×
ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ইরানের আকাশে নেমে এলো অদৃশ্য অবরোধ!

২০২৬ সেপ্টেম্বর ২৪ ১৮:৪৫:৩৯
ইরানের আকাশে নেমে এলো অদৃশ্য অবরোধ!

নিজস্ব প্রতিবেদক: ইরানের বিমান চলাচল খাতকে লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞা দেশটির আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়িক নেটওয়ার্কের ওপর চাপ আরও বাড়িয়েছে। ৮ সেপ্টেম্বর মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়ের বৈদেশিক সম্পদ নিয়ন্ত্রণ দপ্তর (OFAC) ইরানের বিমান চলাচল খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ৩৬টি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনে। এর মধ্যে ২৭টি ইরানি এয়ারলাইন রয়েছে।

মার্কিন ট্রেজারি জানিয়েছে, ইরানের বিমান চলাচল খাত দেশটির সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমে ব্যবহৃত হচ্ছে—এমন অভিযোগের ভিত্তিতেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এর আগে ২৪ আগস্ট ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’ নামে ইরানের বিরুদ্ধে ব্যাপক অর্থনৈতিক চাপের কর্মসূচি ঘোষণা করেছিলেন মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট। এর আওতায় বিমান চলাচলসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতকে নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনার কথা জানানো হয়।

নতুন নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে এয়ার শিরাজ, ইরান আসমান এয়ারলাইনস, কিশ এয়ারলাইনস, কেশম এয়ার, সেপেহরান এয়ারলাইনস, জাগ্রোস এয়ারলাইনসসহ আরও কয়েকটি ইরানি বিমান সংস্থা। মার্কিন কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, এসব বিমান সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট নেটওয়ার্কের কিছু অংশ ইরানের সামরিক ও নিরাপত্তা কাঠামোর সঙ্গে সম্পর্কিত কার্যক্রমে সহায়তা করে।

এর আগে জুলাইয়েও মেহান এয়ারের সঙ্গে কাজ করা চীন, ভারত, রাশিয়া ও ইরানভিত্তিক কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন ট্রেজারির ভাষ্য অনুযায়ী, এসব প্রতিষ্ঠান বিমান সংস্থাটিকে বাণিজ্যিক, আর্থিক ও লজিস্টিক সহায়তা দিচ্ছিল।

নতুন মার্কিন নীতির গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করা তৃতীয় দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি তৈরি করা। মার্কিন ট্রেজারি জানিয়েছে, ইরানের নিষেধাজ্ঞা এড়ানো বা দেশটির নির্দিষ্ট কার্যক্রমে সহায়তা করা বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার হারানোর ঝুঁকিতে পড়তে পারে। একই সঙ্গে ইরানের সঙ্গে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া প্রতিষ্ঠানের জন্য ‘সেকেন্ডারি স্যাংশন’ বা দ্বিতীয় পর্যায়ের নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি বাড়ানোর কথাও জানিয়েছে ওয়াশিংটন।

এর ফলে ইরানের বিমান সংস্থাগুলোর সঙ্গে কাজ করা বিদেশি ব্যাংক, সরবরাহকারী, এজেন্ট ও অন্যান্য বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের জন্য অতিরিক্ত ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক অর্থ লেনদেন ও মার্কিন বাজারে ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিষেধাজ্ঞার সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনা করতে হচ্ছে।

ইরানের বিমান পরিবহন খাত দীর্ঘদিন ধরেই নিষেধাজ্ঞার মধ্যে রয়েছে। নতুন পদক্ষেপের ফলে বিমান রক্ষণাবেক্ষণ, যন্ত্রাংশ সংগ্রহ, আর্থিক লেনদেন এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও জটিল হতে পারে।

মার্কিন নিষেধাজ্ঞার একটি বড় প্রভাব হতে পারে বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর ইরানি এয়ারলাইনগুলোর সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক নিয়ে সতর্ক হয়ে ওঠা। এর আগে মেহান এয়ারকে ঘিরে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একই ধরনের নিষেধাজ্ঞা ও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

তবে নিষেধাজ্ঞা মানেই ইরানের সব আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল তাৎক্ষণিকভাবে সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়। কোন এয়ারলাইন, কোন রুট, কোন সেবা বা কোন প্রতিষ্ঠান নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছে, তার ওপর বাস্তব প্রভাব নির্ভর করে।

ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক নিষেধাজ্ঞা শুধু বিমান পরিবহনেই সীমাবদ্ধ নয়। আগস্ট থেকে ওয়াশিংটন ইরানের অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বিভিন্ন অংশকে লক্ষ্য করে নিষেধাজ্ঞার পরিধি বাড়িয়েছে। সেপ্টেম্বরেও ইরানের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি রুশ ব্যাংক ও বিভিন্ন আর্থিক নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

মার্কিন প্রশাসনের লক্ষ্য হলো ইরানের আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ও আর্থিক নেটওয়ার্কে প্রবেশাধিকার সীমিত করা। অন্যদিকে ইরান ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো দীর্ঘদিন ধরেই বিকল্প বাণিজ্যিক ও আর্থিক পথ ব্যবহার করে নিষেধাজ্ঞার প্রভাব মোকাবিলার চেষ্টা করছে।

বিমান পরিবহন খাতে দীর্ঘমেয়াদি নিষেধাজ্ঞার প্রভাব শেষ পর্যন্ত সাধারণ যাত্রীদের ওপরও পড়তে পারে। বিমান চলাচলের খরচ বাড়া, যন্ত্রাংশ সংগ্রহে সমস্যা, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক রুট পরিচালনায় সীমাবদ্ধতা তৈরি হলে যাত্রীসেবা ও বিমান সংস্থাগুলোর পরিচালন ব্যয়ে চাপ বাড়তে পারে।

তবে সাধারণ মানুষের ওপর নিষেধাজ্ঞার প্রভাব কতটা হবে এবং তা রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটাতে সক্ষম হবে কি না—এ বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত দেওয়ার মতো প্রমাণ আলাদাভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। মার্কিন প্রশাসন নিষেধাজ্ঞাকে ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ তৈরির হাতিয়ার হিসেবে বর্ণনা করছে।

ইরানের বিমান পরিবহন খাতে নতুন নিষেধাজ্ঞা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক বিরোধকে আরও বিস্তৃত করেছে। বিশেষ করে তৃতীয় দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি বাড়ানোর নীতি আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোকে ইরানের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে হিসাব করতে বাধ্য করতে পারে।

ফলে বিষয়টি শুধু ইরানের বিমান পরিবহন খাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না; আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং, বাণিজ্য, পরিবহন ও সরবরাহব্যবস্থার ওপরও এর প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে ইরান কীভাবে এই চাপ মোকাবিলা করবে এবং অন্যান্য দেশ ও প্রতিষ্ঠান কতটা যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা মেনে চলবে—তা আগামী দিনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

মুয়াজ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

আন্তর্জাতিক এর সর্বশেষ খবর

আন্তর্জাতিক - এর সব খবর



রে