×
ঢাকা, বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন চাপের আভাস, এডিবির প্রতিবেদনে যা বলা হলো

২০২৬ সেপ্টেম্বর ২৩ ১০:৫০:৪৮
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন চাপের আভাস, এডিবির প্রতিবেদনে যা বলা হলো

নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশের অর্থনীতি ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ানোর পথে থাকলেও মূল্যস্ফীতি নিয়ে নতুন করে সতর্কবার্তা দিয়েছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। সংস্থাটির সর্বশেষ ‘এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট আউটলুক সেপ্টেম্বর ২০২৬’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশে উন্নীত হতে পারে। তবে একই সময়ে মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯ শতাংশে পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে।

বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত এডিবির প্রতিবেদনে বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির বিভিন্ন সূচক এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ছিল ৩ দশমিক ৫ শতাংশ। পরের অর্থবছর ২০২৫-২৬-এ তা বেড়ে ৩ দশমিক ৭ শতাংশ হতে পারে। এরপর ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশে উন্নীত হওয়ার পূর্বাভাস দিয়েছে সংস্থাটি।

তবে প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি মূল্যস্ফীতির চিত্র নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এডিবি। সংস্থাটির হিসাবে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি প্রায় ১০ শতাংশ থাকলেও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা কমে ৮ দশমিক ৭ শতাংশে নামতে পারে। কিন্তু ২০২৬-২৭ অর্থবছরে আবার তা বেড়ে ৯ শতাংশে দাঁড়ানোর আশঙ্কা রয়েছে।

এডিবির পূর্বাভাস অনুযায়ী, মূল্যস্ফীতি বাড়ার পেছনে জ্বালানি সংকট বড় ভূমিকা রাখতে পারে। জ্বালানির সরবরাহে সমস্যা হলে উৎপাদন থেকে শুরু করে পরিবহন পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে ব্যয় বাড়তে পারে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত পণ্য ও সেবার দামে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলে সম্ভাব্য বিঘ্ন এবং খাদ্যপণ্যের ওপর ‘এল নিনো’র বিলম্বিত প্রভাবও মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়াতে পারে।

এ ছাড়া ধীরে ধীরে মুদ্রানীতি শিথিল হওয়ার বিষয়টিকেও মূল্যস্ফীতির জন্য একটি সম্ভাব্য ঝুঁকি হিসেবে দেখছে এডিবি। অর্থাৎ অর্থনীতিতে চাহিদা বাড়লেও যদি উৎপাদন ও সরবরাহ সেই হারে না বাড়ে, তাহলে পণ্য ও সেবার দামে বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে।

এডিবির কান্ট্রি ডিরেক্টর চিংফেং ঝাং বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে। তবে এই পুনরুদ্ধার এখনো বাহ্যিক অভিঘাত এবং দেশের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কারণে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। তাঁর মতে, সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, আর্থিক খাত, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং ব্যবসায়িক পরিবেশে সংস্কার দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য বর্তমান সময়টি গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি আরও বলেন, বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো এবং মানসম্মত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে এসব সংস্কার গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে বাংলাদেশকে আরও শক্তিশালী, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বহিঃআঘাত মোকাবিলায় সক্ষম প্রবৃদ্ধির পথে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হতে পারে। এসব সংস্কার বাস্তবায়নে বাংলাদেশকে সহযোগিতা করতে এডিবি প্রস্তুত বলেও জানান তিনি।

অন্যদিকে, আমদানির প্রবৃদ্ধি রপ্তানির তুলনায় বেশি হওয়ায় চলতি হিসাবের ঘাটতিও বাড়তে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে এডিবি। সংস্থাটির হিসাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে চলতি হিসাবের ঘাটতি জিডিপির ০ দশমিক ৩ শতাংশ হতে পারে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে তা বেড়ে ০ দশমিক ৬ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।

তবে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যেও রেমিট্যান্স প্রবাহ তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকার প্রত্যাশা করছে এডিবি। শক্তিশালী রেমিট্যান্স প্রবাহ এবং পর্যাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাংলাদেশের বৈদেশিক খাতের স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে সহায়তা করতে পারে। তবে এ স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে পর্যাপ্ত আর্থিক প্রবাহ, বিনিময় হারের নমনীয়তা এবং বিচক্ষণ সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন হবে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।

২০২৬-২৭ অর্থবছরে কৃষি ও সেবা খাত প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছে এডিবি। তবে শিল্প ও বিনিয়োগ খাতের সামনে বেশ কিছু বাধা রয়েছে। উচ্চ ঋণ গ্রহণের ব্যয়, ঋণ পাওয়ার সীমাবদ্ধতা, জ্বালানি সংকট, দুর্বল বৈদেশিক চাহিদা এবং বিভিন্ন কাঠামোগত সমস্যার কারণে এ খাতের প্রবৃদ্ধি সীমিত হতে পারে।

এডিবি আরও বলছে, রেমিট্যান্সনির্ভর বেসরকারি ভোগ দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে অব্যাহত থাকতে পারে। তবে মূল্যস্ফীতি দীর্ঘস্থায়ী হলে পরিবারের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকবে। ফলে আয় বাড়লেও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবার মূল্য বেশি থাকায় মানুষের ওপর জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপ অব্যাহত থাকতে পারে।

এদিকে বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য বেশ কয়েকটি নিম্নমুখী ঝুঁকির কথাও উল্লেখ করেছে এডিবি। এর মধ্যে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের উচ্চমূল্য, বিশ্বজুড়ে জাহাজ চলাচলে বাড়তি বিঘ্ন, কঠোর বাণিজ্য বিধিনিষেধ এবং বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি বাজারগুলোতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধীরগতি।

এর সঙ্গে বিনিময় হারের ওপর চাপ, ব্যাংক খাতের বাড়তি সংকট, রাজস্ব সংস্কারে বিলম্ব, প্রত্যাশার তুলনায় কম উন্নয়ন ব্যয় এবং জলবায়ুজনিত বিভিন্ন অভিঘাতও অর্থনীতির জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এসব ঝুঁকি বাস্তবায়িত হলে প্রবৃদ্ধির গতি কমার পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি দীর্ঘ সময় উচ্চ পর্যায়ে থাকার আশঙ্কা রয়েছে।

সব মিলিয়ে এডিবির পূর্বাভাসে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনার পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি ও জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে সতর্কতার বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। একদিকে প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশে উন্নীত হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশে ওঠার আশঙ্কা অর্থনীতির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে সামনে আসছে।

মুয়াজ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

অর্থনীতি এর সর্বশেষ খবর

অর্থনীতি - এর সব খবর



রে