ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১২ মার্চ ২০২৬
Sharenews24

বিমানবন্দরে দুবাই আতঙ্ক, সোনা আমদানিতে বাড়ছে জটিলতা

২০২৪ জুন ০৪ ১১:৩৭:০৪
বিমানবন্দরে দুবাই আতঙ্ক, সোনা আমদানিতে বাড়ছে জটিলতা

মোহাম্মদ আবদুল্লাহ মজুমদার : দুবাই প্রবাসী ইকবাল হোসেন। দেশে যাওয়া-আসা করেন মাসে ৫-৬ বার। অন্যান্য প্রবাসীরা যেখানে বছরের পর বছর ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও স্বজনদের সঙ্গে স্বাক্ষাৎ করতে দেশে আসতে পারেন না সেখানে ইকবাল হোসেনের মত কতিপয় প্রবাসী কোন কোন মাসে ৮-১০ বারও দেশে আসা যাওয়া করেন। তবে প্রতিবার এলেই যে স্বজনদের সাথে দেখা হয়, তা নয়। বেশিরভাগ সময় তারা বিমানবন্দর থেকেই আবার দুবাই ফিরে যান। ইকবালের বাবার কাছে জানতে চাইলে তিনি উত্তর দেন, তার ছেলে স্বর্ণের ব্যবসা করেন। আরব আমিরাতের দুবাই থেকে সোনার বার আনেন বাংলাদেশে। প্রথমে দুবাই যাওয়ার সময় বাবার কাছ থেকে ১৪-১৬ লাখ টাকার পুঁজি নিয়ে গেলেও এখন তার প্রতিদিনের আর্থিক তারল্য ৬০-৭০ লাখ টাকা। কিন্তু মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান ইকবাল কিভাবে এত ব্যয়বহুল পুঁজির সোনার ব্যবসার সঙ্গে জড়িত হলেন তার উত্তর কারোর কাছেই নেই।

জানা যায়, একাধিক সোনার বার নিয়ে তিনি প্রতিবারই দেশে আসেন। একটি নিজের হলেও অপর দুটি অন্যজনের সোনার বার বহন করেন। কিন্তু যার সমস্ত নিরাপত্তা, শুল্ক ও ঝুঁকি বহনের দায়িত্ব যার সোনা বহন করেন তার উপরই। নিজেরটা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কলাকৌশলে ইমিগ্রেশন পার করে বিক্রি করে দেন বাংলাদেশি সোনা ব্যবসায়ীদের কাছে।

ইকবাল হোসেনের মত আরেক দুবাই প্রবাসী মাহবুবুর রহমান। তিনি ইকবালের মত প্রাথমিক কোন পুঁজি নিয়েও সেখানে যাননি। তাই ইকবাল হোসেনের মত অন্য দুটির সঙ্গে কলাকৌশল খাটিয়ে নিজের বার আনতে পারেন না। অন্যদের গুলোই বহন করেন। প্রায় সময়ই সোনার বার নিয়ে অবতরণ করেন বাংলাদেশের বিভিন্ন বিমানবন্দরে। জানতে চাইলে তিনি বলেন, সবকিছুর দায়-দায়িত্ব মালিকের। আমার কাজ শুধুমাত্র দুবাই থেকে দেশে পার করে দেয়া।

মাহবুব ও ইকবালের মত প্রবাসীদের মাধ্যমে এভাবে প্রতিদিনই দুবাই থেকে সোনার বার ঢুকছে বাংলাদেশে। যার সিংহভাগই হলো চোরাচালান। তবে নিয়মরক্ষা বা কাস্টমসের চোখ ফাঁকি দেয়ার কৌশল হিসেবে মাঝে মাঝে দু’একটি বার শুল্ক পরিশোধের মাধ্যমে আইন অনুযায়ী ঢুকানো হয়।

দুবাই প্রবাসীদের এমন কৃতকর্মের ফলে বিমানবন্দরে বাড়ছে অপ্রয়োজনীয় তল্লাশি ও হয়রানি। এখন পারিবারিক প্রয়োজনে প্রবাসীরা অলংকার বা নূনতম একটি বার আনার ক্ষেত্রেও আতঙ্ক অনুভব করেন।

