×
ঢাকা, বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬

নজরুলের ছাপাখানা থেকে হাদির স্মার্টফোন নিন্দুকদের হিসাব ভুল

২০২৬ অক্টোবর ২১ ১৮:৫৯:৪০
নজরুলের ছাপাখানা থেকে হাদির স্মার্টফোন নিন্দুকদের হিসাব ভুল

নিজস্ব প্রতিবেদক: সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে প্রতিবাদ প্রকাশের ভাষা, মাধ্যম ও কৌশল। একসময় সংবাদপত্র, কবিতা, গান, লিফলেট ও জনসভা ছিল রাজনৈতিক প্রতিবাদ এবং জনমত গঠনের গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। বর্তমানে সেই জায়গার বড় অংশ দখল করেছে স্মার্টফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভিডিও, রিলস ও ডিজিটাল কনটেন্ট। কাজী নজরুল ইসলামের ব্রিটিশবিরোধী বিদ্রোহী চেতনা এবং তরুণ রাজনৈতিক নেতা উসমান হাদির ডিজিটাল মাধ্যমে প্রভাব বিস্তারের বিষয়টি এই পরিবর্তন বোঝার একটি তুলনামূলক দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখা যেতে পারে।

নজরুলের সময়ে প্রতিবাদী বক্তব্য মানুষের কাছে পৌঁছাতে সংবাদপত্র প্রকাশ, লেখা ছাপানো, সভা আয়োজন কিংবা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ওপর নির্ভর করতে হতো। অন্যদিকে বর্তমান ডিজিটাল যুগে একটি বক্তব্যের ভিডিও মুহূর্তেই বহু মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। ফলে প্রতিবাদের মূল লক্ষ্য—মানুষকে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করা, প্রচলিত ব্যবস্থাকে প্রশ্ন করা এবং জনমত তৈরি করা—একই থাকলেও তা ছড়িয়ে দেওয়ার পদ্ধতিতে এসেছে বড় পরিবর্তন।

নজরুলের যুগে ছাপাখানা ছিল প্রতিবাদের শক্তিশালী মাধ্যম

ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে সংবাদপত্র, সাময়িকী, কবিতা, গান ও রাজনৈতিক পুস্তিকা জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত। কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর কবিতা, প্রবন্ধ, গান ও সম্পাদিত পত্রিকার মাধ্যমে ঔপনিবেশিক শাসন, শোষণ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কণ্ঠ তুলে ধরেছিলেন।

নজরুলের সাহিত্য ও সাংবাদিকতার ইতিহাসে ‘ধূমকেতু’ পত্রিকার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত এই পত্রিকায় ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে তীব্র বক্তব্য প্রকাশিত হয়েছিল। তাঁর লেখালেখির কারণে ঔপনিবেশিক সরকারের দমনমূলক পদক্ষেপের মুখেও পড়তে হয়েছিল তাঁকে। ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতাকে কেন্দ্র করে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা হয় এবং তাঁকে কারাবরণ করতে হয়।

সেই সময়ে একটি লেখা পাঠকের কাছে পৌঁছানোর জন্য ছাপাখানা, কাগজ, পরিবেশক ও পাঠকসমাজের ওপর নির্ভর করতে হতো। কোনো পত্রিকা বাজেয়াপ্ত করা বা প্রকাশনা বন্ধ করে দেওয়ার মাধ্যমে তার প্রচার সীমিত করার সুযোগও ছিল। কিন্তু সাহিত্য, গান ও কবিতার মাধ্যমে মানুষের মনে যে প্রতিবাদী চেতনা তৈরি হয়েছিল, তা কেবল প্রকাশনা বন্ধ করে পুরোপুরি থামানো সম্ভব ছিল না।

রেডিও-টেলিভিশনের যুগে তথ্যপ্রবাহের নিয়ন্ত্রণ

ছাপাখানার পাশাপাশি পরবর্তী সময়ে রেডিও ও টেলিভিশন গণযোগাযোগের প্রধান মাধ্যম হয়ে ওঠে। এসব মাধ্যমে খবর, রাজনৈতিক বক্তব্য ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান দ্রুত বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হয়। তবে সম্প্রচারের সুযোগ সাধারণত নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান, সম্পাদক, সম্প্রচারক ও নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের হাতে কেন্দ্রীভূত ছিল।

কোন বক্তব্য প্রচারিত হবে, কোন সংবাদ গুরুত্ব পাবে কিংবা কোন বিষয়টি সম্প্রচারের বাইরে থাকবে—এসব সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের নীতি, মালিকানা, সম্পাদকীয় অবস্থান এবং রাষ্ট্রীয় বিধিনিষেধ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত। ফলে সাধারণ মানুষের পক্ষে নিজস্ব বক্তব্য সরাসরি বৃহৎ জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে দেওয়া তুলনামূলকভাবে কঠিন ছিল।

