×
ঢাকা, বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সবসময় লোকেশন অন? অজান্তেই ডেকে আনছেন বড় বিপদ

২০২৬ সেপ্টেম্বর ০৯ ১৬:৩৪:৩৯
সবসময় লোকেশন অন? অজান্তেই ডেকে আনছেন বড় বিপদ

নিজস্ব প্রতিবেদক : ‘কোথায় আছ?’—এই প্রশ্নের উত্তর দিতে এখন আর ফোন করে জায়গার নাম বলতে হয় না। এক ক্লিকেই পাঠানো যায় নিজের লাইভ লোকেশন। পরিবারকে নিরাপদে পৌঁছানোর খবর জানানো, একা ভ্রমণের সময় অবস্থান জানানো কিংবা বন্ধুকে সহজে খুঁজে পেতে স্মার্টফোনের লোকেশন শেয়ারিং সুবিধা বেশ কার্যকর।

তবে এই সুবিধা যদি ২৪ ঘণ্টা, সপ্তাহের সাত দিন চালু থাকে, তাহলে প্রশ্ন উঠতে পারে—নিজের ব্যক্তিগত জীবনের কতটা তথ্য অজান্তেই অন্যের হাতে তুলে দিচ্ছেন?

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রয়োজনের সময় লোকেশন শেয়ার করা নিরাপত্তার জন্য উপকারী। কিন্তু অপ্রয়োজনে সবসময় এটি চালু রাখা ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও স্বাধীনতার ওপর চাপ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে সারাক্ষণ নিজের অবস্থান প্রকাশের অভ্যাস ভবিষ্যতে ডিজিটাল গোপনীয়তার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

লোকেশন শেয়ারিং প্রযুক্তির অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল নিরাপত্তা বাড়ানো। একা ভ্রমণ, রাতে বাড়ি ফেরা, অপরিচিত কারও সঙ্গে প্রথমবার দেখা কিংবা জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত নিজের অবস্থান জানাতে এটি কার্যকর হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিপণন বিশেষজ্ঞ ব্রিটানি গার্সিয়ার মতে, সচেতনভাবে লোকেশন শেয়ার করলে এটি নিরাপত্তার জন্য উপকারী হতে পারে। তবে সবার সঙ্গে সবসময় নিজের অবস্থান ভাগ করে রাখার প্রয়োজন নেই।

সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন নিরাপত্তার এই সুবিধা ধীরে ধীরে সম্পর্কের ‘বিশ্বাসের পরীক্ষা’ হয়ে দাঁড়ায়।

নির্দিষ্ট কিছু পরিস্থিতিতে লোকেশন শেয়ার করা নিরাপত্তা বাড়াতে পারে। যেমন—অপরিচিত কারও সঙ্গে প্রথমবার দেখা করতে গেলে।একা বা দূরপাল্লার ভ্রমণের সময়।রাতে একা যাতায়াতের ক্ষেত্রে।জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন হলে।পরিবার বা বন্ধুকে নিরাপদে পৌঁছানোর খবর জানাতে।জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত নিজের অবস্থান জানাতে।তবে প্রয়োজন শেষ হয়ে গেলে লোকেশন শেয়ারিং বন্ধ করে দেওয়াই নিরাপদ অভ্যাস।

অনেক পরিবার, বন্ধু বা দম্পতির মধ্যে এমন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে—ঘনিষ্ঠ মানুষ হলে তার লোকেশন সবসময় দেখা যাবে। এখান থেকেই তৈরি হতে পারে নতুন ধরনের মানসিক চাপ।

যুক্তরাষ্ট্রের লোমাস হসপিটালিটির মহাব্যবস্থাপক অস্কার মেলেন্দেজের মতে, লোকেশন শেয়ারিং অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত পছন্দের বদলে সামাজিক দায়িত্ব হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ফলে কেউ লোকেশন বন্ধ করলেই প্রশ্ন উঠতে পারে—‘কোথায় গেলে?’, ‘লোকেশন বন্ধ করলে কেন?’ কিংবা ‘কিছু লুকাচ্ছ কি?’ এ ধরনের প্রশ্ন ব্যক্তিগত স্বাধীনতার ওপর অপ্রয়োজনীয় চাপ তৈরি করতে পারে।

