×
ঢাকা, সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ব্যাংক সংস্কার ও আর্থিক স্থিতিশীলতায় বিশ্বব্যাংকের ঋণ

২০২৬ সেপ্টেম্বর ২৮ ২২:৩০:০৪
ব্যাংক সংস্কার ও আর্থিক স্থিতিশীলতায় বিশ্বব্যাংকের ঋণ

নিজস্ব প্রতিবেদক: উচ্চমাত্রার খেলাপি ঋণ, সুশাসনের ঘাটতি, তারল্য ও মূলধন সংকট এবং পুরোনো প্রযুক্তি ব্যবস্থার মতো একাধিক চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে দেশের ব্যাংকিং ও আর্থিক খাত। এমন পরিস্থিতিতে খাতটির স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানো এবং ব্যাংক সংস্কার কার্যক্রম জোরদারে ১ হাজার ২৬১ কোটি টাকার ঋণ সহায়তা দিচ্ছে বিশ্বব্যাংক।

‘ফিন্যান্সিয়াল সেক্টর সাপোর্ট প্রজেক্ট-২’ (এফএসএসপি-২)-এর আওতায় এ ঋণ দেওয়া হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দেশের আর্থিক খাতের সুরক্ষা জোরদার, প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিং ব্যবস্থা শক্তিশালী এবং ব্যাংকিং খাতের সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে সহায়তা মিলবে।

প্রকল্পটির আওতায় আইসিটি অবকাঠামোর উন্নয়ন, পারফরম্যান্সভিত্তিক শর্তাদির (পিবিসি) মাধ্যমে আর্থিক খাতের সুরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, ডিআইটিএফের আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ব্যাংক রেজল্যুশন ও ব্যাংক পুনর্গঠনের মাধ্যমে আর্থিক স্থিতিশীলতা উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় উপস্থাপনের প্রস্তুতি শেষ হয়েছে। মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) সকাল ১০টায় সচিবালয়ের মন্ত্রিসভাকক্ষে অনুষ্ঠিতব্য একনেক সভায় বিভিন্ন খাতের মোট ১৫টি প্রকল্পের সঙ্গে এ প্রকল্পটিও অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে। প্রধানমন্ত্রী ও একনেক চেয়ারম্যান তারেক রহমান সভায় সভাপতিত্ব করবেন।

পরিকল্পনা বিভাগের সচিব এস এম শাকিল আখতার জাগো নিউজকে বলেন, মঙ্গলবার সকাল ১০টায় একনেক সভা অনুষ্ঠিত হবে। সভায় মোট ১৫টি প্রকল্প উপস্থাপন করা হবে। ফিন্যান্সিয়াল সেক্টর সাপোর্ট প্রজেক্টটি একনেকের তালিকায় রাখা হয়েছে এবং এটি অনুমোদনের জন্য সুপারিশ করা হবে।

তিনি বলেন, আর্থিক খাতে স্থিতিশীলতার ঘাটতি, সম্পদের অপ্রতুলতা, প্রশাসনিক অদক্ষতা এবং দুর্বল প্রযুক্তিগত সক্ষমতাসহ বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। এসব সমস্যা দূর করাই প্রকল্পটির অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য।

পরিকল্পনা বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ২৬১ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন মাত্র ১৪ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। অবশিষ্ট অর্থ ঋণ হিসেবে দেবে বিশ্বব্যাংক। প্রকল্পটির বাস্তবায়নকাল ধরা হয়েছে ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০৩১ সালের জুন পর্যন্ত।

ব্যাংক খাতে বাড়ছে সংস্কারের প্রয়োজন

ব্যাংকিং ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা এবং অভ্যন্তরীণ চাহিদার পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের আর্থিক খাত দ্রুত রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যেই উচ্চমাত্রার নন-পারফর্মিং লোন বা খেলাপি ঋণ, সুশাসনের ঘাটতি এবং পুরোনো আইসিটি ব্যবস্থার কারণে ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতকে নানা ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

কিছু ব্যাংক, বিশেষ করে সরকারি ব্যাংক ও ইসলামী ব্যাংকগুলো তারল্য ও মূলধন সংকটে পড়েছে। এর ফলে কিছু ক্ষেত্রে ঋণাত্মক মূলধনের পরিস্থিতিও তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক টানাপোড়েন এসব সমস্যাকে আরও বাড়িয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে জিডিপির প্রবৃদ্ধির গতিতে এবং তৈরি হয়েছে পদ্ধতিগত ঝুঁকি।

অন্যদিকে ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতের তদারকি ব্যবস্থায় পুরোনো আইসিটি অবকাঠামো এবং সমন্বিত তথ্য ব্যবস্থাপনার ঘাটতি রয়েছে। ফলে সাইবার আক্রমণ ও সীমান্তপারের আর্থিক ঝুঁকির মতো নতুন ধরনের ঝুঁকি মোকাবিলা করা কঠিন হয়ে পড়ছে।