এই বাস্তবতা ডিজিটাল যুগে অনেকটাই বদলে গেছে। এখন ব্যক্তিগত স্মার্টফোন দিয়েই ভিডিও ধারণ, সম্পাদনা ও প্রকাশ করা সম্ভব। প্রচলিত গণমাধ্যমের অনুমোদন ছাড়াই একজন ব্যক্তি নিজের বক্তব্য সরাসরি অনুসারী ও বৃহত্তর অনলাইন দর্শকের কাছে পৌঁছে দিতে পারেন।

স্মার্টফোন ও অ্যালগরিদমের নতুন বাস্তবতা

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম রাজনৈতিক যোগাযোগের ধরন পাল্টে দিয়েছে। ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটকসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে বক্তব্য, লাইভ ভিডিও, সংক্ষিপ্ত ক্লিপ, মিম ও রিলসের মাধ্যমে রাজনৈতিক বার্তা ছড়িয়ে পড়ে। কোনো বক্তব্যের একটি অংশ দর্শকের দৃষ্টি আকর্ষণ করলে সেটি দ্রুত শেয়ার হতে পারে এবং আরও বেশি মানুষের সামনে আসতে পারে।

এই প্রেক্ষাপটে উসমান হাদির মতো তরুণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের ডিজিটাল উপস্থিতি বিশ্লেষণের বিষয় হয়ে উঠেছে। তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্য ও জনসম্পৃক্ততা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কীভাবে প্রচারিত হচ্ছে, তা বুঝতে হলে কেবল বক্তব্যের বিষয়বস্তু নয়, বরং তা কীভাবে উপস্থাপিত হচ্ছে এবং কোন ধরনের দর্শকের কাছে পৌঁছাচ্ছে, সেটিও বিবেচনা করতে হবে।

ডিজিটাল মাধ্যমে একটি দীর্ঘ বক্তব্যকে ছোট ভিডিওতে রূপান্তর করা যায়। কোনো বাক্যকে গ্রাফিকসের মাধ্যমে তুলে ধরা যায়, আবার বক্তব্যের নির্দিষ্ট অংশ নিয়ে তৈরি হতে পারে ব্যঙ্গাত্মক মিম কিংবা প্রতিক্রিয়ামূলক ভিডিও। এভাবে মূল বক্তব্যের বিভিন্ন অংশ ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে নতুন দর্শকের কাছে পৌঁছায়।

এখানে অ্যালগরিদম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ব্যবহারকারীর আগ্রহ, দেখার সময়, প্রতিক্রিয়া, শেয়ার ও অন্যান্য সংকেতের ভিত্তিতে প্ল্যাটফর্মগুলো বিভিন্ন কনটেন্ট সুপারিশ করে। ফলে কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। তবে বেশি ভিউ বা শেয়ার হলেই কোনো বক্তব্যের রাজনৈতিক প্রভাব, গ্রহণযোগ্যতা কিংবা জনসমর্থনের প্রকৃত মাত্রা নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ করা যায় না।

নজরুল ও হাদি: মাধ্যম আলাদা, তুলনার জায়গা কোথায়?

কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও সংগীতস্রষ্টা। তাঁর বিদ্রোহী চেতনা প্রকাশ পেয়েছে সাহিত্য, গান, সাংবাদিকতা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে। অন্যদিকে উসমান হাদির রাজনৈতিক প্রভাবকে ডিজিটাল যোগাযোগের দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করতে হলে তাঁর বক্তব্য, জনসম্পৃক্ততা এবং অনলাইন উপস্থিতির ধরন বিবেচনা করতে হবে।

দুজনের কাজের ক্ষেত্র ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এক নয়। তাই তাঁদের সরাসরি সমতুল্য হিসেবে দেখার পরিবর্তে প্রতিবাদের ভাষা ও প্রচারমাধ্যমের পরিবর্তন বোঝার জন্য তুলনাটি ব্যবহার করা যেতে পারে। নজরুলের সময়ে মুদ্রিত লেখা ছিল গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগমাধ্যম; বর্তমানে স্মার্টফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম রাজনৈতিক বার্তা প্রচারের অন্যতম কার্যকর মাধ্যম।

নজরুলের সাহিত্যিক গুরুত্ব নির্ধারিত হয়েছে তাঁর সৃষ্টিকর্ম, ভাষা, চিন্তা, ঐতিহাসিক ভূমিকা ও দীর্ঘমেয়াদি সাংস্কৃতিক প্রভাবের ভিত্তিতে। একইভাবে সমসাময়িক কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের প্রভাব মূল্যায়ন করতে হলে তাঁর বক্তব্যের বিষয়বস্তু, কাজের ধারাবাহিকতা, জনসম্পৃক্ততা এবং সময়ের সঙ্গে সেই প্রভাব কতটা স্থায়ী হয়, তা বিবেচনা করা প্রয়োজন। কেবল জনপ্রিয়তা কিংবা ডিজিটাল পরিসংখ্যান দিয়ে এ ধরনের মূল্যায়ন সম্পূর্ণ হয় না।

