×
ঢাকা, বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬

সৌদিতে মৃত্যুদণ্ড

নজরুল ও সুইটিকে নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিলেন পরিবার

২০২৬ অক্টোবর ২১ ২১:২৩:৪৬
নজরুল ও সুইটিকে নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিলেন পরিবার

নিজস্ব প্রতিবেদক: সৌদি আরবের পবিত্র মক্কা অঞ্চলে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশি নাগরিক নজরুল ইসলাম আবদুল বাছির ও সুইটি আক্তারের সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁদের স্বামী-স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দেওয়া হলেও নজরুলের পরিবার দাবি করেছে, তাঁর ছেলে বিয়ে করেননি এবং সুইটি নামের ওই তরুণীকে তাঁরা আগে থেকে চিনতেন না। অন্যদিকে, সৌদি কর্তৃপক্ষের বিবৃতিতে তাঁদের বিরুদ্ধে মসজিদের ভেতরে ‘অনৈতিক কর্মকাণ্ডের’ অভিযোগে আদালতে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার কথা বলা হয়েছে। তবে তাঁদের সম্পর্কের প্রকৃত অবস্থা এবং মামলার বিস্তারিত তথ্য নিয়ে এখনো প্রশ্ন রয়েছে।

সৌদি আরবের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১৪ অক্টোবর মক্কা অঞ্চলে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। কর্তৃপক্ষ জানায়, তদন্তের পর তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয় এবং আদালত তাআজির আইনের আওতায় মৃত্যুদণ্ডের রায় দেন। সংশ্লিষ্ট বিচারিক কর্তৃপক্ষ রায় বহাল রাখার পর তা কার্যকরের আদেশ দেওয়া হয়। তবে সৌদি কর্তৃপক্ষের প্রকাশিত বিবৃতিতে অভিযোগের সুনির্দিষ্ট বিবরণ, ঘটনার তারিখ কিংবা সংশ্লিষ্ট মসজিদের নাম উল্লেখ করা হয়নি।

বাংলাদেশের জেদ্দা কনস্যুলেটও জানিয়েছে, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে তাদের এ বিষয়ে অবহিত করা হয়নি। বিষয়টি জানার পর সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। ফলে দুই বাংলাদেশির বিচারপ্রক্রিয়া, দণ্ডের বিষয়ে তাঁদের পরিবার ও বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষকে কীভাবে জানানো হয়েছিল এবং তাঁদের আইনি সহায়তা পাওয়ার সুযোগ কতটা ছিল—এসব প্রশ্ন সামনে এসেছে।

‘আমার ছেলে বিয়ে করেনি, সুইটিকে চিনিও না’

নজরুল ইসলাম আবদুল বাছিরের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার সুলতানপুর ইউনিয়নের বীরমপুর গ্রামে। তিনি স্থানীয় কৃষক আব্দুল বাছিরের ছেলে। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, আর্থিক অনটন দূর করার আশায় ঋণ নিয়ে ২০২২ সালের ১০ নভেম্বর সৌদি আরবে পাড়ি জমান নজরুল। সেখানে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করতেন তিনি।

নজরুলের বাবার দাবি, তাঁর ছেলে অবিবাহিত ছিলেন। সুইটি আক্তারকে নজরুলের স্ত্রী হিসেবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার বিষয়টিও তিনি অস্বীকার করেছেন। তাঁর ভাষ্য, তাঁরা শুধু শুনেছিলেন, নজরুল ও সুইটি একই জায়গায় পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করতেন। তাঁদের মধ্যে বিয়ে হয়েছিল—এমন কোনো তথ্য পরিবার জানত না।

পরিবারের দাবি, সৌদি আরবে যাওয়ার কয়েক মাস পর নজরুলের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পরে কারাগার থেকে ফোন করে তিনি পরিবারকে জানান, একটি অভিযোগের ঘটনায় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এরপর কারাগারে থাকা অবস্থায় পরিবারের সঙ্গে মাঝেমধ্যে ফোনে কথা হতো। কিন্তু মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে পরিবারকে জানানো হয়নি বলে স্বজনদের অভিযোগ। গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে তাঁরা মৃত্যুর বিষয়টি জানতে পারেন।

নজরুলের বিদেশযাত্রার জন্য পরিবারকে ঋণ করতে হয়েছিল বলে স্বজনেরা জানিয়েছেন। তাঁর মৃত্যুর খবরে একদিকে সন্তান হারানোর শোক, অন্যদিকে আর্থিক দায়ের বোঝা—দুই সংকটেই পড়েছে পরিবারটি।

সুইটি আক্তারের পরিচয় ও পরিবারের দাবি

সুইটি আক্তারের বাড়ি টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার মহেড়া ইউনিয়নের গবড়া গ্রামে। তিনি ফজল মিয়া ও জোহুরা বেগমের মেয়ে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত ছবি দেখে তাঁর ভগ্নিপতি আব্দুল বারেক তাঁকে শনাক্ত করেন বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) ছাড়পত্র এবং জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যের মাধ্যমেও তাঁর পরিচয় যাচাইয়ের কথা বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে।

সুইটির পরিবারের সদস্যদের দাবি, সৌদি আরবে তাঁর বিরুদ্ধে কী অভিযোগ আনা হয়েছিল, মামলার অগ্রগতি কী ছিল এবং মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়েছিল কি না—এসব বিষয়ে তাঁরা আগে থেকে স্পষ্ট তথ্য পাননি। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর প্রকাশের পর তাঁরা গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েন।

সুইটির বাবা-মায়ের আকুতি, মৃত্যুর খবর আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হলে মেয়ের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হোক। একই সঙ্গে তাঁরা ঘটনার বিস্তারিত জানতে এবং সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পেতে চান।

কনস্যুলেটের নথিতে কী তথ্য পাওয়া গেছে?

