ঢাকা, সোমবার, ৩১ আগস্ট ২০২৬

ব্যাংকে ফিরছে ঘরে রাখা টাকা, জুনে কমেছে ১৩ হাজার কোটি

২০২৬ আগস্ট ৩১ ০৮:৩১:৫৯
ব্যাংকে ফিরছে ঘরে রাখা টাকা, জুনে কমেছে ১৩ হাজার কোটি

নিজস্ব প্রতিবেদক: ব্যাংকের বাইরে মানুষের হাতে থাকা নগদ অর্থের পরিমাণ আবারও কমতে শুরু করেছে। চলতি বছরের মে মাসে বড় অঙ্কে বাড়ার পর জুনে ব্যাংকের বাইরে থাকা নগদ অর্থ কমেছে প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা। একই সময়ে ব্যাংক খাতে ছাপানো টাকা বা রিজার্ভ মানির পরিমাণও কমেছে ৯ হাজার কোটি টাকার বেশি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণ করে এ চিত্র পাওয়া গেছে।কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মে শেষে মানুষের হাতে থাকা নগদ অর্থের পরিমাণ ছিল ৩ লাখ ৪৯ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা। জুন শেষে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৩৬ হাজার ৩৭৫ কোটি ২ লাখ টাকা।

অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে মানুষের হাতে থাকা নগদ অর্থ কমেছে ১২ হাজার ৯৯৮ কোটি ৮ লাখ টাকা।

ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নেওয়ার পর দীর্ঘ সময় ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ফেরত না আসা অর্থকে সাধারণভাবে ব্যাংকের বাইরে থাকা নগদ অর্থ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ফলে এ অর্থের পরিমাণ কমার অর্থ হলো, মানুষের হাতে থাকা নগদের একটি অংশ আবার ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ফিরে এসেছে।

চলতি বছরের শুরুতে ব্যাংকের বাইরে থাকা নগদ অর্থের পরিমাণ ধারাবাহিকভাবে বাড়ছিল। জানুয়ারি শেষে মানুষের হাতে নগদ অর্থ ছিল ২ লাখ ৮২ হাজার ৬২৬ কোটি ৮ লাখ টাকা। ফেব্রুয়ারিতে তা বেড়ে হয় ২ লাখ ৮৬ হাজার ৪০৪ কোটি ১ লাখ টাকা। মার্চে আরও বেড়ে দাঁড়ায় ৩ লাখ ৩ হাজার ১৮ কোটি ৭ লাখ টাকা।

তবে এপ্রিলে সেই প্রবণতায় পরিবর্তন আসে। ওই মাস শেষে মানুষের হাতে থাকা নগদ অর্থ কমে দাঁড়ায় ২ লাখ ৯৯ হাজার ৪২৫ কোটি টাকা।এক মাস পর মে মাসে আবার বড় উল্লম্ফন দেখা যায়। ওই মাসে ব্যাংকের বাইরে থাকা অর্থ বেড়ে দাঁড়ায় ৩ লাখ ৪৯ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা।

এরপর জুনে আবার কমেছে মানুষের হাতে থাকা নগদ অর্থ। মে মাসের তুলনায় জুনে কমেছে প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত ব্যাংকের বাইরে থাকা নগদ অর্থ বাড়ছিল। ওই মাসে মানুষের হাতে থাকা নগদ অর্থের পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৯২ হাজার ৪৩৪ কোটি ৪ লাখ টাকা।

এরপর সেপ্টেম্বর থেকেই এ অর্থের পরিমাণ কমতে শুরু করে। সেপ্টেম্বরে তা নেমে আসে ২ লাখ ৮৩ হাজার ৫৫৩ কোটি ৪ লাখ টাকায়। অক্টোবরে কমে হয় ২ লাখ ৭৭ হাজার ৮১০ কোটি ৭ লাখ টাকা। নভেম্বর শেষে তা দাঁড়ায় ২ লাখ ৭৭ হাজার ৪৫৬ কোটি ৭ লাখ এবং ডিসেম্বরে ২ লাখ ৭৬ হাজার ৩৭১ কোটি ৫ লাখ টাকা।