প্রতিবছর দেশে সোনার চাহিদা সরকারি হিসাব মতে ২০ থেকে ৪০ টন এবং বেসরকারি হিসাব মতে ৭০ থেকে ৯০টন বলে জানায় বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি-বাজুস। অথচ দেশে বছরে আমদানি হয় মাত্র ৬৫ থেকে ৭০ কেজি সোনা। যদিও অলংকারের কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে জুয়েলারি ব্যবসায়ীরা ভ্যাট জটিলতাসহ বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতাকে দায়ী করেই আসছেন। বাকি স্বর্ণের যোগান কীভাবে হয় তার যথার্থ উত্তর কোথাও পাওয়া যায় না। বিভিন্ন সময় গণমাধ্যমে স্বর্ণ চোরাচালানের খবর বের হয়, বিমানবন্দরে ধরা পড়ে হাজার হাজার চোরাই সোনার বার। কিন্তু কিভাবে আসে এসব সোনা, আবার ধরা পড়ার পর এগুলো যায় কোথায়, তার উত্তর স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলেও পাওয়া যায়নি।

দুবাইয়ের একাধিক প্রবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজধানী শহর দুবাইয়ে বাংলাদেশি অধ্যুষিত এলাকা, বিমানবন্দর, শপিং মলসহ বিভিন্ন স্থানে বাংলাদেশে সোনার বার নিয়ে যাওয়ার জন্য বিভিন্নভাবে অনুরোধ করেন বাংলাদেশি প্রবাসীদের একটি অংশ।

প্রবাসী যাত্রীরা জানান, এসব স্বর্ণ যাত্রীর ব্যক্তিগত মালামাল হিসেবে আনা হলেও দেশে পৌঁছানোর পর চলে যায় স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের হাতে। অনেক প্রবাসী পর্যটন ভিসায় বাংলাদেশ থেকে চাকরির জন্য দুবাই যান। পরে ভিসার বৈধতা না থাকায় তাদের অনেকেই চাকরি পান না। কেউ কেউ চাকরি পেলেও পর্যটন ভিসা হওযার কারণে তাদের বেতন ধরা হয় খুব স্বল্প। স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা এসব প্রবাসীদের টার্গেট করে তাদের অর্থের লোভ দেখিয়ে নিজেদের প্রতিনিধি হিসেবে বাংলাদেশের বিমানবন্দরে স্বর্ণ পারাপারের কাজে লাগায়। আবার অনেক প্রবাসী পার্টটাইম জব হিসেবেও এমন কাজ করে থাকেন।

বাজুসের সহ সভাপতি এম এ হান্নান আজাদ জানান, বিমানবন্দরে সোনা আনা-নেওয়ার কাজে এসব প্রবাসীদের ব্যবহার করার করণে এখন দেশের প্রতিটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তল্লাশি বেড়েছে। যার প্রেক্ষিতে এখন সাধারণ যাত্রীদেরও হয়রানির মাত্রা বেড়ে গেছে। আর বৈধভাবে সোনা আমদানির জন্য যে জটিলতা ছিল সেটি দিন দিন বাড়ার পাশাপাশি সোনা আমদানির প্রতিবন্ধকতা জোরালো হচ্ছে। চোরাচালান ও নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের কারণে জুয়েলারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যাংকও ঋণ দিতে গড়িমসি করে। কারণ চোরাচালান ও বিভিন্ন নেতিবাচক কাণ্ডে জুয়েলারি প্রতিষ্ঠানগুলোর দেউলিয়া হওয়ার সম্ভাবনাও থাকে। দেশের জুয়েলারি শিল্পকে সমৃদ্ধ করার জন্য স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা সরকারের কাছে নির্দিষ্ট নীতিমালা প্রনয়ণ ও বিভিন্ন জটিলতা নিরসনে যেসব দাবি জানিয়ে আসছে সেগুলোও বার বার হোঁচড় খেয়ে থেমে যাচ্ছে অনিয়ন্ত্রিত চোরাচালানের জন্য। বিমানবন্দর পুলিশ জানায়, গত ৩ বছরে বিমান্দবন্দরে যত স্বর্ণের বারের চোরাচালন ধরা পড়েছে তার প্রায় ৯০ শতাংশই দুবাইয়ের। তবে বড় চোরাচালানের ক্ষেত্রে যেসব চালানের মালিক শনাক্ত করা যায়নি সেসব চালানের ক্ষেত্রেও প্রায় শতভাগ দুবাইয়ের চালান। তবে এখন বিমানবন্দর পুলিশ ও কাস্টম হাউজ আগে থেকে অনেক কঠোর। যার প্রেক্ষিতে প্রথমে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে সোনা আমদানির লাইসেন্স দেয়া হলেও এখন সেটি একদমই বন্ধ।

বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের তথ্য অনুয়ায়ী গত ১০ বছরে যে পরিমাণ সোনা বিভিন্ন চোরাচালানে জব্দ হয়েছে তা বৈধ পথে আমদানি করা হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভে ২২ বিলিয়ন ডলার জমা হতো। সরকার রাজস্ব পেত প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা।

সোনা ও হীরা চোরাচালানের মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছরে ৯১ হাজার ২৫০ কোটি টাকার বেশি পাচার হয়ে যাচ্ছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ জুয়েলারি সমিতি- বাজুস।

কীভাবে ঢুকছে এত সোনা?

বাজুস সূত্র জানায়, ২০১৯ সালে ১৮ জনকে গোল্ড ডিলারকে লাইসেন্স দেয়া হয়। তাদের মাধ্যমে প্রথম কিছুদিন স্বর্ণ আমদানি হলেও বর্তমানে বন্ধ আছে। এ আমদানি লাইসেন্স স্থগিতের জন্যও বিমানবন্দরে চোরাচালান ভিত্তিক স্বর্ণের ছড়াছড়ি দায়ী করেছেন ব্যবসায়ীরা। বাকি ব্যবসায়ীদের বড় একটি অংশ অলংকার তৈরির কাঁচামালের জন্য প্রবাসীদের লাগেজে করে আনা স্বর্ণের বারের ওপরই নির্ভর করেন। বলা যায় এসব সোনা ‘বৈধ চোরাচালানের’ মাধ্যমেই দেশে আসে। অর্থাৎ ট্যাক্স পরিশোধের মাধ্যমে এসব সোনা ঢুকলেও এতে বাণিজ্যিক কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহারের বিষয়টি গোপন করা হয়। যার প্রেক্ষিতে ব্যক্তিগত মালামাল হিসেবে এসব সোনা বৈধ হলেও বাণিজ্যিক ব্যবহারের ক্ষেত্রে অবৈধই থেকে যায়। যেহেতু দেশে অলংকারের কাঁচামাল আসার সকল পথই বন্ধ তাই বাংলাদেশে জুয়েলারি শিল্প পরিচালনার জন্য কাঁচামালের যোগানের পদ্ধতি নিয়ে সরকারের প্রতি প্রশ্ন রাখেন ব্যবসায়ীরা। বিমানবন্দর ছাড়াও স্থল সীমান্তে স্বর্ণ চোরাচালানের জন্য খুলনা বিভাগের জেলাগুলোকে চিহ্নিত করেছে বাজুস। স্থল সীমান্তের এসব জেলা দিয়ে শুধুমাত্র ২০২৩ সালে প্রায় ১০২ কোটি টাকার সোনা জব্দ করার কথা জানিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ। ২০২৪ সালের প্রথম ৩ মাসেই প্রায় পৌনে ২৮ কেজি সোনা খুলনা বিভাগের জেলাগুলো থেকে জব্দ করার কথা জানায় বিজিবি।

বর্তমানে ১০ গ্রাম, ১০০ গ্রাম, ৫০০ গ্রাম ও ১০০০ গ্রামের সোনার বার রয়েছে। একজন ব্যক্তি বিদেশ থেকে সর্বোচ্চ ১শ গ্রাম পর্যন্ত স্বর্ণের বার কোন প্রকার শুল্ক ও কর ছাড়াই আনতে পারেন। তবে এ ক্ষেত্রে একই ধরণের অলংকার ১২টির বেশি আনা যাবে না। এরপর একজন সাধারণ যাত্রী চাইলে আরো ১১৭ গ্রাম আনতে পারেন শুল্ক প্রদান সাপেক্ষে। সাধারণত একটি স্বর্ণের বার ১শ গ্রামের হয়ে থাকে, সেক্ষেত্রে দুটি বার আনা বৈধ। তবে এজন্য অবশ্য ওই ব্যক্তিকে বিমানবন্দরে নামার আগেই প্লেনে দেয়া নির্দিষ্ট ফরমে বার থাকার ঘোষণা (ডিক্লারেশন) দিতে হবে। পরে তার শুল্ক পরিশোধ করতে হবে। এর বেশি লুকায়িত অবস্থায় কেউ আনলে সেটি ১৯৬৯ সালের কাস্টমস আইন অনুযায়ী বাজেয়াপ্ত করে কাস্টম তা জব্দ করে নেবে।

