×
ঢাকা, শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬

২০২৭ সালে প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে আসছে নতুন ৪ বই

২০২৬ অক্টোবর ২৪ ১১:৫৬:৩৬
২০২৭ সালে প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে আসছে নতুন ৪ বই

নিজস্ব প্রতিবেদক: জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) উদ্যোগে চতুর্থ শ্রেণির জন্য ‘খেলাধুলা’ ও ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি’ এবং ষষ্ঠ শ্রেণির জন্য ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ ও ‘আমার কারিগরি শিক্ষা’ বই চারটি প্রণয়ন করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, মুখস্থবিদ্যা ও পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষার বাইরে গিয়ে শিক্ষার্থীদের বাস্তব অভিজ্ঞতার মাধ্যমে শেখার সুযোগ তৈরি করাই এ উদ্যোগের লক্ষ্য।

প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন জানান, শিক্ষার্থীদের মধ্যে মানবিক মূল্যবোধ, সামাজিক শিষ্টাচার, পারিবারিক সংস্কৃতি ও সুনাগরিকের গুণাবলি গড়ে তোলার পাশাপাশি শিক্ষার মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে এনসিটিবির একটি দল নতুন বইগুলোর পাণ্ডুলিপি তৈরির কাজ করেছে। এ প্রক্রিয়ায় শিক্ষাবিদ ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নেওয়া হয়েছে।

২৫ অক্টোবর অনুমোদনের জন্য উঠছে নতুন বই

এনসিটিবি সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, নতুন চারটি বইয়ের পাণ্ডুলিপি প্রণয়ন ও যাচাইয়ের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। আগামী ২৫ অক্টোবর জাতীয় শিক্ষাক্রম সমন্বয় কমিটির (এনসিসি) সভায় বইগুলো চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে। অনুমোদন পাওয়া গেলে মুদ্রণের জন্য পাণ্ডুলিপি প্রেসে পাঠানো হবে।

এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ ফখরুল মাওলা জানান, বইগুলোর পাণ্ডুলিপি প্রণয়ন ও যাচাইয়ের কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। এনসিসির অনুমোদনের পর মুদ্রণ কার্যক্রম শুরু হবে।

এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) অধ্যাপক মোহাম্মাদ আবু নাসের টুকু আশা প্রকাশ করেছেন, আগামী ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে চারটি বইয়ের প্রায় দেড় কোটি কপি মুদ্রণ সম্পন্ন হবে। এর আগে গত ১২ জুলাই আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে চার মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের কর্মশালায় বইগুলোর রূপরেখা উপস্থাপন করা হয়। পরে বিশেষজ্ঞ ও শিক্ষাবিদদের সমন্বয়ে চূড়ান্ত পাণ্ডুলিপি তৈরি করা হয়।

চতুর্থ শ্রেণিতে ‘খেলাধুলা’: শারীরিক সক্ষমতা ও আত্মরক্ষার শিক্ষা

চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য তৈরি ‘খেলাধুলা’ বইটি ১৪টি অধ্যায়ে সাজানো হয়েছে। শিশুদের ছোটবেলা থেকেই সুস্থ জীবনধারা ও ক্রীড়াচর্চায় আগ্রহী করে তোলার উদ্দেশ্যে এতে বিভিন্ন খেলার নিয়মকানুন এবং শারীরিক সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

বইটিতে ফুটবল, ক্রিকেট, কাবাডি, ব্যাডমিন্টন, সাঁতার, অ্যাথলেটিকস ও দাবাসহ বিভিন্ন খেলার মৌলিক নিয়ম সহজভাবে তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি কারাতে, জুডো ও তায়কোয়ান্দোর মতো আত্মরক্ষামূলক কৌশল সম্পর্কেও শিক্ষার্থীরা ধারণা পাবে।

খেলাধুলার সময় কেটে যাওয়া, মচকানো, নাক দিয়ে রক্ত পড়া কিংবা হিট স্ট্রোকের মতো পরিস্থিতিতে কী করতে হবে, তা বাস্তবসম্মত ছবির মাধ্যমে বোঝানোর পরিকল্পনা রয়েছে। প্রাথমিক চিকিৎসাসামগ্রীর ব্যবহার, আঘাত প্রতিরোধ, পুষ্টি ও সামাজিক দক্ষতার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

বইটিতে ‘স্বপ্ন যখন আকাশ ছোঁয়া’ শিরোনামে একটি অনুপ্রেরণামূলক গল্প রাখা হয়েছে। প্রত্যন্ত এলাকার একটি বিদ্যালয়ে মেয়েদের ফুটবল দল গঠন এবং সামাজিক বাধা পেরিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে সাফল্য অর্জনের গল্পের মাধ্যমে খেলাধুলার সম্ভাবনা তুলে ধরা হয়েছে। এর মাধ্যমে ক্রীড়াচর্চা যে শারীরিক সুস্থতার পাশাপাশি পেশা ও আর্থসামাজিক উন্নয়নের সুযোগও তৈরি করতে পারে, তা বোঝানোর চেষ্টা করা হয়েছে।

‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি’ বইয়ে ঐতিহ্য ও মূল্যবোধ

চতুর্থ শ্রেণির আরেকটি নতুন বই ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি’ ১১টি অধ্যায়ে প্রণয়ন করা হয়েছে। এতে দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, ভাষা, পোশাক, শিল্পকলা, খাদ্যসংস্কৃতি, সামাজিক রীতিনীতি এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জীবনধারা তুলে ধরা হবে।

বইটিতে বাংলা বর্ণমালা চর্চা, বিদ্যালয়ের উৎসব, জাতীয় পতাকা উত্তোলন এবং পিঠা-পুলির মতো সাংস্কৃতিক আয়োজনের বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি পরিবারে যৌথ সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও গৃহস্থালির কাজে পারস্পরিক সহযোগিতার মতো বিষয়ও রাখা হয়েছে।

এ ছাড়া ‘নতুন কুঁড়ি’ প্রতিভা অন্বেষণমূলক আয়োজনের ইতিহাস, ১৯৭৬ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উদ্যোগ এবং এ আয়োজনের বিজয়ীদের দুর্লভ ছবি যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

ষষ্ঠ শ্রেণিতে ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’

ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ বইটি ছয়টি অধ্যায়ে সাজানো হয়েছে। পড়াশোনাকে ভীতিমুক্ত ও আনন্দদায়ক করে তোলার পাশাপাশি মুখস্থনির্ভরতার বাইরে গিয়ে অভিজ্ঞতা ও পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে শেখার ধারণা এতে তুলে ধরা হবে।

বইটির মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা নিজের স্বাস্থ্য, চারপাশের পরিবেশ, নিরাপত্তা, সৃজনশীলতা, পারস্পরিক সম্পর্ক ও দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে শেখার সুযোগ পাবে। সংশ্লিষ্টদের মতে, শেখা শুধু পরীক্ষার প্রস্তুতি বা মুখস্থ করার বিষয় নয়—বাস্তব জীবন থেকেও জ্ঞান অর্জন সম্ভব, এই ধারণা তৈরি করাই বইটির অন্যতম উদ্দেশ্য।

এ উদ্যোগের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের পাঠ্যভার কমানো এবং সহপাঠক্রমিক কার্যক্রমের মাধ্যমে শেখার অভিজ্ঞতা বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।

‘আমার কারিগরি শিক্ষা’ বইয়ে হাতে-কলমে শেখার গুরুত্ব

ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য ‘আমার কারিগরি শিক্ষা’ বইটি আটটি অধ্যায়ে প্রণয়ন করা হয়েছে। এর মূল লক্ষ্য শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে শেখার অভ্যাস তৈরি, সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা বাড়ানো এবং বাস্তব জীবনের কাজ সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা দেওয়া।

বইটিতে কারিগরি শিক্ষার পরিচিতি, চারপাশের প্রযুক্তি, নতুন বিশ্ব, ছোট উদ্যোগের সম্ভাবনা, সবুজ প্রযুক্তি ও টেকসই জীবনযাপনের মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। শিক্ষার্থীরা প্রযুক্তির সহায়ক ব্যবহার করে দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন সমস্যার সহজ সমাধান খুঁজতে শিখবে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, শিক্ষার্থীদের শুধু তাত্ত্বিক জ্ঞান অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে তারা বাস্তবে কী করতে পারে, সে বিষয়ে দক্ষ করে তোলাই বইটির প্রধান লক্ষ্য। নতুন চারটি বইয়ে শব্দকোষের মতো বিশেষ অংশও যুক্ত করা হয়েছে।

ভবিষ্যতে আরও শ্রেণিতে চালুর পরিকল্পনা

শিক্ষা উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন জানান, চতুর্থ শ্রেণি থেকে খেলাধুলা ও সংস্কৃতিবিষয়ক বই চালুর পরবর্তী সময়ে এগুলো প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। অন্যদিকে ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ এবং ‘আমার কারিগরি শিক্ষা’ ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত অন্তর্ভুক্ত করার লক্ষ্য রয়েছে।

এনসিটিবির সদস্য (শিক্ষাক্রম) অধ্যাপক ড. এ. কে. এম. শওকত আলী খান বলেন, নতুন বইগুলোর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা পুঁথিগত বিদ্যার বাইরে গিয়ে আনন্দময় পরিবেশে বাস্তবমুখী ও দক্ষতাভিত্তিক জ্ঞান অর্জনের সুযোগ পাবে।

তবে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে বইগুলোর ব্যবহার শুরুর আগে জাতীয় শিক্ষাক্রম সমন্বয় কমিটির চূড়ান্ত অনুমোদন প্রয়োজন। অনুমোদনের পর মুদ্রণ কার্যক্রম সম্পন্ন হলে নতুন বইগুলো শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

মুয়াজ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

জাতীয় এর সর্বশেষ খবর

জাতীয় - এর সব খবর

উ
প
রে