×
ঢাকা, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

গ্রামীণফোনে ইউনিয়ন বিরোধ, টেলিনরের বিরুদ্ধে নরওয়ের তদন্ত

২০২৬ সেপ্টেম্বর ১৩ ১৫:৩৪:৪৪
গ্রামীণফোনে ইউনিয়ন বিরোধ, টেলিনরের বিরুদ্ধে নরওয়ের তদন্ত

নিজস্ব প্রতিবেদক: গ্রামীণফোনে ইউনিয়নবিরোধী কর্মকাণ্ড, দীর্ঘদিনের মামলা এবং বাংলাদেশি সহযোগী প্রতিষ্ঠানের ওপর যথাযথ নজরদারি নিয়ে টেলিনর এএসএর বিরুদ্ধে করা অভিযোগ আরও পর্যালোচনার জন্য গ্রহণ করেছে নরওয়ের ন্যাশনাল কনট্যাক্ট পয়েন্ট ফর রেসপনসিবল বিজনেস কন্ডাক্ট (এনসিপি)।

গ্রামীণফোনের সাবেক ২১ কর্মী ও ইউনিয়ন নেতার করা অভিযোগের প্রাথমিক মূল্যায়নে এনসিপি জানিয়েছে, টেলিনর তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেছে কি না—বিশেষ করে গ্রামীণফোনে কথিত ইউনিয়নবিরোধী কর্মকাণ্ড এবং দীর্ঘস্থায়ী আদালত প্রক্রিয়া থেকে উদ্ভূত সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাব ঠেকাতে বা কমাতে যথাযথ পদক্ষেপ নিয়েছিল কি না—তা আরও পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে।

তবে অভিযোগ গ্রহণের অর্থ টেলিনর বা গ্রামীণফোন কোনো অন্যায় করেছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো নয় বলে স্পষ্ট করেছে এনসিপি। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, টেলিনর বা গ্রামীণফোন অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (ওইসিডি) গাইডলাইন অনুসরণ করেছে কি না, সে বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়নি।

এনসিপি আদালত নয় এবং তারা কোনো পক্ষকে শাস্তি, ক্ষতিপূরণ দিতে বা বাধ্যতামূলকভাবে মধ্যস্থতায় অংশ নিতে নির্দেশ দিতে পারে না। বহুজাতিক কোম্পানির দায়িত্বশীল ব্যবসায়িক আচরণে ওইসিডির গাইডলাইন প্রচার এবং এ-সংক্রান্ত অভিযোগ পর্যালোচনা করাই সংস্থাটির মূল দায়িত্ব।

এনসিপির প্রক্রিয়ায় কোনো অভিযোগ গ্রহণের অর্থ হলো, অভিযোগটি আরও পর্যালোচনার জন্য প্রয়োজনীয় প্রাথমিক মানদণ্ড পূরণ করেছে। এ পর্যায়ে দুই পক্ষকে সংলাপ বা মধ্যস্থতার মাধ্যমে সমাধানের সুযোগ দিতে এনসিপি তাদের ‘গুড অফিসেস’ ব্যবহারের প্রস্তাব দিয়েছে। ছয় মাসের মধ্যে সংলাপের মাধ্যমে কোনো ফল না এলে অভিযোগটি আরও পর্যালোচনার প্রয়োজন আছে কি না, তা পুনর্মূল্যায়ন করবে সংস্থাটি।

২০১২ সালের বিতর্কিত ছাঁটাই

২০২৬ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি গ্রামীণফোন এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (জিপিইউ) তৎকালীন যোগাযোগবিষয়ক সম্পাদক আদিবা জেরিন চৌধুরী নিজের এবং আরও ২০ সাবেক কর্মী ও ইউনিয়ন সদস্যের পক্ষে অভিযোগটি দায়ের করেন।

অভিযোগকারীদের দাবি, ২০১২ সালের ২৩ জুলাই ইউনিয়ন নিবন্ধনের আবেদন করা হয়। এর পরদিনই ইউনিয়ন গঠনের আন্দোলনে যুক্ত থাকার কারণে ২০০ জনের বেশি কর্মীকে চাকরিচ্যুত করা হয়। চাকরিচ্যুতদের মধ্যে ইউনিয়ন কমিটির সভাপতি, সহসভাপতি ও যোগাযোগবিষয়ক সম্পাদকসহ সাতজনও ছিলেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, এসব চাকরিচ্যুতি বাংলাদেশের শ্রম আইন এবং সংগঠন করার স্বাধীনতা ও ইউনিয়ন গঠনের অধিকারসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক মানদণ্ড লঙ্ঘন করেছে। বিষয়টি আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) ফ্রিডম অব অ্যাসোসিয়েশন কমিটিতেও উত্থাপিত হয়েছে।

