×
ঢাকা, বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬

৩৩৫ মিলিয়ন ডলারে ভারতের ঘাড়ে চীনের নিঃশ্বাস

২০২৬ অক্টোবর ২১ ২১:১৩:৩৯
৩৩৫ মিলিয়ন ডলারে ভারতের ঘাড়ে চীনের নিঃশ্বাস

নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমুদ্রবন্দর মোংলা আধুনিকায়নে চীনের সঙ্গে ৩৩ কোটি ৫৭ লাখ ৮০ হাজার ডলারের ঋণচুক্তি করেছে সরকার। ২০২৬ সালের ১০ অক্টোবর স্বাক্ষরিত এ চুক্তির আওতায় মোংলা বন্দরের অবকাঠামো সম্প্রসারণ, কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ এবং পণ্য ওঠানো-নামানোর সক্ষমতা বাড়ানো হবে। চীনের এক্সিম ব্যাংক থেকে নেওয়া এ ঋণের পরিমাণ বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩ হাজার ৫৯৩ কোটি টাকা। ঋণের সুদের হার ২ শতাংশ এবং পরিশোধের মেয়াদ ২০ বছর, যার মধ্যে পাঁচ বছরের গ্রেস পিরিয়ড রয়েছে।

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) তথ্য অনুযায়ী, ‘মোংলা বন্দর সুবিধা সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন’ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের অধীন মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ। প্রকল্পের আওতায় আধুনিক যন্ত্রপাতিসহ দুটি কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ করা হবে। পাশাপাশি কনটেইনার ইয়ার্ড, কনটেইনার ডেলিভারি ইয়ার্ড এবং কার্গো হ্যান্ডলিং ইয়ার্ড গড়ে তোলা হবে। এসব অবকাঠামো বন্দরের পণ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিবহন সক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করবে।

মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন বাংলাদেশের বাণিজ্য ও পরিবহন অবকাঠামোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে প্রকল্পে চীনা অর্থায়নের বিষয়টি দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতির আলোচনাতেও স্থান পেয়েছে। বিশেষ করে বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে চীনের অর্থনৈতিক উপস্থিতি বৃদ্ধি এবং ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক ও কৌশলগত সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে এ প্রকল্পের গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা চলছে।

চীনের এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গে স্বাক্ষরিত চুক্তি অনুযায়ী, ঋণের সুদের হার বার্ষিক ২ শতাংশ এবং পরিশোধের মেয়াদ ২০ বছর। এর মধ্যে প্রথম পাঁচ বছর গ্রেস পিরিয়ড হিসেবে নির্ধারিত হয়েছে। সহজ শর্তের এ অর্থায়নের মাধ্যমে বন্দর অবকাঠামো উন্নয়নের ব্যয় মেটানো হবে।

মোংলা বন্দর বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বন্দরটির সক্ষমতা বাড়লে পণ্য পরিবহনের বিকল্প ব্যবস্থা শক্তিশালী হতে পারে এবং চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর নির্ভরতা কিছুটা কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পর কতটা অতিরিক্ত পণ্য পরিবহন করা যাবে, কত কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং বন্দরের আয় কত বাড়বে—তা নির্ভর করবে নির্মাণকাজের অগ্রগতি, পরিচালনব্যবস্থা ও ভবিষ্যৎ বাণিজ্যের পরিমাণের ওপর।

মোংলা বন্দরের উন্নয়ন দেশের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগব্যবস্থা এবং আঞ্চলিক বাণিজ্যের জন্যও সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। নৌ, সড়ক ও রেলপথের সংযোগ কার্যকরভাবে কাজে লাগানো গেলে নেপাল, ভুটান এবং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে বাণিজ্য ও পণ্য পরিবহনের সুযোগ বাড়তে পারে। তবে এসব সুবিধা কতটা বাস্তবায়িত হবে, তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট দেশের সঙ্গে চুক্তি, ট্রানজিটব্যবস্থা, শুল্কনীতি এবং পরিবহন অবকাঠামোর ওপর।