দুবাইয়ের স্বর্ণ বহনকারী কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা সেখানকার চাকরি বা অন্য কোন রোজগারের পন্থার ওপর তেমন নির্ভরশীল নন। এ স্বর্ণ বহন করেই তাদের মূল জীবিকা। তবে যারা পেশাগত ভাবেই বিভিন্ন সময় বড় চালানগুলো বহন করেন তাদের বেশিরভাগই থাকে অপরিশোধিত সোনা। বড় চালানগুলোর পরিমাণ সর্বনিম্ন কয়েক কেজি পর্যন্ত হয়ে থাকে। তবে এসব বড় চালানগুলোও ১০০ গ্রামের ছোট একটি বার দেখিয়ে বাকি সব গোপন করে পার করার চেষ্টা করা হলেও বেশিরভাগই ধরা পড়ে যায়।

তবে সম্প্রতি ব্যাগজ রুল ব্যবহারের মাধ্যমে সোনার বার আনা বন্ধ করার প্রস্তাব করেছে বাজুস। বাজুসের দাবি ট্যাক্স ফ্রি সোনার অলংকার আনার ক্ষেত্রে ১’শ গ্রামের পরিবর্তে ৫০ গ্রাম করার দাবি জানিয়েছে বাজুস। একইসঙ্গে একই ধরণের অলংকার ২টির বেশি না আনাসহ একজন যাত্রীকে বছরে একবারের বেশি এ সুবিধা না দেয়ার দাবিও জানিয়েছে বাজুস।

স্বর্ণ কতটুকু আনা বৈধ

বাংলাদেশের কাস্টমস হাউজ সূত্রে জানা যায়, একজন ব্যক্তি বিদেশ থেকে ব্যক্তিগত ১শ গ্রামের পরও শু্লক পরিশোধ করে সর্বোচ্চ আরও ১১৭ গ্রাম পর্যন্ত স্বর্ণের বার আনার বৈধতা রয়েছে। যার আনুমানিক আন্তর্জাতিক বাজার মূল্য প্রায় ৭ লাখ টাকা। এজন্য বিমানবন্দরে নেমে কাস্টমস কর্মকর্তার কাছে গিয়ে প্রতিবারে শুল্ক ৪০ হাজার টাকা পরিশোধ করতে হয়। সোনার বারের ক্ষেত্রে প্রতি ১১.৬৭ গ্রাম বা ১ ভরির জন্য ২ হাজার করে প্রতি বারের জন্য ২০ হাজার টাকা ট্যাক্স পরিশোধ করতে হয়। দুটি বারের বেশি স্বর্ণ আনলে সেটি জব্দ করে বহনকারীকে আটক রশিদ (ডিটেনশন ম্যামো) দেয় কাস্টমস। জব্দকৃত সোনার বার পরবর্তীতে আমদানি ও রফতানি নিয়ন্ত্রক দফতরের ছাড়পত্র, শুল্ক এবং অর্থদণ্ড পরিশোধ করে ফেরত পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে সেক্ষেত্রে জরিমানা হিসেবে স্বর্ণের ট্যাক্সের সর্বোচ্চ ১০ গুণ পর্যন্ত আদায় করার বিধান রয়েছে। যার জন্য যাত্রীকে প্রতিটি সোনার বারে ২ লাখ টাকার অধিক জরিমানা গুনতে হতে পারে। তবে কাস্টমস কর্তৃপক্ষের কাছে যদি মনে হয় চোরাচালানের উদ্দেশ্যে এই বারগুলো আনা হয়েছে, তবে বহনকারীকে আটক করে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ তার বিরুদ্ধে বিমানবন্দরের নিকটস্থ থানায় ফৌজদারি মামলা করবে। আসামিকে নিকটস্থ থানার কাছে হস্তান্তর করে তদন্ত করবে।