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ব্যাংকের বাইরে থাকা নগদ অর্থ আরও কমে দাঁড়ায় ২ লাখ ৭৪ হাজার ২৩০ কোটি ৯ লাখ টাকা। ফেব্রুয়ারিতে তা নেমে আসে ২ লাখ ৭১ হাজার ৪৯৫ কোটি ৬ লাখ টাকায়।

তবে মার্চে আবার বাড়তে শুরু করে মানুষের হাতে থাকা নগদ অর্থ। ওই মাসে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ৯৬ হাজার ৪৩১ কোটি ৬ লাখ টাকা। এপ্রিলে কমে হয় ২ লাখ ৭৭ হাজার ৩৬৬ কোটি ৯ লাখ টাকা। মে মাসে আবার বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ৯৩ হাজার ৭৭৮ কোটি ৬ লাখ এবং জুনে ২ লাখ ৯৬ হাজার ৪৫১ কোটি ৯ লাখ টাকা।

এরপর জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত আবার টানা কমে। জুলাইয়ে ব্যাংকের বাইরে থাকা নগদ অর্থ ছিল ২ লাখ ৮৭ হাজার ২৯৪ কোটি ১ লাখ টাকা। আগস্টে ২ লাখ ৭৬ হাজার ৪৯৪ কোটি ৬ লাখ, সেপ্টেম্বরে ২ লাখ ৭৪ হাজার ৭২৪ কোটি ২ লাখ, অক্টোবরে ২ লাখ ৭০ হাজার ৪৪৯ কোটি ৭ লাখ এবং নভেম্বরে তা নেমে আসে ২ লাখ ৬৯ হাজার ১৮ কোটি ২ লাখ টাকায়।

ডিসেম্বরে অবশ্য আবার বাড়ে। ওই মাসে মানুষের হাতে থাকা নগদ অর্থ দাঁড়ায় ২ লাখ ৭৫ হাজার ৩৪৩ কোটি ৪ লাখ টাকা। এরপর চলতি বছরের জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি ও মার্চে ধারাবাহিকভাবে বাড়ে। মার্চ শেষে তা ৩ লাখ ৩ হাজার ১৮ কোটি ৭ লাখ টাকায় পৌঁছে যায়।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ব্যাংকের বাইরে থাকা নগদ অর্থের পরিমাণ কমেছিল। তবে নভেম্বর থেকে আবার বাড়তে শুরু করে।

২০২৩ সালের অক্টোবরে মানুষের হাতে থাকা নগদ অর্থের পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৪৫ হাজার ৯৪৩ কোটি টাকা। নভেম্বরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ৪৮ হাজার ৪৪১ কোটি টাকা এবং ডিসেম্বরে ২ লাখ ৫৪ হাজার ৮৬০ কোটি টাকা।

২০২৪ সালের জানুয়ারিতে তা বেড়ে হয় ২ লাখ ৫৭ হাজার ২৯৫ কোটি, ফেব্রুয়ারিতে ২ লাখ ৫৭ হাজার ৫৭৪ কোটি এবং মার্চে ২ লাখ ৬১ হাজার ১৯৫ কোটি টাকা। এপ্রিলে বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ৭০ হাজার ৬৫৮ কোটি টাকা। মে মাসেও একই পরিমাণ ছিল।

জুনে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ৯০ হাজার ৪৩৬ কোটি টাকা, জুলাইয়ে ২ লাখ ৯১ হাজার ৬৩০ কোটি এবং আগস্টে ২ লাখ ৯২ হাজার ৪৩৪ কোটি ৪ লাখ টাকা।

অর্থাৎ ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত প্রায় ১০ মাসে ব্যাংকের বাইরে মানুষের হাতে থাকা নগদ অর্থ বেড়েছিল ৪৬ হাজার ৪৯০ কোটি টাকা।

ব্যাংক খাতে অনিয়ম, দুর্নীতি ও নানা আর্থিক কেলেঙ্কারির কারণে গত কয়েক বছরে ব্যাংকের প্রতি মানুষের আস্থায় চাপ তৈরি হয়। এ সময় অনেক আমানতকারী ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নগদ অর্থ নিজেদের কাছে রাখার প্রবণতা দেখান। এর প্রভাব পড়ে ব্যাংকগুলোর তারল্য পরিস্থিতিতেও।

