে নেওয়া হয়েছে। পরিবারের দাবি, জমি বিক্রির বিষয়ে আজিজুল হককে প্রকৃত তথ্য জানানো হয়নি। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে দায়ীদের শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

দলিল লেখক আব্দুল মতিন জানান, সাবেক ইউপি সদস্য আবুল কালাম আজাদ জমির প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং দাতা ও গ্রহীতাদের ছবি দিয়ে দলিল প্রস্তুত করতে বলেছিলেন। সে অনুযায়ী কমিশনের মাধ্যমে একটি বাড়িতে দলিল সম্পাদন করা হয়। পরে তিনি জানতে পারেন, কৌশল ও প্রতারণার মাধ্যমে বৃদ্ধের কাছ থেকে জমি লিখে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে দলিল লেখক আব্দুল মতিনকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করেছে সাব-রেজিস্ট্রি কার্যালয়। উল্লাপাড়ার সাব-রেজিস্ট্রার ফারহানা আজিজ জানান, অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে আবেদনের মাধ্যমে কমিশনে দলিল নিবন্ধনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। লিখিত অভিযোগ পাওয়ার পর দলিল লেখককে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। তাঁর জবাব সন্তোষজনক না হওয়ায় তাঁকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে।

তবে জমি প্রতারণার মাধ্যমে লিখে নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সাবেক ইউপি সদস্য আবুল কালাম আজাদ। তাঁর দাবি, কোনো প্রলোভন দেখিয়ে নয়, বরং আজিজুল হককে ৭ লাখ টাকা নগদ পরিশোধ করে সরকারি বিধিবিধান অনুসরণ করেই জমি কেনা হয়েছে। ফলে জমির মূল্য পরিশোধ, দলিল সম্পাদনের প্রক্রিয়া এবং বৃদ্ধের সম্মতি নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্যে স্পষ্ট বিরোধ রয়েছে।

এদিকে অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছেন উল্লাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ রায়হানুল ইসলাম। তিনি বলেন, লিখিত অভিযোগটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হবে এবং অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

একজন বয়স্ক, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ও মানসিক সমস্যায় ভোগা ব্যক্তির জমি হস্তান্তরের ঘটনায় তাঁর প্রকৃত সম্মতি ছিল কি না, দলিল সম্পাদনের সময় কীভাবে তা যাচাই করা হয়েছিল এবং জমির মূল্য কীভাবে পরিশোধ করা হয়েছে—এসব বিষয় তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ এবং জমি নিয়ে বিরোধের নিষ্পত্তিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত ও আইনগত পদক্ষেপের দিকেই এখন তাকিয়ে রয়েছেন ভুক্তভোগীর পরিবারের সদস্যরা।

মুয়াজ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

জাতীয় এর সর্বশেষ খবর

জাতীয় - এর সব খবর

উ
প
রে