মোংলা বন্দরের আশপাশের শিল্পাঞ্চল উন্নয়ন নিয়েও বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে আগে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ২০১৫ সালে মোংলার কাছে প্রায় ১১০ একর জমিতে ভারতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হয়। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্পের বাস্তব নির্মাণকাজ শুরু না হওয়ায় পরবর্তী সময়ে জমি বরাদ্দ ও সংশ্লিষ্ট উদ্যোগ বাতিলের বিষয়টি আলোচনায় আসে।

পরবর্তীতে চীনা প্রতিষ্ঠান চায়না সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন করপোরেশনের (সিসিইসিসি) সঙ্গে মোংলা বন্দর আধুনিকায়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের চুক্তি হয়। বন্দর উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক অঞ্চলের উদ্যোগ দুটি আলাদা প্রকল্প হলেও একই অঞ্চলে চীনা প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্কের আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

তবে চীনা ঋণচুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়া মানেই মোংলা বন্দরের মালিকানা বা পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ চীনের হাতে চলে যাওয়া নয়। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের। ঋণদাতা দেশ, নির্মাণকাজে যুক্ত প্রতিষ্ঠান এবং বন্দরের মালিকানা বা পরিচালন কর্তৃপক্ষের ভূমিকা এক নয়। তাই বিষয়টি মূল্যায়নের ক্ষেত্রে অর্থায়ন, নির্মাণচুক্তি ও পরিচালনব্যবস্থাকে আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

বঙ্গোপসাগর আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও সামুদ্রিক যোগাযোগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। ভারত মহাসাগর এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে সংযোগ স্থাপনে এ অঞ্চলের বন্দরগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। চীন দীর্ঘদিন ধরে ভারত মহাসাগরে বাণিজ্যিক যোগাযোগ বাড়ানো এবং নিজের পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোর সঙ্গে সমুদ্রপথের সংযোগ উন্নত করার চেষ্টা করছে।

এ ক্ষেত্রে মিয়ানমারের কিয়াকফিউ গভীর সমুদ্রবন্দর, তেল ও গ্যাস পাইপলাইন এবং চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডর গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। এসব প্রকল্পের মাধ্যমে বঙ্গোপসাগর থেকে মিয়ানমার হয়ে চীনের ইউনান প্রদেশে জ্বালানি ও পণ্য পরিবহনের সুযোগ তৈরি হয়েছে। মালাক্কা প্রণালীর ওপর চীনের নির্ভরতা কমানোর সম্ভাব্য কৌশল হিসেবেও কিয়াকফিউ করিডরকে বিশ্লেষকেরা বিবেচনা করেন।

তবে মোংলা বন্দরকে সরাসরি চীনের ‘মালাক্কা বাইপাস’ রুটের অংশ হিসেবে দেখানোর মতো পর্যাপ্ত তথ্য নেই। মোংলা থেকে কিয়াকফিউ হয়ে চীনে পণ্য বা জ্বালানি পরিবহনের জন্য সরাসরি সমন্বিত রেলপথ, পাইপলাইন কিংবা নির্দিষ্ট করিডর প্রতিষ্ঠার কোনো তথ্য ঋণচুক্তির ঘোষণায় উল্লেখ করা হয়নি। ফলে মোংলা বন্দরের আধুনিকায়নকে চীনের বৃহত্তর সামুদ্রিক কৌশলের সঙ্গে যুক্ত করে বিশ্লেষণ করা গেলেও, দুই প্রকল্পের মধ্যে সরাসরি কার্যকর সংযোগ রয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে অতিরিক্ত প্রমাণ প্রয়োজন।

বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান ভারতের পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। মোংলা বন্দর ভারতের পশ্চিমবঙ্গ সীমান্তের কাছাকাছি হওয়ায় বন্দরটির উন্নয়ন ও পরিচালনব্যবস্থা নিয়ে ভারতের কৌশলগত মহলে আগ্রহ থাকা স্বাভাবিক। বাংলাদেশের বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্পে চীনের অংশগ্রহণও দীর্ঘদিন ধরে ভারতীয় নীতিনির্ধারকদের পর্যবেক্ষণের বিষয়।

