×
ঢাকা, বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বিদ্যুৎ বিল থেকে হাসপাতালের খরচ, টাকা দেবে ব্যাংক

২০২৬ সেপ্টেম্বর ০৯ ১৫:৩৬:৪৮
বিদ্যুৎ বিল থেকে হাসপাতালের খরচ, টাকা দেবে ব্যাংক

নিজস্ব প্রতিবেদক : জরুরি প্রয়োজনে হঠাৎ টাকার সংকট দেখা দিলে অনেক সময় বিদ্যুৎ-গ্যাসের বিল, মোবাইল রিচার্জ, শিক্ষা বা চিকিৎসার খরচ পরিশোধ করা কঠিন হয়ে পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে গ্রাহকদের সাময়িক অর্থসংকট মেটাতে নতুন ডিজিটাল ঋণসুবিধা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ‘ই-পেমেন্ট ক্রেডিট’ নামের এই সুবিধার আওতায় ব্যাংকিং অ্যাপ ব্যবহার করে গ্রাহকেরা সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত তাৎক্ষণিক ঋণ নিতে পারবেন। তবে এই ঋণের টাকা নগদে তোলা বা নিজের হিসাবে জমা নেওয়ার সুযোগ থাকবে না; নির্দিষ্ট বিল ও সেবার মূল্য পরিশোধেই অর্থ ব্যবহার করতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, এই সুবিধার মাধ্যমে গ্রাহকেরা ৫০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ নিতে পারবেন। জরুরি প্রয়োজন অনুযায়ী বিদ্যুৎ, গ্যাসসহ বিভিন্ন ইউটিলিটি বিল, মোবাইল রিচার্জ, শিক্ষা ও চিকিৎসাসেবার ফি, টোল ও টিকিটের মূল্য, কর ও সরকারি সেবার ফি, আমানতের কিস্তি এবং বিমার প্রিমিয়ামসহ নির্ধারিত বিভিন্ন ব্যয় পরিশোধে এই অর্থ ব্যবহার করা যাবে। বাংলাদেশ ব্যাংক অনুমোদিত অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যয়ের ক্ষেত্রেও এ সুবিধা ব্যবহারের সুযোগ থাকবে।

এই ঋণের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, প্রচলিত ঋণের মতো এর ওপর সুদ আরোপ করা হবে না। তবে ঋণের পরিমাণ ও মেয়াদ অনুযায়ী নির্ধারিত একটি মাশুল দিতে হবে। ঋণের মেয়াদ হবে সাত দিন, ১৫ দিন অথবা সর্বোচ্চ ৩০ দিন। বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণের পরিমাণ ও মেয়াদ অনুযায়ী সর্বোচ্চ মাশুল নির্ধারণ করে দিয়েছে।

৫০ টাকা থেকে ২৫০ টাকা পর্যন্ত ঋণের ক্ষেত্রে সাত দিনের জন্য সর্বোচ্চ তিন টাকা, ১৫ দিনের জন্য চার টাকা এবং ৩০ দিনের জন্য ছয় টাকা মাশুল নেওয়া যাবে। ২৫১ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত ঋণে এই মাশুল হবে যথাক্রমে পাঁচ, আট ও ১৫ টাকা। ৫০১ টাকা থেকে এক হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণের ক্ষেত্রে সাত, ১২ ও ২০ টাকা এবং এক হাজার এক টাকা থেকে দুই হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণের ক্ষেত্রে ১০, ২০ ও ৩০ টাকা মাশুল নির্ধারণ করা হয়েছে।

এ ছাড়া দুই হাজার এক টাকা থেকে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণের ক্ষেত্রে সাত, ১৫ ও ৩০ দিনের জন্য সর্বোচ্চ মাশুল হবে যথাক্রমে ১৫, ৩০ ও ৫০ টাকা। তিন হাজার এক টাকা থেকে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণে মাশুল হবে ২০, ৪০ ও ৭০ টাকা। পাঁচ হাজার এক টাকা থেকে সাত হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণে ২৫, ৫০ ও ৯০ টাকা এবং সাত হাজার এক টাকা থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণে ৩৫, ৭০ ও ১৩০ টাকা মাশুল নেওয়া যাবে। অর্থাৎ কোনো গ্রাহক ১০ হাজার টাকা ৩০ দিনের জন্য নিলে সর্বোচ্চ ১৩০ টাকা মাশুল দিতে হবে।

নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী, ঋণের মূল টাকা ও প্রযোজ্য মাশুল যথাক্রমে অষ্টম, ১৬তম অথবা ৩১তম দিনের মধ্যে পুরোপুরি পরিশোধ করতে হবে। তবে গ্রাহক চাইলে নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই ঋণ পরিশোধ করতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সুদ, প্রি-পেমেন্ট বা আগাম পরিশোধের জন্য আলাদা কোনো চার্জ নেওয়ার সুযোগ থাকবে না।