২০ অক্টোবর প্রকাশিত দ্য ডেইলি স্টার-এর এক প্রতিবেদনে জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেটের একটি গোপনীয় স্মারকলিপির তথ্য তুলে ধরা হয়। ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, নজরুল ও সুইটি ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে সৌদি আরবে আটক ছিলেন। কনস্যুলেটের কাছে ৩০ সেপ্টেম্বর পাওয়া বন্দিদের তালিকায় নজরুলের বিরুদ্ধে সাইবার অপরাধ আইনে এবং সুইটির বিরুদ্ধে ব্যভিচারের অভিযোগে আটকের তথ্য ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এই তথ্য পরিবারের বর্ণনায় উঠে আসা ঘটনাক্রমের সঙ্গে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি করে। বিশেষ করে, দুই ব্যক্তির বিরুদ্ধে পৃথক অভিযোগ থাকলে তাঁদের মামলার প্রক্রিয়া, অভিযোগের ভিত্তি এবং চূড়ান্ত রায়ের বিষয়গুলো আলাদাভাবে জানা প্রয়োজন। কনস্যুলেটের নথিতে মৃত্যুদণ্ডের উল্লেখ ছিল কি না, সে বিষয়েও প্রতিবেদনে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।

তবে এসব অভিযোগের বিস্তারিত বিচারিক নথি জনসমক্ষে না থাকায় মামলার সব দিক স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। সৌদি কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে তাঁদের দোষী সাব্যস্ত হওয়ার কথা বলা হলেও অভিযোগের পূর্ণ বিবরণ ও বিচারপ্রক্রিয়ার সব তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

মৃত্যুদণ্ডের আগে বাংলাদেশকে জানানো হয়নি কেন?

এই ঘটনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি হলো—দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে বাংলাদেশি কূটনৈতিক মিশনকে কেন জানানো হয়নি। জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেটের বক্তব্য অনুযায়ী, তারা আগে থেকে কোনো নোটিশ পায়নি। পরে সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি স্বীকার ও ব্যাখ্যা করার অনুরোধ জানানো হয়।

বিদেশে আটক বাংলাদেশি নাগরিকদের ক্ষেত্রে কনস্যুলার যোগাযোগ, আইনি সহায়তা এবং পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে এ ঘটনায় অভিযুক্ত দুজন কী ধরনের আইনি সহায়তা পেয়েছিলেন, তাঁদের পক্ষে আইনজীবী ছিলেন কি না এবং চূড়ান্ত রায়ের বিষয়ে তাঁদের জানানো হয়েছিল কি না—এসব বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তথ্য এখনো সামনে আসেনি।

তাই পরিবারকে মৃত্যুদণ্ডের আগে জানানো হয়নি—এমন অভিযোগ এবং বিচারপ্রক্রিয়ায় আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়নি—এমন দাবি পৃথকভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। বাংলাদেশ সরকারের কাছে এখন সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে মামলার নথি, রায়ের বিবরণ এবং কনস্যুলার যোগাযোগের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য চাওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

মরদেহ দেশে ফেরানোর দাবি

নজরুল ও সুইটির পরিবারের সদস্যরা এখন তাঁদের স্বজনদের মৃত্যুর বিষয়ে আনুষ্ঠানিক তথ্য, প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক সহযোগিতা এবং মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা চান। এ বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক মিশনের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

দুই পরিবারের জন্য ঘটনাটি শুধু স্বজন হারানোর বেদনা নয়; দীর্ঘদিন ধরে মামলার বিস্তারিত না জানা, মৃত্যুদণ্ডের খবর আগে থেকে না পাওয়া এবং শেষবারের মতো মরদেহ দেখার অনিশ্চয়তাও তাঁদের কষ্ট বাড়িয়েছে।

মক্কার ঘটনায় ঠিক কী ঘটেছিল, দুই বাংলাদেশির বিরুদ্ধে পৃথক অভিযোগের ভিত্তি কী ছিল এবং বিচারপ্রক্রিয়ায় কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল—এসব প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ উত্তর পেতে সৌদি কর্তৃপক্ষের বিস্তারিত ব্যাখ্যা প্রয়োজন। একই সঙ্গে পরিবারগুলোর দাবি ও কূটনৈতিক যোগাযোগের বিষয়টি স্বচ্ছভাবে নিষ্পত্তি করা জরুরি।

মুয়াজ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

জাতীয় এর সর্বশেষ খবর

জাতীয় - এর সব খবর

উ
প
রে