×
ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

৬ পরিবারের হাতে দেশের ব্যাংক খাত, সংকট কাটাতে ৩ প্রস্তাব

২০২৬ সেপ্টেম্বর ২৪ ০৮:৫৯:৪০
৬ পরিবারের হাতে দেশের ব্যাংক খাত, সংকট কাটাতে ৩ প্রস্তাব

নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ এখন বড় উদ্বেগের বিষয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। মার্চ শেষে খেলাপি ঋণ ছিল ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা।

এই বিশাল খেলাপি ঋণের মধ্যে কয়েকটি বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর ব্যাংকঋণ ও ঋণখেলাপির বিষয়টি বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি অভ্যন্তরীণ বিশ্লেষণে ছয়টি বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠী/ব্যক্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঋণের কারণে বিভিন্ন ব্যাংকের ঝুঁকির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তালিকায় রয়েছে—এস আলম গ্রুপ, আরামিট গ্রুপ, বেক্সিমকো গ্রুপ, সিকদার গ্রুপ, নাসা গ্রুপ ও ওরিয়ন গ্রুপ।

১. এস আলম গ্রুপ

চট্টগ্রামের মোহাম্মদ সাইফুল আলমের নেতৃত্বাধীন এস আলম গ্রুপ ব্যাংকিং খাতে সবচেয়ে বেশি আলোচিত ব্যবসায়ী গোষ্ঠীগুলোর একটি। বিভিন্ন ব্যাংকে গ্রুপটির ঋণ ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ঋণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা ও তদন্ত হয়েছে।

বিশেষ করে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশসহ কয়েকটি ব্যাংকের সঙ্গে এস আলম-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ঋণ ও মালিকানা সম্পর্ক নিয়ে বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন উঠেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ছয়টি ঝুঁকিপূর্ণ গ্রুপসংক্রান্ত বিশ্লেষণেও এস আলমের নাম রয়েছে।

২০২৬ সালে সরকার ও ব্যাংকগুলো যেসব বড় ঋণখেলাপির অর্থ ও বিদেশে পাচার হওয়া সম্পদ শনাক্ত ও উদ্ধারের উদ্যোগ নিয়েছে, সেখানেও এস আলম-সংশ্লিষ্ট ঋণের বিষয়টি রয়েছে। অর্থমন্ত্রী সংসদে জানিয়েছিলেন, কয়েকটি বড় মামলার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইন প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় অর্থ ও সম্পদ উদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

২. আরামিট গ্রুপ

দ্বিতীয় নাম আরামিট গ্রুপ। চট্টগ্রামভিত্তিক এই শিল্পগোষ্ঠীর সঙ্গে সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর নামও বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে।

ছয়টি বড় শিল্পগোষ্ঠী নিয়ে ব্যাংকগুলোর অনুসন্ধান ও অর্থ উদ্ধারের উদ্যোগে আরামিট গ্রুপকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ব্যাংকগুলোর লক্ষ্য হলো সংশ্লিষ্ট ঋণ, সম্পদ ও বিদেশে থাকা সম্ভাব্য সম্পদের তথ্য সংগ্রহ করে আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অর্থ উদ্ধারের সুযোগ তৈরি করা।

৩. বেক্সিমকো গ্রুপ

বেক্সিমকো গ্রুপ বাংলাদেশের অন্যতম বড় শিল্পগোষ্ঠী। গ্রুপটির ব্যাংকঋণ নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনার কারণ হলো বিভিন্ন ব্যাংকে বড় অঙ্কের ঋণ এবং এর একটি উল্লেখযোগ্য অংশের খেলাপি হওয়ার তথ্য।

জনতা ব্যাংকে বেক্সিমকো গ্রুপের ঋণের পরিমাণ প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা, যার পুরোটাই খেলাপি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বিভিন্ন ব্যাংক মিলিয়ে গ্রুপটির মোট ঋণের পরিমাণ প্রায় ৫৩ হাজার ৪২ কোটি টাকা বলা হয়েছে এবং এর বড় অংশ খেলাপি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

৪. সিকদার গ্রুপ

চতুর্থ গ্রুপ হলো সিকদার গ্রুপ। প্রয়াত জয়নুল হক সিকদারের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এই ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর নামও ব্যাংকিং খাতের বড় ঋণসংক্রান্ত আলোচনায় এসেছে।