এসব চ্যালেঞ্জ সম্মিলিতভাবে আমানতকারীদের আস্থা এবং দেশের আর্থিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর চাপ তৈরি করছে। এসব সমস্যা মোকাবিলা করে আর্থিক খাতের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনাই এ প্রকল্পের মূল লক্ষ্য।

প্রযুক্তি অবকাঠামোতেই বড় ব্যয়

তবে প্রকল্পের কয়েকটি ব্যয় নিয়ে পরিকল্পনা কমিশনের আপত্তি রয়েছে। প্রকল্পের মোট ব্যয়ের একটি বড় অংশ বরাদ্দ রাখা হয়েছে প্রযুক্তি অবকাঠামো উন্নয়নে।

শুধু আইসিটি সরঞ্জাম কেনার জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৭১১ কোটি ৭১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। কম্পিউটার সফটওয়্যারের জন্য ৩৫৫ কোটি ৩৬ লাখ ৫ হাজার টাকা এবং ডেটাবেজ তৈরিতে ৭ কোটি ৬৪ লাখ ১৯ হাজার টাকা বরাদ্দ রয়েছে।

এ ছাড়া কম্পিউটার ও আনুষঙ্গিক সামগ্রী কেনায় আরও ১ কোটি ৫ লাখ ৪৬ হাজার টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা করা হয়েছে। মূলধন খাতে মোট বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১ হাজার ৭৭ কোটি ২৪ লাখ ৪৩ হাজার টাকা।

প্রশিক্ষণে ৭০ কোটি ৭৭ লাখ টাকা

ব্যাংক ও আর্থিক খাতের সক্ষমতা বাড়াতে প্রকল্পের আওতায় ৩ হাজার ৫৬৫ জনকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এ খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৭০ কোটি ৭৭ লাখ ৪৭ হাজার টাকা।

এর মধ্যে আইডিএর অর্থায়ন থাকবে ৬৭ কোটি ৭৭ লাখ ৪৭ হাজার টাকা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব অর্থায়ন থাকবে ৩ কোটি টাকা।

এ ছাড়া ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানভিত্তিক পরামর্শক নিয়োগের জন্য মোট ৯৪ কোটি ৪৩ লাখ ৬২ হাজার টাকা বরাদ্দ রয়েছে। এর মধ্যে ব্যক্তিগত পরামর্শকের জন্য ২৯ কোটি ৯ লাখ ৭৫ হাজার টাকা এবং প্রতিষ্ঠানভিত্তিক পরামর্শক সেবার জন্য ৬৫ কোটি ৩৩ লাখ ৮৭ হাজার টাকা ব্যয়ের সংস্থান রাখা হয়েছে।

প্রকল্পের রাজস্ব খাতে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১৮৮ কোটি ২৯ লাখ ২৯ হাজার টাকা। সেমিনার ও সম্মেলনের জন্য প্রায় ২০ কোটি টাকা এবং যানবাহন ব্যবহারের জন্য দেড় কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে।

তবে প্রকল্পের আওতায় নতুন গাড়ি কেনার সুযোগ রাখা হয়নি। প্রয়োজন হলে চুক্তিভিত্তিক পরিবহন ব্যবহার করা যাবে। এ ক্ষেত্রে অর্থ বিভাগের পূর্বানুমোদন নিতে হবে।

আগের প্রকল্পের যন্ত্রপাতিও কাজে লাগানোর উদ্যোগ

বাংলাদেশ ব্যাংকের আগের ফাইন্যান্সিয়াল সেক্টর সাপোর্ট প্রকল্পের ধারাবাহিকতায় নতুন এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগের প্রকল্পে ব্যবহারযোগ্য থাকা কিছু যন্ত্রপাতি নতুন কর্মসূচিতে স্থানান্তরের বিষয়ও বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে অচল কিংবা ব্যবহারের অনুপযোগী কোনো সামগ্রী নতুন প্রকল্পে নেওয়া যাবে না।

ব্যাংকিং খাতের তদারকি ও সংস্কারে জোর

প্রকল্পটির আওতায় আইসিটি অবকাঠামো উন্নয়ন এবং সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে ব্যাংক ও আর্থিক খাতের তদারকি ক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে। একই সঙ্গে আইসিটি কাঠামো আরও শক্তিশালী করা এবং এ অবকাঠামো উন্নয়নে প্রয়োজনীয় ক্রয় সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ থাকবে।

পারফরম্যান্সভিত্তিক শর্তাদি বা পিবিসির মাধ্যমে আর্থিক খাতের সুরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা হবে। পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতের সংস্কার কার্যক্রমেও সহায়তা দেওয়া হবে।

এ ছাড়া ডিপোজিট ইন্স্যুরেন্স কার্যক্রম পরিচালনার জন্য আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানো হবে। ব্যাংক রেজল্যুশন ও ব্যাংক পুনর্গঠনের কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে পেমেন্টের সময়কাল কমানো এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা জোরদারের উদ্যোগ থাকবে।

একই সঙ্গে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর শাসনব্যবস্থা উন্নত করা এবং সামগ্রিক আর্থিক স্থিতিশীলতা জোরদার করাও প্রকল্পটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম।

এসএ খান/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর

উ
প
রে