তবে গ্রামীণফোন এসব চাকরিচ্যুতিকে ইউনিয়নবিরোধী পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করার বিরোধিতা করেছে। এনসিপিকে দেওয়া জবাবে টেলিনর জানিয়েছে, ব্যবসায়িক প্রয়োজনের পরিবর্তনের কারণে ২০১২ সালের প্রথম ছয় মাসে গ্রামীণফোন যে রূপান্তর কার্যক্রম হাতে নিয়েছিল, তার অংশ হিসেবেই এসব কর্মীকে ছাঁটাই করা হয়েছিল।

ইউনিয়ন স্বীকৃতিতে সাত বছরের অপেক্ষা

চাকরিচ্যুতির পর জিপিইউকে সরকারি স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য দীর্ঘ সাত বছর অপেক্ষা করতে হয়। ২০১৯ সালের ৭ মার্চ বাংলাদেশের শ্রম কর্তৃপক্ষ ইউনিয়নটি নিবন্ধন করে। পরে গ্রামীণফোনও ইউনিয়নটিকে স্বীকৃতি দেয়। একই বছরের ২৯ অক্টোবর গ্রামীণফোন ও জিপিইউর মধ্যে একটি চুক্তি সই হয়, যেখানে সংলাপ, পরামর্শ ও আলোচনার কাঠামো নির্ধারণ করা হয়।

দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়াও এনসিপির বিবেচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ২০১২ সালের সেপ্টেম্বরে ২২ সাবেক কর্মী প্রথম শ্রম আদালতে মামলা করেন। পরে একজন মামলা থেকে সরে দাঁড়ালে অভিযোগকারী হিসেবে ২১ জন থাকেন।

অভিযোগকারীদের দাবি, বিভিন্ন ধরনের প্রক্রিয়াগত জটিলতার কারণে মামলাগুলো দীর্ঘায়িত হয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে কার্যকর প্রতিকার পেতে তাদের কয়েক দশক পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে।

২০২৩ সালে বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্ট মামলাগুলোর গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে গ্রামীণফোনের করা চ্যালেঞ্জ খারিজ করেন। এর ফলে শ্রম আদালতে মামলাগুলোর কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার পথ উন্মুক্ত হয়।

টেলিনর স্বীকার করেছে, বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থায় দীর্ঘসূত্রতা একটি বাস্তব সমস্যা। তবে তারা ইচ্ছাকৃতভাবে মামলাগুলো দীর্ঘায়িত করেছে—এমন অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

এনসিপিও এমন কোনো সিদ্ধান্ত দেয়নি যে টেলিনর বা গ্রামীণফোন ইচ্ছাকৃতভাবে মামলার কার্যক্রম বিলম্বিত করেছে। তবে অভিযোগকারীরা কার্যকর প্রতিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন কি না, তা বিবেচনার ক্ষেত্রে মামলার দীর্ঘসূত্রতাকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেছে সংস্থাটি।

অভিযোগকারী আদিবা জেরিন চৌধুরী বলেন, তারা দেশের অভ্যন্তরীণ আইনি প্রতিকারের পথ ব্যবহার করেছেন এবং ২০২২ সালে ২০১২ সালের চাকরিচ্যুতির বিষয়টি আইএলওতেও উত্থাপন করেছেন।

তার দাবি, ২০২৪ ও ২০২৬ সালে আইএলও দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে ইউনিয়নবিরোধী বৈষম্যের অভিযোগ তদন্ত এবং বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা কমাতে পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করলেও এখন পর্যন্ত তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়নি।

তিনি বলেন, ২০১২ সালের চাকরিচ্যুতি, দীর্ঘ আদালত প্রক্রিয়া এবং কার্যকর প্রতিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার অভিযোগগুলো যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ও প্রমাণসমর্থিত বলেই এনসিপি আরও পর্যালোচনার জন্য গ্রহণ করেছে। এর অংশ হিসেবে টেলিনরের যথাযথ পরিশ্রম বা ‘ডিউ ডিলিজেন্স’ এবং নিজস্ব প্রভাব বা ‘লিভারেজ’ ব্যবহারের বিষয়টিও পর্যালোচনা করা হবে।

টেলিনর-গ্রামীণফোন সম্পর্ক

গ্রামীণফোনের সঙ্গে টেলিনরের সম্পর্কের কারণেই অভিযোগটি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। গ্রামীণফোনের ৫৫ দশমিক ৮ শতাংশ শেয়ারের মালিক টেলিনর। অপারেটরটির ১০ সদস্যের পরিচালনা পর্ষদের পাঁচজনই টেলিনরের প্রতিনিধি, যাদের মধ্যে চেয়ারম্যানও রয়েছেন।

