×
ঢাকা, সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬

ইরানের নতুন চালেই পাল্টে যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার সমীকরণ! 

২০২৬ অক্টোবর ২৬ ১৭:২৭:০৭
ইরানের নতুন চালেই পাল্টে যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার সমীকরণ! 

নিজস্ব প্রতিবেদক: মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি ঘিরে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) সম্ভাব্য সামরিক কৌশল, উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে মার্কিন সেনা সরিয়ে নেওয়ার দাবি, সৌদি আরবের আঞ্চলিক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ এবং লোহিত সাগরে ভারতীয় বাণিজ্যিক নৌযানে হামলার একটি বিতর্কিত ঘটনার বিবরণ সামনে এসেছে। এসব বিষয়কে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা তুলে ধরা হয়েছে।

তবে আলোচনায় থাকা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দাবির স্বাধীন ও নির্ভরযোগ্য সত্যতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বিশেষ করে ইরানের কথিত নতুন সামরিক নীতি, উপসাগরীয় দেশগুলোতে স্লিপার সেলের উপস্থিতি, মার্কিন সেনা প্রত্যাহার এবং ভারতীয় নৌযান ধ্বংসের ঘটনাসংক্রান্ত তথ্য যাচাই ছাড়া নিশ্চিত ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।

ইরানের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে আলোচনায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের পাশাপাশি স্থল অভিযান এবং আঞ্চলিক মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ভূমিকার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। বিশ্লেষণটিতে দাবি করা হয়েছে, ইরান আক্রান্ত হলে শুধু দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে পাল্টা জবাব না দিয়ে প্রতিপক্ষের ভূখণ্ডে বিশেষ বাহিনী পাঠানোর কৌশলও বিবেচনা করতে পারে।

একই সঙ্গে সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার ও কুয়েতের মতো উপসাগরীয় দেশগুলোতে ইরানের কথিত ‘স্লিপার সেল’ সক্রিয় থাকার আশঙ্কার কথা বলা হয়েছে। তবে এসব দেশে ইরানের নির্দেশনায় পরিচালিত এমন নেটওয়ার্কের বিস্তার বা তাদের সম্ভাব্য সামরিক ভূমিকা সম্পর্কে নির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়া সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না।

ইরান-সমর্থিত ইরাকি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সম্ভাব্য ভূমিকার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। ইরাকে সক্রিয় বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর সমন্বয়ে গঠিত পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেস (পিএমএফ), যা আরবিতে হাশদ আল-শাবি নামে পরিচিত, আঞ্চলিক নিরাপত্তা সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ একটি পক্ষ। তবে এই বাহিনীর সদস্যসংখ্যা, কমান্ড কাঠামো এবং সৌদি আরব বা কুয়েতের সীমান্তের দিকে সম্ভাব্য অগ্রযাত্রা সম্পর্কে যেকোনো নির্দিষ্ট দাবি যাচাই করা জরুরি।

কাতারের আল-উদেইদ বিমানঘাঁটি, কুয়েতের আলী আল-সালেম বিমানঘাঁটি এবং বাহরাইনসহ উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি রয়েছে। এসব ঘাঁটি মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক কার্যক্রম, আকাশপথে অভিযান এবং আঞ্চলিক মিত্রদের সঙ্গে সমন্বয়ের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

বিশ্লেষণটিতে দাবি করা হয়েছে, সম্ভাব্য সংঘাতের ঝুঁকি বিবেচনায় যুক্তরাষ্ট্র এসব ঘাঁটি থেকে সম্মুখ সারির সেনাদের সরিয়ে নিরাপদ অবস্থানে নিচ্ছে। এমন পদক্ষেপ সত্য হলে তা আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে প্রভাব ফেলতে পারে। তবে সেনা সরানোর পরিমাণ, উদ্দেশ্য ও গন্তব্য সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য ছাড়া এটিকে মার্কিন প্রত্যাহার বা উপসাগরীয় মিত্রদের পরিত্যাগের প্রমাণ হিসেবে দেখা যায় না।

উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা শুধু মার্কিন সেনা উপস্থিতির ওপর নির্ভরশীল নয়। তাদের নিজস্ব সামরিক সক্ষমতা, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, গোয়েন্দা সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক কূটনীতিও গুরুত্বপূর্ণ। তবু যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অবস্থানে বড় ধরনের পরিবর্তন হলে সৌদি আরবসহ সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা পুনর্মূল্যায়ন করতে হতে পারে।

চতুর্দশ শতাব্দীর আরব ইতিহাসবিদ ও চিন্তাবিদ ইবনে খালদুন তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ আল-মুকাদ্দিমা-তে রাজবংশের উত্থান, ক্ষমতার সংহতি, বিলাসিতা এবং ক্রমাগত দুর্বল হয়ে পড়ার একটি ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা তুলে ধরেন। তাঁর চিন্তায় শাসকগোষ্ঠীর সংহতি, সামাজিক সংহতি এবং রাষ্ট্রের রাজনৈতিক শক্তির বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ।

এই তত্ত্বের আলোকে সৌদি আরবের বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা হলেও ইতিহাসের কোনো তত্ত্ব দিয়ে একটি রাজবংশের ভবিষ্যৎ পতন নিশ্চিতভাবে ঘোষণা করা যায় না। বরং দেশটির অর্থনৈতিক রূপান্তর, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং বৈদেশিক সম্পর্কের চ্যালেঞ্জগুলো পৃথকভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের নেতৃত্বে নেওয়া তিনটি নীতিকে এ ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে—ইয়েমেন যুদ্ধ, ভিশন ২০৩০ অর্থনৈতিক কর্মসূচি এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা সহযোগিতার ওপর নির্ভরতা।