ব্যাংকগুলো ছয়টি বড় শিল্পগোষ্ঠীর ঋণ ও বিদেশে থাকা সম্ভাব্য সম্পদ শনাক্তের জন্য যে উদ্যোগ নিয়েছে, সিকদার গ্রুপও সেই অনুসন্ধানের আওতায় রয়েছে।

৫. নাসা গ্রুপ

নাসা গ্রুপ বাংলাদেশের আরেকটি আলোচিত ব্যবসায়ী গোষ্ঠী। গ্রুপটির চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার দীর্ঘ সময় বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (BAB) চেয়ারম্যান ছিলেন। নাসা গ্রুপের ঋণের পরিমাণ প্রায় ৯ হাজার ২১৪ কোটি টাকা এবং এর প্রায় পুরোটাই খেলাপি বলে জানা গেছে।

৬. ওরিয়ন গ্রুপ

ষষ্ঠ গ্রুপ হলো ওরিয়ন গ্রুপ। বাংলাদেশের বিভিন্ন খাতের ব্যবসায় যুক্ত এই শিল্পগোষ্ঠীর ঋণও একাধিক ব্যাংকের সঙ্গে সম্পর্কিত ।

২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে তৈরি একটি অগ্রগতি প্রতিবেদনে ওরিয়ন ও এর স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ঋণের পরিমাণ প্রায় ১০ হাজার ১২ কোটি টাকা উল্লেখ করা হয়েছিল। গ্রুপটির কারণে একাধিক ব্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথাও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

ঋণ ও সম্ভাব্য বিদেশি সম্পদের তথ্য সংগ্রহের জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে NDA করার উদ্যোগ নিয়েছে।

ব্যাংকের মালিকানা ও পরিচালনা পর্ষদে একই পরিবারের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব থাকলে স্বার্থের সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে কোনো পরিবার একই সঙ্গে ব্যাংকের বড় শেয়ারধারক, পরিচালক এবং সংশ্লিষ্ট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিক হলে ব্যাংকের ঋণ সিদ্ধান্তে স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।

এ কারণে ব্যাংকের মালিকানা এবং ব্যবস্থাপনার মধ্যে একটি কার্যকর দূরত্ব রাখার প্রস্তাব রয়েছে। মালিকরা শেয়ারহোল্ডার হিসেবে তাঁদের অধিকার রাখবেন, কিন্তু ব্যাংকের দৈনন্দিন ব্যবস্থাপনা ও ঋণ সিদ্ধান্ত পেশাদার এবং স্বাধীন ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পরিচালিত হওয়া উচিত—এমন মত রয়েছে।

একই পরিবারের একাধিক সদস্য দীর্ঘদিন ধরে পরিচালনা পর্ষদে থাকলে ব্যাংকের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মধ্যে কেন্দ্রীভূত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই পরিচালক নিয়োগ, মেয়াদ এবং একই পরিবার থেকে পরিচালকের সংখ্যা নিয়ে কার্যকর সীমা ও জবাবদিহিতা গুরুত্বপূর্ণ।

ব্যাংকিং খাতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো Related Party Lending, অর্থাৎ ব্যাংকের পরিচালক, বড় শেয়ারধারক, তাঁদের পরিবার বা তাঁদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ব্যাংকের ঋণসম্পর্ক।

নীতিমালার আওতায় এ ধরনের ঋণ পুরোপুরি নিষিদ্ধ নয়; তবে এতে স্বার্থের সংঘাতের ঝুঁকি বেশি হওয়ায় কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও স্বচ্ছতা প্রয়োজন। ব্যাংকের মালিক বা পরিচালক যদি নিজের নিয়ন্ত্রণাধীন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের জন্য ব্যাংক থেকে বড় অঙ্কের ঋণ নেন, তাহলে ঋণের ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বাধীনতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এ ধরনের ঋণ পরবর্তীতে খেলাপি হলে ব্যাংকের অর্থ উদ্ধারের ক্ষেত্রেও জটিলতা তৈরি হতে পারে। তাই ঋণ অনুমোদনের সময় প্রকৃত ব্যবসায়িক সক্ষমতা, জামানত, নগদ প্রবাহ এবং পরিশোধের সক্ষমতা যাচাই করা জরুরি।