এনসিপি মনে করেছে, টেলিনরের সংখ্যাগরিষ্ঠ মালিকানা ও পরিচালনা পর্ষদে উল্লেখযোগ্য প্রতিনিধিত্বের কারণে গ্রামীণফোনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর সঙ্গে টেলিনরের যথেষ্ট সম্পর্ক রয়েছে। ফলে টেলিনরের যথাযথ দায়িত্ব পালন এবং প্রভাব কাজে লাগানোর বিষয়টি আরও পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে।

টেলিনর যুক্তি দিয়েছিল, একই বিষয়ে বাংলাদেশে চলমান আইনি প্রক্রিয়ার কারণে এনসিপির পক্ষ থেকে মধ্যস্থতা বা ‘গুড অফিসেস’ দেওয়া উচিত নয়। তবে এনসিপি এই যুক্তি গ্রহণ করেনি। সংস্থাটি বলেছে, বাংলাদেশের আদালতে চলমান মামলায় আইনি প্রশ্নের নিষ্পত্তি নয়, বরং ওইসিডি গাইডলাইনের আওতায় টেলিনরের দায়িত্বই তাদের প্রক্রিয়ার বিষয়।

শ্রম বিশেষজ্ঞদের স্বাগত

এনসিপির সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক এবং শ্রম সংস্কার কমিশনের প্রধান সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ। তিনি এটিকে বাংলাদেশে কার্যরত বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর জবাবদিহি বাড়ানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

তার মতে, এ ঘটনা অন্য বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর জন্যও দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে এবং শ্রমিক সংগঠনগুলোর দর-কষাকষির সক্ষমতা বাড়াতে পারে। তবে তিনি বলেন, এনসিপির প্রক্রিয়া বাংলাদেশের আইনকে প্রতিস্থাপন করবে না; বরং তা দেশের শ্রম আইনকে সম্পূরক হিসেবে কাজ করা উচিত।

ট্রেড ইউনিয়ন নেতা বাবুল আক্তারও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন। বিশেষ করে ট্রেড ইউনিয়ন গঠন ও নিবন্ধনের উদ্যোগ নেওয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ততার কারণে শ্রমিকদের চাকরিচ্যুত করার অভিযোগ থাকায় বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।

তার বক্তব্য, কোনো সহযোগী বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান শ্রমিক অধিকার লঙ্ঘন করলে মূল কোম্পানিরও দায়িত্ব নেওয়া উচিত। একই সঙ্গে তিনি ওইসিডি গাইডলাইন, আইএলও কনভেনশন এবং জাতীয় শ্রম আইন আরও কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের আহ্বান জানান।

দ্রুত শ্রম বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য স্বাধীন ও স্বচ্ছ সালিশি ব্যবস্থার পক্ষেও মত দেন বাবুল আক্তার। তবে আদালত ও আপিলের সুযোগ বহাল রাখার কথাও বলেন তিনি।

গ্রামীণফোনের বক্তব্য

এ বিষয়ে গ্রামীণফোন জানিয়েছে, নরওয়ের ওইসিডি ন্যাশনাল কনট্যাক্ট পয়েন্ট তাদের সাবেক কয়েকজন কর্মীর উত্থাপিত কিছু বিষয় প্রাথমিক মূল্যায়নের ভিত্তিতে বিবেচনার জন্য গ্রহণ করেছে। তবে অভিযোগটি শ্রম অধিকারসংক্রান্ত এবং তা টেলিনরের বিরুদ্ধে করা হয়েছে।

গ্রামীণফোনের দাবি, অভিযোগগুলোর বিষয়ে এনসিপি এখনো কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি।

প্রতিষ্ঠানটি আরও জানিয়েছে, কর্মীদের কথিত ছাঁটাই-সংক্রান্ত বিষয়টি বাংলাদেশের আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। অন্যদিকে, বেতন ও মজুরি সুরক্ষা তহবিলের (ডব্লিউপিপিএফ) সুদ পরিশোধ না করার অভিযোগটি আরও বিবেচনার উপযুক্ত নয় বলে এনসিপি মনে করেছে এবং এ বিষয়টি বাংলাদেশে চলমান আদালত প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই নিষ্পত্তি হওয়া উচিত বলে জানিয়েছে।

গ্রামীণফোন বলেছে, এনসিপির প্রক্রিয়ার উদ্দেশ্য কোনো পক্ষের বিরুদ্ধে অন্যায় প্রমাণ করা নয়; বরং সংলাপের মাধ্যমে বিরোধের সমাধানের সুযোগ তৈরি করা। প্রতিষ্ঠানটি জোর দিয়ে বলেছে, চাকরিচ্যুতির বিষয়টি এখনো বাংলাদেশের আদালতে বিচারাধীন এবং অভিযোগগুলোর বিষয়ে এনসিপি কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেয়নি।

মামুন/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর



রে