স্বর্ণের বারে ট্যাক্সের বিষয় থাকলেও বিদেশ থেকে আনা অলংকারের ক্ষেত্রে ১০০ গ্রাম পর্যন্ত কোনো ট্যাক্স দিতে হবে না। তবে একই ধরনের অলংকার সংখ্যায় ১২টির অধিক আনা যাবে না। এর বেশি আনলে অতিরিক্ত প্রতি গ্রামের জন্য প্রায় ১৫০০ টাকা ট্যাক্স পরিশোধ করতে হবে। আর বাণিজ্যিক পরিমাণ বলে মনে হলে কাস্টমস তা আটক করে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় জরিমানা আদায় করবে।

অধিকাংশ জুয়েলারি প্রতিষ্ঠানেই দুবাইয়ের স্বর্ণ

২০১৯ সালে লাইসেন্স প্রাপ্ত ১৮ জন ডিলারের স্বর্ণ বাংলাদেশে কেবল ৭-৮টি প্রতিষ্ঠানের নামে অল্পকিছু স্বর্ণ বৈধভাবে আমদানি করা হতো। তবে কিছু স্বর্ণ রিফাইনিং করা হয়। প্রবাসীদের দিয়ে স্বর্ণের বার আনার কারণে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারালেও বৈধভাবে স্বর্ণের বাণিজ্যিক কাঁচামাল আমদানিতে নানা জটিলতার কথা জানায় ব্যবসায়িরা।

বাংলাদেশের স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের দাবি, বর্তমানে কিছু ব্যবসায়ী প্রবাসীদের দিয়ে স্বর্ণের বার বহন করানোর ফলে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ ও বিমানবন্দর পুলিশের নজরদারি এবং সন্দেহ বেড়েছে। যার প্রেক্ষিতে এখন ব্যক্তিগত অলংকার বা সোনার বার আনার ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত ভোগান্তি পোহাতে হয় বলে জানায় সাধারণ প্রবাসীরা। সেই সঙ্গে এমন ‘বৈধ চোরাচালান’ ও সোনা আনা-নেওয়ার চোর-পুলিশ খেলার কারণে দিন দিন সোনা আমদানির ক্ষেত্রে জটিলতা বাড়ছে বলে দাবি করছেন ব্যবসায়িরা। যার জন্য দিন দিন ক্ষীণ হচ্ছে জুয়েলারি খাতের বিপুল সম্ভাবনা।

তবে যারা দুটির বেশি বার আনেন তারা প্রবাসীদের পাশাপাশি বেছে নেয়া হয় বিমানবন্দরের ক্লিনার, ক্যাটারিংয়ের লোকজন, পাইলট, কেবিন-ক্রুদের। গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিংয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাধ্যমেও করিয়ে থাকেন এসব কাজ। ব্রোকাররা স্বর্ণের বড় চালানোগুলো এসব কর্মকর্তা-কর্মচারির সঙ্গে আলোচনা করে দেশে আনেন। এজন্য তারা একপক্ষ অপরপক্ষের সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপে ম্যাসেজ আদান-প্রদানের মাধ্যমে যোগাযোগ করেন বলে জানা যায়।

দুবাই প্রবাসী সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশে স্বর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে মাত্র ৪-৫ জন ব্যক্তি দুবাইয়ে স্বর্ণের দোকানগুলোর সঙ্গে চুক্তি করে স্বর্ণ কেনে। এসব দোকানের অধিকাংশই দুবাইয়ের ডেরা এলাকার। যা দুবাইয়ে গোল্ড স্যুক নামে পরিচিত। গোল্ড স্যুকের স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা সরাসরি বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে যোগাযোগ না করে তারা কয়েকজন বাংলাদেশি ডিলারের মাধ্যমে যোগাযোগ করেন। ডিলারদের অর্ডার অনুযায়ী স্বর্ণের বার প্রস্তুত রাখালে পরে ডিলাররা বাংলাদেশের স্বর্ণের দোকানগুলোতে সরবরাহ করেন।

সোনার বার প্রস্তুত করার পর তারা নিজেদের ব্রোকারকে দিয়ে বহন করার লোক খোঁজেন। বাহকদের সঙ্গে দরকষাকষি করে বাংলাদেশে স্বর্ণ পাঠান। এসব বাহকদের অধিকাংশই হলো প্রবাসী শ্রমিক। একবারের আসা-যাওয়ায় তাদেরকে স্বর্ণের বার এবং এর অফিসিয়াল ট্যাক্সের পাশাপাশি পারিশ্রমিক হিসেবে ২০ হাজার টাকা দেয়া হয়। অনেক প্রবাসী লোভে পড়ে নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অতিরিক্ত বার আনতে চাইলেও তখন তাদেরকে চাহিদা অনুযায়ী বার দেয়া হয়।

