×
ঢাকা, বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আরএমজি শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি মূলধনের নতুন দুয়ার শেয়ারবাজার

২০২৬ সেপ্টেম্বর ০৯ ১৮:৩৫:১৫
আরএমজি শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি মূলধনের নতুন দুয়ার শেয়ারবাজার

নিজস্ব প্রতিবেদক : দেশের তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের সুযোগ বাড়াতে শেয়ারজারকে কার্যকর বিকল্প হিসেবে ব্যবহারের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন সংশ্লিষ্ট খাতের অংশীজনরা। একই সঙ্গে ইক্যুইটির পাশাপাশি বন্ডসহ বিভিন্ন ধরনের শেয়ারবাজারভিত্তিক অর্থায়ন ব্যবস্থা সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তার কথাও উঠে এসেছে।

এ বিষয়ে আলোচনা ও সম্ভাবনা তুলে ধরতে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ পিএলসি (ডিএসই) এবং সুইসকন্ট্যাক্টের যৌথ উদ্যোগে বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬) ডিএসই ট্রেনিং একাডেমিতে ‘এক্সপ্যান্ডিং আরএমজি’স ফাইন্যান্সিং হরাইজনস: অপরচুনিটিজ ইন দ্য ক্যাপিটাল মার্কেট’ শীর্ষক কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সকাল সাড়ে ১০টায় শুরু হওয়া কর্মশালায় বিকেএমইএর শীর্ষস্থানীয় সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলোর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অংশ নেন।

কর্মশালায় উপস্থিত ছিলেন ডিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুজহাত আনোয়ার, প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা ড. মো. আসিফুর রহমান, সুইসকন্ট্যাক্ট বাংলাদেশের ডেপুটি কান্ট্রি ডিরেক্টর সৈয়দা ইসরাত ফাতিমা, সুইসকন্ট্যাক্টের প্রোগ্রেস প্রকল্পের টিম লিডার ফারজানা আমিন, ইন্সপায়ার প্রকল্পের টিম লিডার বিধোরা তাহমিন খান, বিকেএমইএর ডেপুটি সেক্রেটারি মো. হারুনূর রশিদ, বিএমবিএর সভাপতি ও লংকাবাংলা ইনভেস্টমেন্টসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ইফতেখার আলম এবং ডিএসইর মার্কেট ডেভেলপমেন্ট ডিভিশনের জেনারেল ম্যানেজার সাইয়িদ মাহমুদ জুবায়ের।

কর্মশালার শুরুতে ডিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুজহাত আনোয়ার বলেন, শেয়ারবাজার কেবল বিনিয়োগের একটি প্ল্যাটফর্ম নয়; দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং বেসরকারি খাতের সম্প্রসারণে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবেও এর ভূমিকা রয়েছে।

তিনি বলেন, শেয়ারবাজারের অর্থায়নকে শুধু আইপিও বা ইক্যুইটি মার্কেটের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। বন্ডসহ বিভিন্ন ধরনের অর্থায়ন ব্যবস্থা আরও সম্প্রসারণ করতে হবে। দেশে দীর্ঘদিন ধরে কার্যকর একটি বন্ড মার্কেট গড়ে তোলার বিষয়ে আলোচনা হলেও বর্তমান কমিশন এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের উদ্যোগে এ খাতে নতুনভাবে কাজ করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

নুজহাত আনোয়ার আরও বলেন, বেসরকারি খাতের অর্থায়নের চাহিদা এবং শেয়ারবাজারের অর্থায়ন সক্ষমতার মধ্যে যে ব্যবধান রয়েছে, তা কমানো অত্যন্ত জরুরি। পাশাপাশি অর্থায়নের ক্ষেত্রে বিদ্যমান নীতিগত ও নিয়ন্ত্রক সীমাবদ্ধতাগুলো প্রয়োজন অনুযায়ী পুনর্বিবেচনা করা দরকার। বিশেষ করে আইপিওর মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থের ব্যবহার এবং পুনঃঅর্থায়নের সুযোগকে আরও কার্যকর করার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে।

তিনি বলেন, উদ্যোক্তাদের প্রয়োজন এবং বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে শেয়ারবাজারের বিদ্যমান সীমাবদ্ধতাগুলো চিহ্নিত করে সেগুলোর সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়াই এ ধরনের আলোচনার অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য। সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামত ও প্রত্যাশাকে গুরুত্ব দিয়ে কার্যকর, স্বচ্ছ এবং ব্যবসাবান্ধব পুঁজিবাজার গড়ে তুলতে ডিএসই কাজ করছে।

সুইসকন্ট্যাক্টের প্রোগ্রেস প্রকল্পের টিম লিডার ফারজানা আমিন বলেন, প্রতিষ্ঠানটি প্রায় দুই দশক ধরে আরএমজি খাতের উন্নয়নে সহযোগিতা দিয়ে আসছে। ব্যাংকঋণের পাশাপাশি পুঁজিবাজারের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহের সম্ভাবনাকেও এখন গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন বলে তিনি মন্তব্য করেন।

তিনি জানান, শেয়ারবাজারে আসতে আগ্রহী আরএমজি প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভবিষ্যতে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বা এন্ড-টু-এন্ড সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে সুইসকন্ট্যাক্টের। আগামী এক বছরের মধ্যে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে রোল মডেল হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের সফলতার দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোও যাতে শেয়ারবাজারভিত্তিক অর্থায়নে আগ্রহী হয়, সে লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

