×
ঢাকা, বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আমেরিকাকে উপেক্ষা করে বাংলাদেশকে চীনের উপহার 

২০২৬ সেপ্টেম্বর ৩০ ০৮:১০:০২
আমেরিকাকে উপেক্ষা করে বাংলাদেশকে চীনের উপহার 

নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশের জন্য নতুন একটি আঞ্চলিক বাণিজ্যপথ তৈরির সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে, যা চীনের ইউনান প্রদেশের রাজধানী কুনমিংকে মিয়ানমারের মান্দালয় হয়ে বাংলাদেশের সিলেট ও ঢাকার সঙ্গে যুক্ত করতে পারে। প্রস্তাবিত এই যোগাযোগব্যবস্থার সঙ্গে চট্টগ্রামের সংযোগও গড়ে তোলার কথা বলা হচ্ছে। পরে এ পথ ভারতের কলকাতা পর্যন্ত বিস্তৃত হওয়ার সম্ভাবনার কথাও উঠে এসেছে।

চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল, মিয়ানমার ও বাংলাদেশের মধ্যে পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে এমন একটি করিডোর চালু হলে আঞ্চলিক সরবরাহব্যবস্থায় পরিবর্তন আসতে পারে। বিশেষ করে বাংলাদেশের কৃষি খাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ সার আমদানির ক্ষেত্রে নতুন এই যোগাযোগপথকে সম্ভাবনাময় হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বাংলাদেশে কৃষি উৎপাদন সচল রাখতে ইউরিয়া ও ডিএপি সারের সরবরাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক বাজারে সারের দাম বৃদ্ধি, সরবরাহ সংকট এবং বিভিন্ন বৈশ্বিক সংকটের কারণে আমদানিনির্ভর দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে প্রায়ই অতিরিক্ত চাপের মুখে পড়তে হয়। এমন পরিস্থিতিতে সরবরাহের উৎস ও পরিবহনপথে বৈচিত্র্য আনার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশ বর্তমানে কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশ থেকে ইউরিয়া ও ডিএপি সার আমদানি করে। তবে আন্তর্জাতিক অস্থিরতা, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় এবং গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে সংকট তৈরি হলে এসব উৎস থেকে সরবরাহে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এ কারণে চীনকে বিকল্প সরবরাহকারী হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

চীন বিশ্বের অন্যতম বড় সার উৎপাদক হলেও দেশটির অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও বাজার পরিস্থিতির কারণে বিভিন্ন সময়ে সার রপ্তানিতে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। ফলে শুধু চীন থেকে সার পাওয়ার বিষয়টিই নয়, বরং চীনের সঙ্গে দ্রুত ও কম খরচে বাণিজ্য করার মতো নির্ভরযোগ্য পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তোলাও গুরুত্বপূর্ণ।

প্রস্তাবিত করিডোরের সবচেয়ে বড় সুবিধাগুলোর একটি হতে পারে পরিবহন সময় ও ব্যয় কমে যাওয়া। প্রতিবেদনে চট্টগ্রাম থেকে মিয়ানমার হয়ে কুনমিং পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার ২০০ কিলোমিটারের সরাসরি সড়ক যোগাযোগের সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। এই রুট কার্যকর হলে প্রায় ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পণ্য পরিবহনের সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

এ ধরনের যোগাযোগব্যবস্থা শুধু সার আমদানির ক্ষেত্রেই নয়, বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে অন্যান্য পণ্য পরিবহনেও ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে মিয়ানমার হয়ে দক্ষিণ-পশ্চিম চীনের বাজারের সঙ্গে বাংলাদেশের স্থলভিত্তিক যোগাযোগ আরও বিস্তৃত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

বাংলাদেশের জন্য এর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সরবরাহের বিকল্প পথ তৈরি করা। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে কোনো ধরনের অস্থিরতা তৈরি হলে সমুদ্রপথের ওপর নির্ভরশীল আমদানিতে সময় ও ব্যয় বেড়ে যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে স্থলভিত্তিক আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থা বিকল্প হিসেবে কাজ করতে পারে।

বিষয়টিকে বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেও দেখা হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়া ও ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীন, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্কের পরিবর্তনের মধ্যে বাংলাদেশও বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক বাড়ানোর চেষ্টা করছে। ইউনান-মিয়ানমার-বাংলাদেশ যোগাযোগপথ বাস্তবায়িত হলে চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে বাংলাদেশের সরাসরি অর্থনৈতিক যোগাযোগ আরও বাড়তে পারে।

তবে এই ধরনের করিডোর বাস্তবায়ন শুধু অর্থনৈতিক বিষয় নয়; এর সঙ্গে অবকাঠামো, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, মিয়ানমারের পরিস্থিতি, আঞ্চলিক কূটনীতি এবং ভারত-চীন সম্পর্কের মতো একাধিক বিষয় জড়িত। বিশেষ করে করিডোরটি যদি ভবিষ্যতে ভারত পর্যন্ত বিস্তৃত হয়, তাহলে এর কৌশলগত গুরুত্ব আরও বাড়তে পারে।

অর্থনৈতিক দিক থেকে করিডোরটি কার্যকর হলে বাংলাদেশ কৃষিপণ্য ও শিল্পের কাঁচামালসহ বিভিন্ন পণ্য আমদানিতে নতুন সুযোগ পেতে পারে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের পণ্য চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বাজারে পৌঁছানোর ক্ষেত্রেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

তবে করিডোর বাস্তবায়নের আগে অবকাঠামোগত সক্ষমতা, পরিবহন ব্যয়, সীমান্ত ও কাস্টমস প্রক্রিয়া, নিরাপত্তা এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর রাজনৈতিক সমঝোতার বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিও এ ধরনের আঞ্চলিক যোগাযোগ প্রকল্পের বাস্তবায়নে বড় фактор হতে পারে।

সব মিলিয়ে, ইউনান থেকে মিয়ানমার হয়ে বাংলাদেশ এবং সম্ভাব্যভাবে কলকাতা পর্যন্ত বিস্তৃত যোগাযোগব্যবস্থা বাস্তবায়িত হলে এটি শুধু একটি নতুন বাণিজ্যপথ হবে না; বরং বাংলাদেশের আমদানি সরবরাহব্যবস্থায় বৈচিত্র্য আনার সুযোগ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে সারসহ কৃষির গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ আমদানিতে নতুন উৎস ও রুট তৈরি হলে বৈশ্বিক সরবরাহ সংকটের সময় বাংলাদেশের ঝুঁকি কিছুটা কমানোর সুযোগ থাকতে পারে। তবে এই সম্ভাবনা বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে করিডোরের অবকাঠামো, সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সমঝোতা এবং আঞ্চলিক ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর।

মুয়াজ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

জাতীয় এর সর্বশেষ খবর

জাতীয় - এর সব খবর

উ
প
রে