দুবাই থেকে ‘বৈধ চোরাচালানে’ ১ ভরি স্বর্ণ আনলে একজন ব্যবসায়ীর লাভ থাকে প্রায় ২৩ হাজার টাকার মতো। এই ২৩ হাজারের মধ্যে ২ হাজার টাকা শুল্ক দিতে হয় বিমানবন্দরে। লাভ থাকে ২১ হাজার টাকা। অর্থাৎ দুবাই থেকে কেউ যদি একটি স্বর্ণের বার আনে সেটিতে মোট ১০০ গ্রাম বা প্রায় ৮.৫৭ ভরির সমান স্বর্ণ আসে। এক্ষেত্রে কোনো ব্যবসায়ী একটি বার আনালে বাংলাদেশে তার মোট লাভ হয় ১ লাখ টাকার একটু বেশি।

বৈধ চোরাচালানের অর্থ হলো ব্যক্তি নিজের পণ্য দেখিয়ে নিয়ে আসে কিন্তু চলে যায় অন্যের কাছে। নিয়মিত স্বর্ণ আনা একজন প্রবাসীরা জানায়, দুবাই থেকে যেসব প্রবাসী স্বর্ণ নিয়ে আসেন তাদের আগে থেকেই ঢাকায় এসে ফোন দেয়ার জন্য একজনের যোগাযোগের নাম্বার দেয়া হয়। বাংলাদেশের বিমানবন্দরে নামার পর প্রবাসীরা স্বর্ণগ্রহীতাকে ফোন দেন। স্বর্ণগ্রহীতারা বেশিরভাগ বিমানবন্দরের ভেতরের কর্মচারী। তারা বিমানবন্দরের পার্কিং লট, টয়লেট, নামাজের ঘরসহ বেশ কয়েকটি পয়েন্টে স্বর্ণ হাতবদল করেন। বিশেষ করে বিভিন্ন সংস্থার কর্মরত নিরাপত্তা প্রহরী, ট্রলিম্যান, বোর্ডিং ব্রিজের কর্মকর্তা ও ম্যাকানিকরা প্রবাসীদের কাছ থেকে স্বর্ণ সংগ্রহ করে থাকেন। এছাড়াও দুবাই থেকে কোনো প্রবাসী স্বর্ণ বহনে রাজি হলে তাকে বারপ্রতি দেয়া হয় ১০ হাজার টাকা।

স্বর্ণ চোরাচালানে যুক্ত বিমান কর্মকর্তারাও

দেশের বিভিন্ন বিমানবন্দরে দীর্ঘদিন ধরে স্বর্ণ চোরাচালানের সঙ্গে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তাদের জড়িত থাকার অভিযোগ থাকলেও বিভিন্ন সময়ে বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রমাণও পাওয়া গেছে।

অধিকাংশ সময়ই বিমানবন্দরে সোনা পরিত্যক্ত অবস্থায় পাওয়া গেলেও তার মালিক হিসেবে কাউকে শনাক্ত করা যায় না। কাস্টমস কর্তৃপক্ষ জানায়, বিভিন্ন সময় ধরা খাওয়ার আশঙ্কা থেকেই বিমান কর্মকর্তারা স্বর্ণ রেখে পালিয়ে যান।

তবে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) তাহেরা খন্দকার জানান, বিমানের কোন কর্মীর নামে মামলা হলে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। পরে তদন্তে দোষী প্রমাণিত হলে চাকরিচ্যুতও করা হয়। এসব বিষয় পুরোপুরি আইনি প্রক্রিয়ায় হয়। তবে বিমানের কর্মকর্তারা যাতে কোনো ধরনের অপরাধে যুক্ত না হওয়ার জন্য ইতোমধ্যে তাদের নোটিশ দিয়ে সতর্ক করা হয়েছে।

শেয়ারনিউজ, ০৪ জুন ২০২৪

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

জাতীয় এর সর্বশেষ খবর

জাতীয় - এর সব খবর



রে