লোকেশন শেয়ারিংয়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মানসিক স্বাধীনতা। বাইরে ঘুরতে গেলে কিংবা ছুটিতে থাকলে কিছু সময়ের জন্য লোকেশন বন্ধ রাখার সুযোগ থাকা স্বাভাবিক। দৈনন্দিন জীবনেও নিজের অবস্থান সম্পর্কে সবসময় অন্যকে জানিয়ে রাখার বাধ্যবাধকতা থাকা উচিত নয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সম্পর্ক যত ঘনিষ্ঠই হোক, ব্যক্তিগত পরিসরের প্রয়োজন রয়েছে। তাই লোকেশন শেয়ার করা এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতার মধ্যে একটি স্বাস্থ্যকর সীমারেখা থাকা জরুরি।

লোকেশন শেয়ারিংয়ের প্রভাব বিশেষ করে জেন-জি ও কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে বেশি দৃশ্যমান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কে কোথায় আছে, কখন কোথায় যাচ্ছে—এসব তথ্য প্রকাশ করা অনেকের কাছেই এখন স্বাভাবিক।

স্ন্যাপচ্যাটের ‘স্ন্যাপ ম্যাপ’ চালুর পর বন্ধুদের অবস্থান দেখার প্রবণতাও আরও দৃশ্যমান হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, ছোটবেলা থেকেই সারাক্ষণ নিজের অবস্থান প্রকাশ করতে করতে অনেকেই এর দীর্ঘমেয়াদি গোপনীয়তার ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন নাও হতে পারে।

একজন ব্যক্তি কোথায় যান, কখন যান এবং কতক্ষণ সেখানে থাকেন—এই তথ্যগুলো একত্র হলে তার দৈনন্দিন জীবনযাত্রার একটি পরিষ্কার চিত্র তৈরি হতে পারে। সাইবার অপরাধ ও ডিজিটাল ট্র্যাকিংয়ের সময়ে এমন তথ্য ভুল হাতে পড়লে তা অস্বস্তিকর বা ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।

প্রযুক্তি নিজে সমস্যা নয়; বরং সেটি কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। নিরাপত্তার প্রয়োজন হলে লোকেশন শেয়ার করুন। তবে সম্পর্কের গভীরতা প্রমাণ করতে সারাক্ষণ এটি চালু রাখার প্রয়োজন নেই।

প্রয়োজন অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ের জন্য লোকেশন শেয়ার করুন।কাজ শেষ হলে লাইভ লোকেশন বন্ধ করুন।কার সঙ্গে লোকেশন শেয়ার করছেন, তা নিয়মিত যাচাই করুন।অপ্রয়োজনীয় অ্যাপকে লোকেশন ব্যবহারের অনুমতি না দেওয়াই ভালো।পরিবার বা সঙ্গীর সঙ্গে লোকেশন শেয়ারিং নিয়ে আগে থেকেই ব্যক্তিগত সীমারেখা ঠিক করে নিন।

এক ক্লিকের লোকেশন শেয়ারিং বিপদের সময়ে জীবন বাঁচাতে পারে। আবার অপ্রয়োজনে সারাক্ষণ চালু রাখলে ব্যক্তিগত জীবনের পরিসরও ছোট করে দিতে পারে।

তাই ‘লোকেশন অন’ মানেই নিরাপদ—এমন নয়। কখন, কেন এবং কার সঙ্গে নিজের অবস্থান ভাগ করছেন, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। নিরাপত্তার পাশাপাশি নিজের ব্যক্তিগত স্বাধীনতাকেও গুরুত্ব দিন। কারণ, সবসময় কোথায় আছেন, তা সবাইকে জানানো আপনার দায়িত্ব নয়।

মুয়াজ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এর সর্বশেষ খবর

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি - এর সব খবর



রে