ইয়েমেন সংঘাতে সৌদি আরবের দীর্ঘদিনের সম্পৃক্ততা দেশটির নিরাপত্তা ও কূটনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে। হুতি আন্দোলনের সামরিক সক্ষমতা এবং লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব প্রণালীর আশপাশে তাদের কার্যক্রম আঞ্চলিক বাণিজ্য ও নৌপরিবহনের জন্যও উদ্বেগের কারণ। সংঘাতের স্থায়ী সমাধান না হলে সৌদি আরবের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থে চাপ অব্যাহত থাকতে পারে।

অন্যদিকে, ভিশন ২০৩০-এর মাধ্যমে সৌদি আরব তেলনির্ভরতা কমানো, পর্যটন ও বিনিয়োগ বাড়ানো এবং অর্থনীতিতে নতুন খাতের বিকাশ ঘটানোর লক্ষ্য নিয়েছে। এই কর্মসূচির অগ্রগতি বিচার করতে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, সরকারি ব্যয়, বেসরকারি খাতের সম্প্রসারণ এবং তেলবহির্ভূত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির তথ্য বিবেচনা করা প্রয়োজন। পরিকল্পনার সব লক্ষ্য ইতিমধ্যে অর্জিত হয়েছে—এমন দাবি যেমন যথার্থ নয়, তেমনি পুরো কর্মসূচিকে ব্যর্থ বলার ক্ষেত্রেও পর্যাপ্ত তথ্য দরকার।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সৌদি আরবের নিরাপত্তা সহযোগিতাও দেশটির কৌশলগত হিসাবের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে ওয়াশিংটনের নীতি পরিবর্তন, আঞ্চলিক সংঘাতের বিস্তার এবং বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সৌদি আরবের সম্পর্ক—সবকিছুই দেশটির প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রনীতিকে প্রভাবিত করতে পারে।

বিশ্লেষণটির সবচেয়ে বিতর্কিত অংশে বলা হয়েছে, লোহিত সাগরের বাব আল-মান্দেব প্রণালীর কাছে সৌদি নৌবাহিনী একটি নৌযানকে হুতিদের জাহাজ মনে করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। পরে সেটি ভারতের একটি বাণিজ্যিক নৌযান বলে শনাক্ত হয় এবং হুতি সদস্যরা ১৪ জন ভারতীয় নাবিককে উদ্ধার করেন বলে দাবি করা হয়েছে।

ঘটনাটি সত্য হলে তা সামুদ্রিক নিরাপত্তা, বেসামরিক নৌপরিবহন এবং সৌদি আরবের কূটনৈতিক সম্পর্কের জন্য গুরুতর বিষয় হতো। ভুল লক্ষ্যবস্তুতে হামলা আন্তর্জাতিক নৌপথে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যে উত্তেজনা বাড়াতে পারে।

তবে ঘটনার তারিখ, জাহাজের নাম, হামলার স্থান, নাবিকদের পরিচয় এবং উদ্ধার অভিযানের বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য তথ্য ছাড়া এই বিবরণকে নিশ্চিত ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করা যাচ্ছে না। বিশেষ করে সৌদি নৌবাহিনী ভারতীয় বাণিজ্যিক জাহাজ ধ্বংস করেছে এবং হুতিরা ১৪ জন ভারতীয় নাবিককে উদ্ধার করেছে—এমন দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ থাকা প্রয়োজন।

ভারত ও সৌদি আরবের সম্পর্কের ক্ষেত্রেও জ্বালানি বাণিজ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তবে ভারতের মোট জ্বালানি তেল আমদানির কত অংশ সৌদি আরব থেকে আসে, তা নির্দিষ্ট সময়ের আমদানি-পরিসংখ্যান দিয়ে যাচাই করতে হবে। কোনো সামুদ্রিক ঘটনার কারণে দুই দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে বলে দাবি করতে হলে ভারত ও সৌদি আরবের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য এবং কূটনৈতিক পদক্ষেপও পর্যালোচনা করা জরুরি।

মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি ইরান, যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব, ইসরায়েল এবং বিভিন্ন আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ডের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা, সীমান্তবর্তী সংঘাত, সামুদ্রিক বাণিজ্যপথে হুমকি এবং ভুল সামরিক সিদ্ধান্ত পরিস্থিতিকে দ্রুত জটিল করে তুলতে পারে।

বিশেষ করে বাব আল-মান্দেব প্রণালী ও লোহিত সাগর আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ পথ। এখানে বড় ধরনের সংঘাত ছড়িয়ে পড়লে জাহাজ চলাচল, পরিবহন ব্যয়, বীমা খরচ এবং বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় প্রভাব পড়তে পারে।

সব মিলিয়ে, মধ্যপ্রাচ্যের সংকটকে শুধু ক্ষেপণাস্ত্র হামলা বা সামরিক ঘাঁটির উপস্থিতি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। সামরিক সক্ষমতা, কূটনৈতিক সম্পর্ক, অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং ভুল হিসাবের ঝুঁকি—সবকিছু মিলিয়ে পরিস্থিতি মূল্যায়ন করতে হয়। তবে ইরানের কথিত নতুন সামরিক ডকট্রিন, মার্কিন সেনা সরানোর দাবি এবং ভারতীয় নৌযান ধ্বংসের ঘটনার মতো গুরুতর বিষয় নির্ভরযোগ্য সূত্রে নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত সেগুলোকে সম্ভাবনা বা অযাচাইকৃত দাবি হিসেবেই বিবেচনা করা উচিত।

মুয়াজ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

আন্তর্জাতিক এর সর্বশেষ খবর

আন্তর্জাতিক - এর সব খবর

উ
প
রে