কনটেন্টের গতি যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে ঝুঁকিও

ডিজিটাল যোগাযোগের বড় সুবিধা হলো দ্রুত প্রচার এবং সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণের সুযোগ। কিন্তু একই সঙ্গে ভুল তথ্য, সম্পাদিত ভিডিও, বিভ্রান্তিকর শিরোনাম ও প্রেক্ষাপটহীন বক্তব্য ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও রয়েছে। একটি বক্তব্যের ছোট অংশ ভাইরাল হলে অনেক সময় তার আগের ও পরের বক্তব্য বাদ পড়ে যায়। এতে বক্তার প্রকৃত বক্তব্য সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরি হতে পারে।

এ ছাড়া অ্যালগরিদমের মাধ্যমে কোনো বক্তব্য বেশি মানুষের কাছে পৌঁছালেও সেটি যে সব শ্রেণির মানুষের কাছে সমানভাবে পৌঁছেছে, এমন নয়। অনলাইন দর্শকের প্রতিক্রিয়া এবং বাস্তব জীবনের রাজনৈতিক আচরণের মধ্যে পার্থক্য থাকতে পারে। তাই ডিজিটাল প্রভাব বিশ্লেষণে ভিউ, লাইক ও শেয়ারের পাশাপাশি স্বাধীন তথ্য, বাস্তব জনসম্পৃক্ততা এবং বক্তব্যের প্রেক্ষাপট যাচাই করা জরুরি।

ডিজিটাল সেন্সরশিপ ও বক্তব্যের স্থায়িত্ব

একসময় প্রকাশনা বন্ধ, পত্রিকা বাজেয়াপ্ত বা লেখকের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার মাধ্যমে প্রতিবাদী বক্তব্যের প্রচার সীমিত করার চেষ্টা করা হতো। বর্তমানে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে কনটেন্ট সরিয়ে দেওয়া, অ্যাকাউন্ট স্থগিত করা কিংবা ইন্টারনেট সংযোগ সীমিত করার মতো পদক্ষেপ তথ্যপ্রবাহে প্রভাব ফেলতে পারে।

তবে ডিজিটাল কনটেন্ট একবার ছড়িয়ে পড়লে তার অনুলিপি, স্ক্রিনশট বা পুনঃপ্রকাশের কারণে পুরোপুরি মুছে ফেলা কঠিন হতে পারে। একই সঙ্গে অনলাইনে কোনো বক্তব্যের উপস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হওয়া মানেই তার সামাজিক প্রভাব অক্ষুণ্ন থাকবে, এমন নিশ্চয়তাও নেই। সময়ের সঙ্গে মানুষের আগ্রহ, রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং নতুন তথ্যের প্রভাবে জনমত পরিবর্তিত হতে পারে।

বিদ্রোহের ভাষা বদলায়, মাধ্যমও বদলায়

ছাপাখানা থেকে স্মার্টফোন—যোগাযোগের এই পরিবর্তন রাজনৈতিক প্রতিবাদ ও জনমত গঠনের পদ্ধতিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর সময়ের সংবাদপত্র, কবিতা, গান ও সাহিত্যকে ব্যবহার করে ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কণ্ঠ তুলে ধরেছিলেন। বর্তমান সময়ে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভিডিও ও ডিজিটাল কনটেন্টের মাধ্যমে নিজেদের বক্তব্য ছড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।

নজরুলের ঐতিহাসিক ভূমিকা এবং উসমান হাদির ডিজিটাল রাজনৈতিক উপস্থিতির তুলনা তাই মূলত দুটি ভিন্ন যুগে প্রতিবাদ প্রকাশের মাধ্যম ও কৌশলের পার্থক্য বোঝার একটি প্রয়াস। একদিকে রয়েছে মুদ্রিত শব্দের স্থায়িত্ব ও সাহিত্যিক শক্তি, অন্যদিকে রয়েছে ডিজিটাল যোগাযোগের গতি, বিস্তার এবং তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া।

শেষ পর্যন্ত কোনো প্রতিবাদী বক্তব্যের গুরুত্ব শুধু সেটি কত দ্রুত ছড়াল, কত মানুষ দেখল কিংবা কতবার শেয়ার হলো—তার ওপর নির্ভর করে না। বক্তব্যটি মানুষের চিন্তায় কী পরিবর্তন আনল, জনপরিসরে কী ধরনের আলোচনা তৈরি করল এবং সময়ের পরীক্ষায় কতটা প্রাসঙ্গিক থাকল, সেসব বিবেচনাই তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

মুয়াজ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

জাতীয় এর সর্বশেষ খবর

জাতীয় - এর সব খবর

উ
প
রে