বিকেএমইএর ডেপুটি সেক্রেটারি মো. হারুনূর রশিদ বলেন, দেশের শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর অর্থায়নের প্রধান নির্ভরতা এখনো ব্যাংকঋণের ওপর। পর্যাপ্ত অর্থায়ন না পাওয়ার কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান তাদের ব্যবসা সম্প্রসারণের সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারছে না। এ পরিস্থিতিতে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের বিকল্প উৎস হিসেবে পুঁজিবাজার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

তিনি বলেন, ভালো ও সম্ভাবনাময় প্রতিষ্ঠানগুলোকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করা সম্ভব হলে ব্যবসা সম্প্রসারণের পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও ত্বরান্বিত হবে। তবে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধরে রাখতে তালিকাভুক্তির পর প্রতিষ্ঠানগুলোর টেকসই ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কর্মশালার পরবর্তী পর্বে নতুন বিধিমালার আওতায় সম্ভাব্য ইস্যুয়ারদের তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা করেন বিএমবিএর সভাপতি ও লংকাবাংলা ইনভেস্টমেন্টসের সিইও ইফতেখার আলম। তিনি আইপিওর মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি মূলধন সংগ্রহের সুবিধা, শেয়ারবাজারের কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ এবং ইক্যুইটি মূলধন সংগ্রহের বিভিন্ন সুযোগ তুলে ধরেন।

এ সময় তিনি মূল বোর্ডের আইপিও এবং এসএমই বোর্ডের কিউআইওর যোগ্যতার শর্ত, কোম্পানির মূল্যায়ন, তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়া, আইপিও থেকে সংগৃহীত অর্থের ব্যবহার, সাবস্ক্রিপশন, শেয়ার বরাদ্দ এবং লক-ইন বিধানসহ দ্রুত ও কার্যকর আইপিও সম্পন্ন করার বিভিন্ন দিক ব্যাখ্যা করেন।

অন্যদিকে, ডিএসইর মার্কেট ডেভেলপমেন্ট ডিভিশনের জেনারেল ম্যানেজার সাইয়িদ মাহমুদ জুবায়ের তার উপস্থাপনায় বাংলাদেশের শেয়ারবাজারের সামগ্রিক চিত্র, বাজারের কাঠামো, ডিএসইর বাজার অবকাঠামো এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। একই সঙ্গে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের জন্য ইক্যুইটি ও ঋণভিত্তিক অর্থায়নের বিভিন্ন সুযোগ নিয়েও আলোচনা করেন তিনি।

তার উপস্থাপনায় আইপিও, কিউআইও, এসএমই প্ল্যাটফর্ম, বন্ড মার্কেট, ডাইরেক্ট লিস্টিংসহ শেয়ারবাজারের বিভিন্ন অর্থায়ন ব্যবস্থার মাধ্যমে ব্যবসা সম্প্রসারণের সম্ভাবনা তুলে ধরা হয়। পাশাপাশি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির মাধ্যমে মূলধন সংগ্রহের সুযোগের পাশাপাশি করপোরেট সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং প্রতিষ্ঠানের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধির বিষয়েও আলোকপাত করা হয়।

কর্মশালার সমাপনী বক্তব্যে ডিএসইর প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা ড. মো. আসিফুর রহমান বলেন, কর্মশালার আলোচনায় শেয়ারবাজারের বিভিন্ন বিষয়ে অংশীজনদের গঠনমূলক মতামত উঠে এসেছে। এসব মতামত বাজারের সাম্প্রতিক সংস্কার এবং ডিএসইর অগ্রাধিকার সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা দিয়েছে।

তিনি বলেন, উদ্যোক্তারা যাতে সহজে শেয়ারবাজারে আসতে পারেন, সে লক্ষ্যে ডিএসইর অ্যাডভাইজরি সার্ভিসের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা ও ওয়ান-টু-ওয়ান কাউন্সেলিং দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে পুঁজিবাজারে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, নির্ভরযোগ্য তথ্য সরবরাহ এবং বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষায় ডিএসই কাজ করে যাচ্ছে। অংশীজনদের সঙ্গে সমন্বিতভাবে একটি স্বচ্ছ, গতিশীল ও প্রাণবন্ত শেয়ারবাজার গড়ে তোলার প্রত্যয়ও ব্যক্ত করেন তিনি।

সুইসকন্ট্যাক্টের ইন্সপায়ার প্রকল্পের টিম লিডার বিধোরা তাহমিন খান বলেন, এদিনের আলোচনা শেয়ারবাজার এবং আরএমজি ও টেক্সটাইল—উভয় খাতের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ ও ফলপ্রসূ। তিনি জানান, সুইসকন্ট্যাক্ট গত ২০ বছর ধরে এ খাতে কমপ্লায়েন্স, দক্ষতা উন্নয়ন এবং গ্রিন ট্রানজিশন নিয়ে কাজ করে আসছে।

তিনি আরও বলেন, আরএমজি ও টেক্সটাইল খাতের সম্ভাবনাময় প্রতিষ্ঠানগুলোকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করার ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে ডিএসই, বিএসইসি এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট অংশীজনের সঙ্গে সমন্বয় করে অ্যাডভাইজরি ও কারিগরি সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে সুইসকন্ট্যাক্টের।

এসএ খান/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর



রে