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের আলোচনায় ‘স্ট্রিং অব পার্লস’ বা ‘মুক্তার মালা’ ধারণাটি ব্যবহার করা হয় ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের বন্দর ও অবকাঠামোগত উপস্থিতি নিয়ে সম্ভাব্য কৌশলগত উদ্বেগ বোঝাতে। পাকিস্তানের গোয়াদর, শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা এবং মিয়ানমারের কিয়াকফিউ প্রায়ই এ আলোচনায় আসে। তবে এসব বন্দরের মালিকানা, পরিচালনা ও সামরিক ব্যবহারের অবস্থা এক নয়। বাণিজ্যিক বন্দরে চীনা বিনিয়োগ থাকলেই সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে চীনের সামরিক ঘাঁটিতে পরিণত হয় না।

একইভাবে, মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন চীনের সামরিক নজরদারির সক্ষমতা বাড়াবে—এমন দাবি প্রতিষ্ঠা করতে হলে বন্দরের প্রকৃত ব্যবহার, নিরাপত্তা ব্যবস্থা, পরিচালন চুক্তি এবং সামরিক উপস্থিতির নির্ভরযোগ্য প্রমাণ প্রয়োজন। এ ধরনের প্রমাণ ছাড়া বন্দর উন্নয়নকে সরাসরি ভারতের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করা যথাযথ নয়।

মোংলা বন্দরের উন্নয়ন বাংলাদেশের জন্য অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করতে পারে। আধুনিক কনটেইনার টার্মিনাল ও পণ্য ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা চালু হলে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম আরও কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বন্দরকেন্দ্রিক পরিবহন, গুদামজাতকরণ, লজিস্টিকস এবং সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ও নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

অন্যদিকে, বিদেশি ঋণ নিয়ে বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক পরিকল্পনা গুরুত্বপূর্ণ। ঋণের সুদের হার ও পরিশোধের সময়সীমার পাশাপাশি প্রকল্পের মোট ব্যয়, নির্মাণের মান, পরিচালন ব্যয়, ভবিষ্যৎ আয় এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর সম্ভাব্য চাপ বিবেচনা করা প্রয়োজন। প্রকল্প থেকে প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক সুবিধা না এলে ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়তে পারে।

শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা বন্দরের অভিজ্ঞতা প্রায়ই চীনা ঋণ নিয়ে আন্তর্জাতিক বিতর্কে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়। তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে একই ধরনের পরিস্থিতি ঘটবে—এমন সিদ্ধান্ত কেবল ঋণচুক্তির ভিত্তিতে দেওয়া যায় না। প্রকল্পের আর্থিক কার্যকারিতা, ঋণ ব্যবস্থাপনা এবং সরকারের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সক্ষমতা বিশ্লেষণ করেই ঝুঁকি মূল্যায়ন করতে হবে।

বাংলাদেশের জন্য মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন একই সঙ্গে অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং আঞ্চলিক কূটনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। চীনা অর্থায়ন ব্যবহার করে অবকাঠামো উন্নয়ন করা হলেও প্রকল্পের শর্ত, পরিচালনব্যবস্থা, ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা এবং জাতীয় স্বার্থ রক্ষার বিষয়গুলোতে স্বচ্ছতা বজায় রাখা জরুরি।

ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, জাপানসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক ও কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে। এসব সম্পর্কের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে হলে কোনো একটি দেশের সঙ্গে সহযোগিতাকে অন্য দেশের বিরুদ্ধে অবস্থান হিসেবে বিবেচনা না করে বাংলাদেশের নিজস্ব অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

মোংলা বন্দরের আধুনিকায়নের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে প্রকল্পটি কতটা সময়মতো ও সাশ্রয়ীভাবে সম্পন্ন হয়, বন্দর ব্যবহারের সক্ষমতা কতটা বাড়ে এবং এর সুফল দেশের অর্থনীতি কতটা পায় তার ওপর। একই সঙ্গে ঋণের দায় ও পরিচালনসংক্রান্ত সিদ্ধান্তে বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। বঙ্গোপসাগরের ক্রমবর্ধমান কৌশলগত গুরুত্বের মধ্যে এই প্রকল্প তাই শুধু একটি অবকাঠামো উন্নয়ন উদ্যোগ নয়; এটি বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা, ঋণ ব্যবস্থাপনা ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়নেরও একটি পরীক্ষা।

মুয়াজ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

জাতীয় এর সর্বশেষ খবর

জাতীয় - এর সব খবর

উ
প
রে