×
ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

যে যুদ্ধ বদলে দিলো ভারত-ইসরায়েল সম্পর্ক 

২০২৬ সেপ্টেম্বর ২৯ ০৮:২৭:৫৫
যে যুদ্ধ বদলে দিলো ভারত-ইসরায়েল সম্পর্ক 

নিজস্ব প্রতিবেদক: ভারত ও ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের আলোচনায় প্রায়ই উঠে আসে ১৯১৮ সালের হাইফা যুদ্ধের প্রসঙ্গ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে ২৩ সেপ্টেম্বর হাইফা শহর দখলের অভিযানে ভারতীয় অশ্বারোহী বাহিনীর সদস্যরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ব্রিটিশ নেতৃত্বাধীন মিত্রবাহিনীর অংশ হিসেবে জোধপুর ও মহীশূরসহ ভারতীয় রাজ্যগুলোর অশ্বারোহী ইউনিট ওই অভিযানে অংশ নেয়। বর্তমানে ভারতীয় সেনাবাহিনীর ৬১তম ক্যাভালরি রেজিমেন্টও ২৩ সেপ্টেম্বর ‘হাইফা দিবস’ হিসেবে দিনটি স্মরণ করে।

তবে এই ইতিহাসকে বর্তমান ভারত-ইসরায়েল সম্পর্কের সঙ্গে কীভাবে উপস্থাপন করা হবে, তা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রকাশনায় হাইফায় ভারতীয় সৈন্যদের ভূমিকা স্মরণ করা হয়েছে এবং ২০১৮ সালে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ভারত সফরের সময় নয়াদিল্লির ঐতিহাসিক তিনমূর্তি চকের নাম পরিবর্তন করে ‘তিনমূর্তি-হাইফা চক’ করা হয়। সে সময় হাইফার যুদ্ধে ভারতীয় সৈন্যদের ভূমিকা দুই দেশের সম্পর্কের ঐতিহাসিক যোগসূত্র হিসেবেও তুলে ধরা হয়েছিল।

কিন্তু ফিলিস্তিনি পক্ষ এই বর্ণনার একটি গুরুত্বপূর্ণ শব্দ নিয়ে আপত্তি তুলেছে—‘মুক্তি’। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে ভারতে নিযুক্ত ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রদূত আবদুল্লাহ এম আবুশাওয়েশ এবং ফিলিস্তিনি দূতাবাস ১৯১৮ সালের ঘটনাকে ‘হাইফার মুক্তি’ হিসেবে বর্ণনার বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তাদের বক্তব্যের মূল বিষয় হলো, যুদ্ধের সময় হাইফা ছিল অটোমান শাসনের অধীন ফিলিস্তিনের একটি শহর এবং ভারত তখন স্বাধীন রাষ্ট্র ছিল না। ভারতীয় সৈন্যরা ব্রিটিশ নেতৃত্বাধীন সামরিক কাঠামোর অংশ হিসেবেই ওই অভিযানে অংশ নিয়েছিলেন।

ফিলিস্তিনি দূতাবাসের যুক্তি, ১৯১৮ সালের সামরিক অভিযানের পর হাইফা ও বৃহত্তর ফিলিস্তিন ব্রিটিশ সামরিক প্রশাসনের অধীনে চলে যায়। ফলে ঘটনাটিকে বর্তমান ইসরায়েলের ‘মুক্তি’ হিসেবে বর্ণনা করলে ওই সময়কার ঔপনিবেশিক বাস্তবতা আড়ালে পড়ে যেতে পারে। দূতাবাস অবশ্য ভারতীয় সৈন্যদের সাহস ও আত্মত্যাগকে অস্বীকার করছে না; তাদের আপত্তি মূলত ঘটনাটির ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক ব্যাখ্যা নিয়ে।

এখানে ইতিহাসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ১৯১৮ সালে ‘ভারত’ স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে কোনো সামরিক সিদ্ধান্ত নেয়নি। জোধপুর, মহীশূর ও অন্যান্য ভারতীয় রাজ্যের বাহিনী ব্রিটিশ সামরিক কমান্ডের অধীনে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের বৃহত্তর অভিযানের অংশ ছিল। ভারতের সরকারি একটি ২০১৪ সালের যুদ্ধস্মারক প্রকাশনাতেও হাইফা সম্পর্কে ‘fortified town of Haifa fell to a cavalry charge’ এবং শহরটি ‘took’ করার মতো ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে; সেখানে ঘটনাটিকে আধুনিক অর্থে ‘ভারত ইসরায়েলকে মুক্ত করেছিল’—এমন ভাষা ব্যবহার করা হয়নি।