আমানত ধরে রাখা ও নতুন আমানত সংগ্রহে ব্যাংকগুলো তুলনামূলক বেশি সুদ দিতে শুরু করে। এরপরও একটা সময় পর্যন্ত ব্যাংকের বাইরে থাকা নগদ অর্থ বাড়ার প্রবণতা অব্যাহত ছিল।

তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফেরানোর বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়। এরপর সেপ্টেম্বর থেকে ব্যাংকের বাইরে থাকা নগদ অর্থ কমতে শুরু করে। যদিও পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন মাসে এ প্রবণতায় ওঠানামা দেখা গেছে।

সর্বশেষ জুনে আবারও মানুষের হাতে থাকা নগদ অর্থ কমে যাওয়ায় ব্যাংকিং ব্যবস্থায় নগদ অর্থ ফেরার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।

ব্যাংক খাত বিশ্লেষক এবং চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের রিসার্চ ফেলো হেলাল আহমেদ জনি বলেন, মানুষের হাতে থাকা নগদ অর্থ কমে যাওয়ার অর্থ হলো, নগদের একটি অংশ আবার ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ফিরে আসছে। এটি ব্যাংকের তারল্য পরিস্থিতি ও আমানত প্রবাহের জন্য ইতিবাচক সংকেত।

তিনি বলেন, বিশেষ করে দীর্ঘদিন ব্যাংকের প্রতি আস্থার সংকটের পর মানুষ যদি নগদ টাকা ঘরে না রেখে ব্যাংকে রাখার প্রবণতায় ফিরে আসে, তাহলে ব্যাংকগুলোর আমানতভিত্তি শক্তিশালী হবে।

তবে এক মাসের তথ্যের ভিত্তিতে ব্যাংক খাতে মানুষের আস্থা পুরোপুরি ফিরে এসেছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না বলেও সতর্ক করেন তিনি।

তার মতে, নগদ অর্থের প্রবাহ বিভিন্ন সময় বাড়া-কমার পেছনে মূল্যস্ফীতি, লেনদেনের চাহিদা, ঈদ বা উৎসব, সুদের হার এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির প্রভাব থাকে। কয়েক মাস ধরে ব্যাংকের বাইরে থাকা নগদ অর্থ ধারাবাহিকভাবে কমলে সেটিকে আস্থা ফেরার আরও শক্তিশালী ইঙ্গিত হিসেবে দেখা যাবে।

মানুষের হাতে থাকা নগদ অর্থ কমার পাশাপাশি ব্যাংক খাতে ছাপানো টাকা বা রিজার্ভ মানির পরিমাণও জুনে কমেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মে শেষে রিজার্ভ মানির স্থিতি ছিল ৪ লাখ ৮৫ হাজার ৫৪২ কোটি ১০ লাখ টাকা। জুন শেষে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৭৬ হাজার ৩৬৮ কোটি ৬ লাখ টাকা।

অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে রিজার্ভ মানি কমেছে ৯ হাজার ১৭৩ কোটি ৫ লাখ টাকা।

ব্যাংকের বাইরে থাকা নগদ অর্থ ও রিজার্ভ মানি—দুই সূচকেই জুনে পতন দেখা যাওয়াকে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় নগদ অর্থের প্রবাহের পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

হেলাল আহমেদের মতে, রিজার্ভ মানি ও মানুষের হাতে থাকা নগদ—দুই সূচকেই জুনে কমতি দেখা গেছে। এর ফলে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় নগদ অর্থের পুনঃপ্রবাহের একটি ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।

এখন ব্যাংকগুলোর প্রধান কাজ হবে এই বাড়তি তারল্যকে উৎপাদনশীল খাতে ঋণপ্রবাহে কাজে লাগানো এবং একই সঙ্গে আমানতকারীদের আস্থা আরও শক্তিশালী করা।

মুসআব/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

অর্থনীতি এর সর্বশেষ খবর

অর্থনীতি - এর সব খবর



রে