×
ঢাকা, শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

স্বাধীনতা হারানোর নেপথ্য গল্প- যেভাবে হারিয়ে গেল এক রাজার দেশ

২০২৬ সেপ্টেম্বর ১৮ ১২:১১:২৯
স্বাধীনতা হারানোর নেপথ্য গল্প- যেভাবে হারিয়ে গেল এক রাজার দেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক: একসময় হিমালয়ের কোলে নিজস্ব রাজতন্ত্র ও শাসনব্যবস্থা নিয়ে টিকে ছিল সিকিম। চোগিয়ালদের শাসনে দীর্ঘ সময় ধরে আলাদা রাজনৈতিক সত্তা হিসেবে থাকা এই ভূখণ্ড শেষ পর্যন্ত ভারতের একটি অঙ্গরাজ্যে পরিণত হয়। সিকিমের ভারতভুক্তি ছিল কোনো একক ঘটনার ফল নয়; বরং ব্রিটিশ আমলের চুক্তি, ভারতের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান সম্পর্ক, আঞ্চলিক নিরাপত্তা, রাজতন্ত্রবিরোধী গণআন্দোলন এবং ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।

সিকিমের রাজতন্ত্রের সূচনা ১৬৪২ সালে। এরপর কয়েক শতাব্দী ধরে চোগিয়ালরা সিকিম শাসন করেন। তবে উনিশ শতকে ব্রিটিশ ভারতের সঙ্গে সিকিমের সম্পর্কের ধরন বদলে যায়। ১৮১৭ সালের তিতালিয়া চুক্তির পর সিকিম ব্রিটিশ প্রভাবাধীন একটি আশ্রিত রাজ্যে পরিণত হয়। এর ফলে দেশটির স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরিসর আগের তুলনায় সীমিত হয়ে পড়ে এবং ব্রিটিশ ভারতের সঙ্গে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়।

১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হওয়ার পরও সিকিমের সঙ্গে ভারতের বিশেষ সম্পর্ক বজায় থাকে। ১৯৫০ সালের চুক্তির মাধ্যমে সিকিমের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনে স্বায়ত্তশাসনের কাঠামো বজায় থাকলেও প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্রনীতি এবং যোগাযোগের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে ভারতের ভূমিকা প্রতিষ্ঠিত হয়। অর্থাৎ সিকিম তখনও আলাদা রাজতান্ত্রিক সত্তা হিসেবে বিদ্যমান ছিল, কিন্তু তার নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারতের প্রভাব ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

সিকিমের ভৌগোলিক অবস্থানও এই সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব বহন করত। হিমালয়ের গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে অবস্থিত সিকিম ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় যোগাযোগব্যবস্থার কাছাকাছি এবং চীনের সীমান্তসংলগ্ন। ভারতের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের যোগাযোগের ক্ষেত্রে শিলিগুড়ি করিডোর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে সিকিমকে ঘিরে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও ভূ-রাজনীতির বিষয়টি সময়ের সঙ্গে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

এদিকে সিকিমের অভ্যন্তরেও রাজনৈতিক পরিবর্তনের দাবি জোরালো হতে থাকে। রাজতান্ত্রিক শাসনের পাশাপাশি গণতান্ত্রিক প্রতিনিধিত্ব ও অধিক রাজনৈতিক অধিকার নিয়ে বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে আন্দোলন গড়ে ওঠে। লহেন্দুপ দর্জির মতো নেতারা রাজতন্ত্রের পরিবর্তে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পক্ষে অবস্থান নেন। ফলে একদিকে রাজপরিবারের ক্ষমতা, অন্যদিকে গণতন্ত্রের দাবিতে রাজনৈতিক আন্দোলন—এই দুইয়ের মধ্যে বিরোধ ক্রমে তীব্র হতে থাকে।

১৯৭৪ সালে সিকিমের রাজনৈতিক কাঠামোয় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসে। আইনসভার মাধ্যমে চোগিয়ালের ক্ষমতা সীমিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয় এবং সিকিমের ভারতীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়। এই সময় সিকিমের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে ভারত ও সিকিমের অভ্যন্তরে আলোচনা ও টানাপোড়েন বাড়তে থাকে।

এর পর আসে ১৯৭৫ সাল। মে মাসে সিকিমে একটি গণভোট অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে রাজতন্ত্র বিলুপ্ত করে ভারতের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার প্রশ্নে ভোট নেওয়া হয়। প্রতিবেদনের বর্ণনা অনুযায়ী, বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা ভারতের সঙ্গে একীভূত হওয়ার পক্ষে ভোট দেয়। তবে এই গণভোটের প্রক্রিয়া ও পরিস্থিতি নিয়ে ঐতিহাসিক বিতর্ক রয়েছে; বিভিন্ন পক্ষ সে সময়ের ঘটনাকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করে।

গণভোটের পর ভারতের সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সিকিমের অবস্থানের পরিবর্তন ঘটে। ১৯৭৫ সালের ১৬ মে সিকিম আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের ২২তম অঙ্গরাজ্যে পরিণত হয়। এর মধ্য দিয়ে কয়েক শতাব্দীর চোগিয়াল রাজতন্ত্রের অবসান ঘটে এবং সিকিমের আলাদা রাজতান্ত্রিক রাজনৈতিক সত্তার পরিবর্তে ভারতীয় ইউনিয়নের একটি রাজ্য হিসেবে নতুন অধ্যায় শুরু হয়।

সিকিমের ভারতভুক্তির পেছনে তাই একাধিক কারণকে বিবেচনা করা হয়। সিকিমের অভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক আন্দোলন, রাজতন্ত্রের সঙ্গে রাজনৈতিক বিরোধ, ভারতের সঙ্গে দীর্ঘদিনের বিশেষ সম্পর্ক এবং চীনকে ঘিরে আঞ্চলিক নিরাপত্তা—সবগুলো বিষয়ই এই পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটের অংশ। এ কারণে সিকিমের ভারতভুক্তিকে শুধু একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হিসেবে নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার পরিবর্তনশীল ভূ-রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবেও দেখা হয়।

মুসআব/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

আন্তর্জাতিক এর সর্বশেষ খবর

আন্তর্জাতিক - এর সব খবর



রে