অন্যদিকে কোনো ব্যাংকের আর্থিক দুর্বলতার খবর ছড়িয়ে পড়লে আমানতকারীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হতে পারে। আমানতকারীরা একসঙ্গে অর্থ তুলে নিতে চাইলে ব্যাংকের তারল্যের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে।

ফলে খেলাপি ঋণ কমানো শুধু ব্যাংকের হিসাব ঠিক করার বিষয় নয়; এর সঙ্গে আমানতকারীদের আস্থা, বিনিয়োগ, ব্যবসা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাও জড়িত।

ব্যাংকিং খাতের সংকট থেকে বের হতে শুধু নতুন অর্থ বা তারল্য সহায়তা যথেষ্ট নয়। কাঠামোগত সংস্কারের পাশাপাশি ব্যাংক পরিচালনায় জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে তিনটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

মালিকানা ও পরিচালনার মধ্যে বিভাজন

ব্যাংকের মালিকানা ও ব্যবস্থাপনার মধ্যে স্পষ্ট সীমারেখা তৈরি করা প্রয়োজন। বড় শেয়ারধারকরা তাঁদের মালিকানাগত অধিকার রাখলেও ব্যাংকের পেশাদার ব্যবস্থাপনা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং ঋণ অনুমোদনে স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে।

পরিচালনা পর্ষদে স্বাধীন ও যোগ্য ব্যক্তিদের অংশগ্রহণ বাড়ানো গেলে ব্যাংকের সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভারসাম্য তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে পরিচালকদের স্বার্থের সংঘাত ও সংশ্লিষ্ট পক্ষকে দেওয়া ঋণের ওপর কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।

পরিবারভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ সীমিত করা

একটি পরিবারের হাতে দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রীভূত হয়ে থাকলে জবাবদিহিতা দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই একই পরিবার থেকে পরিচালকের সংখ্যা ও মেয়াদ যৌক্তিক পর্যায়ে সীমিত রাখার প্রস্তাব রয়েছে।

পরিচালকদের যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাঁদের ব্যবসায়িক স্বার্থের তথ্য প্রকাশ ও পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থাও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।

দুর্বল ব্যাংক একীভূত বা পুনর্গঠন

দীর্ঘদিন ধরে দুর্বল অবস্থায় থাকা ব্যাংকগুলোকে অনির্দিষ্টকাল সহায়তা দিয়ে টিকিয়ে রাখার পরিবর্তে প্রয়োজন অনুযায়ী পুনর্গঠন, একীভূতকরণ বা রেজোলিউশনের আওতায় আনার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।

তবে একীভূতকরণ মানেই সমস্যার সমাধান নয়। একটি দুর্বল ব্যাংককে শক্তিশালী ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত করার আগে তার প্রকৃত সম্পদ, দায়, খেলাপি ঋণ ও মূলধন ঘাটতি নির্ধারণ করতে হবে। পাশাপাশি আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা এবং দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনার বিষয়টিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

ব্যাংকিং খাতের সংকটকে শুধু কয়েকটি ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর ঋণ দিয়ে ব্যাখ্যা করলে সমস্যার পূর্ণ চিত্র পাওয়া যাবে না। ব্যাংকের ঋণ অনুমোদন ব্যবস্থা, পরিচালনা পর্ষদের স্বাধীনতা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ, অডিট ব্যবস্থা এবং ঋণ আদায়ের আইনি কাঠামো—সবকিছুর কার্যকারিতার সঙ্গে খেলাপি ঋণের বিষয়টি জড়িত।

বড় ঋণগ্রহীতাদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের পাশাপাশি ভবিষ্যতে যাতে একই ধরনের ঝুঁকি তৈরি না হয়, সে জন্য ঋণ দেওয়ার আগে যথাযথ যাচাই এবং ঋণ দেওয়ার পর নিয়মিত পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করা জরুরি।

সব মিলিয়ে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতকে স্থিতিশীল করতে প্রয়োজন স্বচ্ছ মালিকানা কাঠামো, স্বাধীন পরিচালনা, সীমিত পরিবারভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ, Related Party Lending-এর কঠোর তদারকি, শক্তিশালী ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং দুর্বল ব্যাংকের দ্রুত রেজোলিউশন। এসব সংস্কার কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে ব্যাংকিং খাতে আমানতকারীদের আস্থা পুনর্গঠন এবং দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক স্থিতিশীলতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।

মুয়াজ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর



রে