এই ঋণের টাকা গ্রাহকের ব্যাংক হিসাব, মোবাইল ওয়ালেট বা অন্য কোনো হিসাবে জমা হবে না। বরং গ্রাহক যে বিল বা সেবার জন্য ঋণ নিচ্ছেন, সেই অর্থ ডিজিটাল পদ্ধতিতে সরাসরি সংশ্লিষ্ট সেবাদাতা বা বিল গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে পরিশোধ করা হবে। ফলে জরুরি সময়ে অর্থের ঘাটতি থাকলেও গ্রাহক প্রয়োজনীয় বিল বা ফি সময়মতো পরিশোধ করতে পারবেন।

ঋণ পাওয়ার প্রক্রিয়াটিও হবে পুরোপুরি ডিজিটাল। কোনো গ্রাহক নিজের ব্যাংকের অ্যাপের মাধ্যমে নির্ধারিত কোনো বিল বা ফি পরিশোধ করতে গিয়ে পর্যাপ্ত ব্যালান্স না পেলে, যোগ্যতার ভিত্তিতে অ্যাপে ঋণের প্রস্তাব দেখতে পারেন। গ্রাহক প্রস্তাবে সম্মতি দিলে সেখান থেকেই ঋণের আবেদন করা যাবে। আবেদন করার আগে ঋণের পরিমাণ, মেয়াদ, মাশুল, পরিশোধের নিয়মসহ গুরুত্বপূর্ণ শর্তগুলো গ্রাহককে স্পষ্টভাবে জানাতে হবে। এরপর ডিজিটাল পদ্ধতিতে গ্রাহকের সম্মতি নেওয়া হবে এবং নিবন্ধিত মোবাইল নম্বরসহ নির্ধারিত পদ্ধতিতে পরিচয় যাচাই করা হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো বিকল্প ডিজিটাল ক্রেডিট স্কোরিং পদ্ধতি ব্যবহার করতে পারবে। গ্রাহকের ঝুঁকি ও ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা বিবেচনায় ব্যাংকগুলো ঋণের সীমা নির্ধারণ করতে পারবে। একই সঙ্গে গ্রাহকের তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ওটিপি, দুই স্তরের যাচাইকরণ বা মাল্টিফ্যাক্টর অথেন্টিকেশনের মতো নিরাপত্তাব্যবস্থা ব্যবহারের নির্দেশনা রয়েছে।

এই সুবিধা বাস্তবায়নে ব্যাংকগুলো চাইলে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস, পেমেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডার, পেমেন্ট সিস্টেম অপারেটর এবং অন্যান্য ফিনটেক প্রতিষ্ঠানের ডিজিটাল চ্যানেল ব্যবহার করতে পারবে। তবে পুরো কার্যক্রম বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত নিয়ম, গ্রাহক সুরক্ষা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও তথ্য নিরাপত্তা কাঠামোর মধ্যে পরিচালনা করতে হবে।

প্রাথমিকভাবে ব্যাংকগুলোকে অন্তত ছয় মাস পরীক্ষামূলকভাবে এই ই-পেমেন্ট ক্রেডিট সুবিধা পরিচালনা করতে হবে। পাইলট কার্যক্রমের ফলাফল মূল্যায়নের পর সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন নিয়ে বাণিজ্যিকভাবে সেবাটি চালু করা যাবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো গ্রাহকের সাময়িক অর্থসংকট মোকাবিলার পাশাপাশি ডিজিটাল লেনদেনের ব্যবহার বাড়ানো। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, জরুরি সময়ে প্রয়োজনীয় বিল বা ফি পরিশোধ করতে না পারার কারণে অনেক গ্রাহককে জরিমানা বা সেবা বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো সমস্যায় পড়তে হয়। ই-পেমেন্ট ক্রেডিট চালু হলে এসব ক্ষেত্রে দ্রুত অর্থের ব্যবস্থা করা সম্ভব হবে এবং একই সঙ্গে নগদ টাকার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ডিজিটাল লেনদেন আরও বাড়বে।

সিটি ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক অরূপ হায়দার মনে করেন, এই উদ্যোগ ডিজিটাল লেনদেন এবং ক্যাশলেস অর্থনীতি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তাঁর মতে, জরুরি প্রয়োজনে নির্দিষ্ট সেবা ও বিল পরিশোধের সুযোগ তৈরি হলে গ্রাহকদের তাৎক্ষণিক অর্থসংকট যেমন কিছুটা কমবে, তেমনি ডিজিটাল মাধ্যমে লেনদেনের অভ্যাসও বাড়বে।

ফলে নতুন এই সুবিধায় জরুরি সময়ে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থের ব্যবস্থা হলেও এটি সাধারণ নগদ ঋণ নয়। নির্দিষ্ট বিল ও সেবা পরিশোধের জন্যই এই ঋণ ব্যবহার করতে হবে। আর সুদ না থাকলেও ঋণের পরিমাণ ও মেয়াদ অনুযায়ী নির্ধারিত মাশুল পরিশোধ করতে হবে।

মুয়াজ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

অর্থনীতি এর সর্বশেষ খবর

অর্থনীতি - এর সব খবর



রে