অন্যদিকে, ভারতীয় ও ইসরায়েলি বর্ণনায় যুদ্ধটির সামরিক গুরুত্বও আলাদা করে তুলে ধরা হয়। ১৯১৮ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর জোধপুর ও মহীশূর ল্যান্সাররা অটোমান বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযানে অংশ নেয় এবং হাইফা দখলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ভারতীয় অশ্বারোহীদের এই অভিযান সামরিক ইতিহাসে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হয়। ভারতীয় সেনাবাহিনী ও ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ প্রতিবছর ওই সৈন্যদের স্মরণ করে।

ভারতীয় মুসলিমদের ইতিহাসের ক্ষেত্রেও প্রথম বিশ্বযুদ্ধের এই সময়টি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অটোমান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে ব্রিটিশ যুদ্ধ এবং খিলাফত প্রশ্ন পরবর্তী সময়ে ভারতীয় মুসলিম রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলে। ফলে হাইফার যুদ্ধকে শুধু ভারত-ইসরায়েল সম্পর্কের প্রাথমিক অধ্যায় হিসেবে দেখলে ওই সময়কার ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার একটি অংশ বাদ পড়ে যায়।

বর্তমান সময়ে ভারত ও ইসরায়েলের মধ্যে প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি, বাণিজ্য ও কূটনৈতিক সহযোগিতা উল্লেখযোগ্যভাবে বিস্তৃত হয়েছে। ২০১৮ সালে নেতানিয়াহুর ভারত সফরের সময় দুই দেশ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নয়টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করে এবং তিনমূর্তি চকের নামের সঙ্গে ‘হাইফা’ যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেয়। এর ফলে ১৯১৮ সালের যুদ্ধের স্মৃতি দুই দেশের আধুনিক কূটনৈতিক সম্পর্কের প্রতীক হিসেবেও আরও দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।

তবে ইতিহাসের একই ঘটনাকে ভিন্ন রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক অবস্থান থেকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। ভারতীয় দৃষ্টিকোণ থেকে হাইফা দিবস মূলত ভারতীয় সৈন্যদের বীরত্ব ও আত্মত্যাগের স্মরণ। ইসরায়েলি দৃষ্টিভঙ্গিতে এটি শহরটির ইতিহাসে ভারতীয় সৈন্যদের ভূমিকা এবং ভারত-ইসরায়েল সম্পর্কের একটি স্মারক। আর ফিলিস্তিনি পক্ষের প্রশ্নটি হলো—১৯১৮ সালের সেই সামরিক অভিযানকে ‘মুক্তি’ বলা হলে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন ও তৎকালীন ফিলিস্তিনের রাজনৈতিক বাস্তবতা যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয় কি না।

অতএব, হাইফা দিবসের ইতিহাসকে শুধু ভারত-ইসরায়েল বন্ধুত্বের সূচনা হিসেবে দেখলে বিষয়টির একটি অংশই সামনে আসে। ভারতীয় সৈন্যদের সামরিক অবদান যেমন ঐতিহাসিকভাবে নথিভুক্ত, তেমনি সেই যুদ্ধের ঔপনিবেশিক প্রেক্ষাপটও অস্বীকার করার সুযোগ নেই। বিতর্কের মূল জায়গাটি তাই সৈন্যদের বীরত্ব নিয়ে নয়; বরং এক শতাব্দী আগের একটি যুদ্ধকে বর্তমান ভারত-ইসরায়েল সম্পর্কের সঙ্গে কী ভাষায় এবং কোন ঐতিহাসিক কাঠামোর মধ্যে উপস্থাপন করা হবে—সেটি নিয়ে।

মুয়াজ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

আন্তর্জাতিক এর সর্বশেষ খবর

আন্তর্জাতিক - এর সব খবর

উ
প
রে