×
ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ভারতের ছকে অকেজো বাংলাদেশের গ্যাসক্ষেত্র

২০২৬ সেপ্টেম্বর ১৭ ১১:০৩:৩৫
ভারতের ছকে অকেজো বাংলাদেশের গ্যাসক্ষেত্র

নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশের স্থলভাগ ও বঙ্গোপসাগরে গ্যাস ও জ্বালানি সম্পদের সম্ভাবনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা থাকলেও এসব সম্পদের অনুসন্ধান ও উত্তোলনের গতি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষ করে সীমান্তঘেঁষা কয়েকটি গ্যাসক্ষেত্র এবং কুমিল্লার লালমাই এলাকায় অনুসন্ধানের ফলাফল, কূপের বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ উত্তোলন পরিকল্পনা নিয়ে নানা আলোচনা ও অভিযোগ সামনে এসেছে। একই সঙ্গে জ্বালানি চাহিদা মেটাতে বাংলাদেশকে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয়ে আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

বাংলাদেশের সীমান্তঘেঁষা কয়েকটি সম্ভাবনাময় গ্যাসক্ষেত্র দীর্ঘদিন ধরে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় কাজে আসছে না। এ পরিস্থিতির পেছনে ভূ-রাজনৈতিক ও নীতিগত বিভিন্ন কারণ থাকার অভিযোগও রয়েছে। ফলে সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রগুলোর প্রকৃত মজুত, বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনযোগ্যতার মাত্রা এবং প্রকল্পগুলো বন্ধ বা ধীরগতির প্রশাসনিক কারণ আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

কুমিল্লার লালমাই পাহাড়কে ঘিরে এ ধরনের আলোচনা দীর্ঘদিনের। এলাকায় একসময় কাঁচা তেল ও গ্যাসের উপস্থিতির কথা জানা গিয়েছিল। ২০০৪ সাল থেকে সেখানে অনুসন্ধান কার্যক্রম নিয়ে বিভিন্ন তৎপরতা শুরু হয় এবং ২০১৭-২০১৮ সালে ‘লালমাই-১’ ও ‘লালমাই-২’ নামে দুটি কূপ খনন করা হয়। এসব অনুসন্ধানে তেল ও গ্যাসের সম্ভাবনার ইঙ্গিত পাওয়া গেলেও পরবর্তীতে কার্যক্রম থেমে যায়।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা-তারাপুর এলাকাকেও সম্ভাবনাময় গ্যাস অঞ্চল হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে প্রায় ৩ হাজার মিটার গভীরতায় অনুসন্ধান চালিয়ে গ্যাসের সন্ধান পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে কূপটির পরবর্তী কার্যক্রম নিয়ে নানা অভিযোগ রয়েছে। একটি গোপন চুক্তির মাধ্যমে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত কূপটি থেকে গ্যাস উত্তোলন বন্ধ রাখার শর্ত দেওয়া হয়েছিল।

২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে কসবার ওই কূপ থেকে গ্যাস বের হওয়ার ঘটনার কথাও হয়েছে। পরে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় কূপটি সিল করে দেন বলে এতে বলা হয়। ২০২৪ সালের আগস্টে স্থানীয় বাসিন্দা ও আন্দোলনকারীরা ‘কসবার গ্যাস কসবায় চায়’ স্লোগানে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন করেন। স্থানীয়দের পক্ষ থেকে প্রকল্পটি দ্রুত চালু করার দাবি জানানো হয়।

উত্তরের পঞ্চগড়ের শালবাহান এবং ফেনীর ধলিয়া গ্যাসক্ষেত্র নিয়েও দীর্ঘদিনের স্থবিরতার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। শালবাহানে ১৯৮৮ সালে অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরু হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই কাজ বন্ধ হয়ে যায় । একই ভূতাত্ত্বিক অঞ্চলের ভারতের অংশে পরবর্তীতে জ্বালানি অনুসন্ধানের প্রসঙ্গও এতে এসেছে। তবে বাংলাদেশের অংশে অনুসন্ধান বন্ধের কারণ এবং ভারতের উত্তোলনের সঙ্গে সরাসরি কোনো সম্পর্ক রয়েছে।

ফেনীর ধলিয়া গ্যাসক্ষেত্রের ক্ষেত্রেও একসময় সেখান থেকে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ করা হতো। পরবর্তীতে বিভিন্ন কারণে ক্ষেত্রটি দীর্ঘদিন ধরে উৎপাদনের বাইরে রয়েছে।

বঙ্গোপসাগরেও বাংলাদেশের গ্যাস অনুসন্ধান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ২০১২ সালে ভারতের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ওএনজিসি ও অয়েল ইন্ডিয়া বাংলাদেশের সমুদ্রসীমার দুটি ব্লকে অনুসন্ধানের দায়িত্ব পেলেও দীর্ঘ সময়েও প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যায়নি। এর বিপরীতে ভারতের নিজস্ব সমুদ্রাঞ্চলে গ্যাস উৎপাদনের উদাহরণ তুলে ধরে বাংলাদেশের অনুসন্ধান কার্যক্রমের ধীরগতির বিষয়টি সামনে আনা হয়েছে।

সীমান্তের দুই পাশে ভূগর্ভস্থ গ্যাসের চাপের পার্থক্যের কারণে এক পাশের সম্পদ অন্য দিকে সরে যেতে পারে। তবে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের নির্দিষ্ট গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে ভারত ‘লো প্রেসার জোন’ তৈরি করে ভূগর্ভস্থ গ্যাস টেনে নিচ্ছে।

নিজস্ব গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়া এবং চাহিদা বাড়ার কারণে বাংলাদেশকে আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে জ্বালানি খাতে বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয় বাড়ছে এবং শিল্প, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য খাতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এ অবস্থায় দেশের স্থল ও সমুদ্রভাগে নতুন অনুসন্ধান, পুরোনো কূপের পুনর্মূল্যায়ন, সম্ভাবনাময় গ্যাসক্ষেত্রের বাণিজ্যিক সম্ভাব্যতা যাচাই এবং প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। লালমাই, কসবা-তারাপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রকৃত মজুত ও উত্তোলনযোগ্য সম্পদের পরিমাণ নির্ধারণ করা গেলে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় এসব ক্ষেত্রের বাস্তব অবদান কতটা হতে পারে, তা আরও স্পষ্ট হবে।

সব মিলিয়ে বাংলাদেশের মাটির নিচে থাকা গ্যাস-তেল সম্পদের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা থাকলেও কোথায় কত মজুত রয়েছে, কোনটি বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনযোগ্য এবং কোন প্রকল্প কেন দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ বা ধীরগতির—এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য ভূতাত্ত্বিক তথ্য, স্বচ্ছ তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রকাশ্য তথ্য। অভিযোগ ও রাজনৈতিক ব্যাখ্যার বাইরে গিয়ে এসব তথ্যই নির্ধারণ করবে দেশের জ্বালানি সম্পদের প্রকৃত সম্ভাবনা।

মুসআব/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

জাতীয় এর সর্বশেষ খবর

জাতীয় - এর সব খবর



রে