ঢাকা, রবিবার, ৫ এপ্রিল ২০২৬
Sharenews24

শেয়ারবাজারের ৩৭ কোম্পানির বিরুদ্ধে অডিটরদের লাল সতর্কবার্তা

২০২৬ এপ্রিল ০৫ ২০:২০:১৩
শেয়ারবাজারের ৩৭ কোম্পানির বিরুদ্ধে অডিটরদের লাল সতর্কবার্তা

নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত বেশ কিছু কোম্পানির আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অডিটররা ৩৭টি কোম্পানির ক্ষেত্রে ‘গোয়িং কনসার্ন’ সতর্কতা জারি করায় এসব প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূত্রে জানা গেছে, এই ৩৭টি কোম্পানি মোট তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের ১০ শতাংশেরও বেশি। ফলে বিষয়টি বিনিয়োগকারী ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

অডিট প্রতিবেদনে ‘গোয়িং কনসার্ন’ সতর্কতা দেওয়া হয় তখনই, যখন কোনো প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যতে কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা নিয়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। ধারাবাহিক লোকসান, ঋণের চাপ, তারল্য সংকট কিংবা উৎপাদন ব্যাহত হওয়া—এসব কারণেই সাধারণত এমন সতর্কতা দেওয়া হয়।

সতর্কতাপ্রাপ্ত কোম্পানিগুলোর মধ্যে বিভিন্ন খাতের পরিচিত নাম রয়েছে, যেমন—বারাকা পাওয়ার, ডরিন পাওয়ার, বিডি থাই ফুড। এছাড়া তালিকায় রয়েছে একাধিক বস্ত্র, ওষুধ ও আর্থিক খাতের প্রতিষ্ঠান।

বিশেষ করে নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই) খাতের বেশ কয়েকটি কোম্পানি গুরুতর সংকটে রয়েছে। ঋণ খেলাপি বৃদ্ধি, তারল্য সংকট এবং নেতিবাচক আয় পরিস্থিতির কারণে এসব প্রতিষ্ঠানের টিকে থাকার ঝুঁকি বেড়েছে।

তালিকাভুক্ত ৩৭টি কোম্পানির মধ্যে ৯টি বর্তমানে সম্পূর্ণভাবে বন্ধ রয়েছে, যা বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এসব প্রতিষ্ঠান আয় করতে ব্যর্থ হওয়ার পাশাপাশি আর্থিক তথ্য প্রকাশেও অনিয়ম করছে, ফলে শেয়ারহোল্ডাররা প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে অন্ধকারে থাকছেন।

অডিট প্রতিবেদনে কয়েকটি কোম্পানির দুরবস্থার চিত্র স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। যেমন—ইন্ডো-বাংলা ফার্মাসিউটিক্যালস ধারাবাহিক লোকসানে রয়েছে এবং তারল্য সংকট প্রকট। অন্যদিকে, সাফকো স্পিনিংস বিপুল লোকসানের পাশাপাশি ১৪০ কোটির বেশি ব্যাংক ঋণে জর্জরিত, কার্যক্রম প্রায় বন্ধ এবং সম্পদ কম মূল্যে বিক্রি করা হয়েছে।

বিদ্যুৎ খাতেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। বারাকা পাওয়ার-এর একটি প্রধান বিদ্যুৎকেন্দ্র ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে বন্ধ রয়েছে, কারণ বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)-এর সঙ্গে চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়েছে। নতুন চুক্তি না হলে কোম্পানিটির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত।

অন্যদিকে, ডরিন পাওয়ার-এর কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুক্তি শেষ হলেও সহায়ক প্রতিষ্ঠানের ডিভিডেন্ডের ওপর নির্ভর করে কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রাখে, যা তুলনামূলকভাবে কিছুটা ইতিবাচক দিক।

আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থাও উদ্বেগজনক। প্রাইম ফাইন্যান্স ও ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের মতো কয়েকটি প্রতিষ্ঠান মারাত্মক তারল্য সংকট, খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি এবং নেতিবাচক আয় পরিস্থিতিতে রয়েছে, যা তাদের দেউলিয়াত্বের ঝুঁকি বাড়িয়েছে।

আরেকটি উদাহরণ হিসেবে বাংলাদেশ সার্ভিসেস লিমিটেডের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, তাদের মোট লোকসান ৭০০ কোটির বেশি, পাশাপাশি চলতি সম্পদের ঘাটতি ও উচ্চ ঋণের কারণে প্রতিষ্ঠানটির টিকে থাকা নিয়ে গুরুতর সন্দেহ প্রকাশ করেছেন অডিটররা।

এছাড়া আরও ২৩টি তালিকাভুক্ত কোম্পানি দীর্ঘদিন ধরে কার্যক্রমহীন এবং আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে মোট প্রায় ৬০টি কোম্পানি এখন ঝুঁকিপূর্ণ বা অস্বচ্ছ অবস্থায় রয়েছে, যা প্রায় ৩৬০টি তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে একটি বড় অংশ।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি শেয়ারবাজারের কাঠামোগত দুর্বলতার প্রতিফলন—যার মধ্যে রয়েছে দুর্বল করপোরেট সুশাসন, নিয়ন্ত্রক সংস্থার সীমিত কার্যকারিতা এবং জবাবদিহিতার অভাব।

বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)-এর পক্ষ থেকে দ্রুত ও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। এর মধ্যে থাকতে পারে কঠোর নজরদারি, তথ্য প্রকাশে স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ এবং দীর্ঘদিন অকার্যকর বা অনিয়মকারী কোম্পানিকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার মতো সিদ্ধান্ত।

এএসউদ্দিন/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর



রে