×
ঢাকা, বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬

মাগুরায় যুবদল নেতার চাঞ্চল্যকর খুন রহস্য

২০২৬ অক্টোবর ২১ ১৮:২৮:১২
মাগুরায় যুবদল নেতার চাঞ্চল্যকর খুন রহস্য

নিজস্ব প্রতিবেদক: মাগুরা পৌরসভার কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল এলাকার রয়্যাল পরিবহনের টিকিট কাউন্টার থেকে উদ্ধারকৃত যুবদল নেতা শাকের হোসেনের (৩৯) নিথর দেহের ময়নাতদন্ত শেষে চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। আজ বুধবার দুপুরে হাসপাতাল ও পুলিশ প্রশাসনের দায়িত্বশীল সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে যে, তাঁর মাথার খুলি ভেদ করে ভেতরে একটি তাজা বুলেট আটকে ছিল। চিকিৎসকদের প্রাথমিক ধারণা অনুযায়ী, মূলত এই গুলির আঘাতেই তাঁর প্রাণহানি ঘটেছে।

এ বিষয়ে গণমাধ্যমকে বিস্তারিত জানিয়ে মাগুরার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার থান্দার খায়রুল হাসান উল্লেখ করেন যে, স্থানীয় ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে শাকিরের মরদেহের ময়নাতদন্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষায় চিকিৎসকেরা মাথার ভেতর বুলেট পাওয়ার কথা জানিয়েছেন। তবে পূর্ণাঙ্গ ময়নাতদন্তের অফিশিয়াল প্রতিবেদন হাতে আসার পরই মৃত্যুর আসল কারণ ও নেপথ্য রহস্য পুরোপুরি পরিষ্কার হবে বলে জানান এই পুলিশ কর্মকর্তা।

নিহত শাকের হোসেন শুধু রয়্যাল পরিবহনের কাউন্টার মাস্টারের দায়িত্বই পালন করতেন না, তিনি ছিলেন মাগুরা পৌর যুবদলের একজন জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি মাগুরা পৌরসভার পারনান্দুয়ালী ব্যাপারীপাড়া নিবাসী মৃত কুতুবউদ্দিনের সন্তান।

ঘটনার সূত্রপাত ঘটে বুধবার ভোরের দিকে, যখন পারনান্দুয়ালী বাস টার্মিনালে রয়্যাল পরিবহনের কাউন্টারের ভেতর তাঁকে সম্পূর্ণ অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায়। তাৎক্ষণিকভাবে পরিবারের লোকজন তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। পরিবারের সদস্যরা প্রথমে এটিকে স্বাভাবিক কোনো অসুস্থতাজনিত মৃত্যু বলে ধরে নিয়েছিলেন এবং দাফনের উদ্দেশ্যে মরদেহ বাড়িতে নিয়ে যান। কিন্তু পরবর্তীতে গোসল করানোর প্রস্তুতি নেওয়ার সময় শাকিরের মাথার পেছনের অংশে একটি আঘাতের ক্ষত দেখতে পেয়ে তাঁরা তৎক্ষণাৎ বিষয়টি থানায় অবহিত করেন। এরপর পুলিশের নির্দেশে মরদেহ পুনরায় হাসপাতালে ফিরিয়ে এনে ময়নাতদন্ত করা হয়।

আশপাশের সিসিটিভি ক্যামেরা পর্যালোচনা করে পুলিশ জানায়, টার্মিনালের মূল প্রবেশপথে জেলা পুলিশের একটি সিসি ক্যামেরা রয়েছে। ওই ক্যামেরার সংগৃহীত অডিওতে ঘটনার সময় পরপর দুটি গুলির আওয়াজ রেকর্ড হয়েছে। ওই একই সময়ে টার্মিনালের ভেতর কয়েকটি মোটরসাইকেল ও ইজিবাইকের যাতায়াত লক্ষ করা গেছে। তবে কাউন্টারের অবস্থান ক্যামেরার অ্যাঙ্গেলের আড়ালে থাকায় সরাসরি অপরাধীদের ছবি ধরা পড়েনি। ঘটনার সময় কাউন্টারের ভেতরে ঢাকাগামী দুজন যাত্রী উপস্থিত ছিলেন; পুলিশ তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ করে ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদঘাটনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রাথমিক ধারণা অনুযায়ী, কোনো একটি মোটরসাইকেলে চড়ে আসা দুই দুর্বৃত্ত অতর্কিত হামলা চালিয়ে শাকেরকে গুলি করে দ্রুত পালিয়ে যায়। তবে এই হত্যাকাণ্ডের সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য, হামলাকারীদের পরিচয় কিংবা ব্যবহৃত অস্ত্রের উৎস সম্পর্কে এখনো কোনো নিশ্চিত ক্লু পায়নি পুলিশ।

এদিকে খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে দুপুর নাগাদ মাগুরা-১ আসনের সংসদ সদস্য মনোয়ার হোসেন মাগুরা ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে ছুটে যান। সেখানে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ময়নাতদন্তের পর চিকিৎসকরা মাথার খুলির ভেতরে বুলেট পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। সকাল থেকেই প্রত্যক্ষদর্শীরা গুলির শব্দের কথা বলে আসছিলেন এবং আমরাও শুরু থেকে একে সুপরিকল্পিত টার্গেট কিলিং বলে দাবি করে আসছি। এখন বুলেটের সন্ধান মেলায় সেই বিষয়টি পুরোপুরি প্রমাণিত হলো।

এমপি আরও মন্তব্য করেন যে, এই ঠাণ্ডা মাথার হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে শক্তিশালী কোনো চক্র জড়িত থাকা অস্বাভাবিক নয়। অবিলম্বে অপরাধীদের খুঁজে বের করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে তিনি পুলিশ প্রশাসনের ওপর মহলকে জোরালো তাগিদ দেন। একই সঙ্গে চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের সময় খোয়া যাওয়া অবৈধ অস্ত্রগুলো উদ্ধারে কার্যকর অভিযান চালানোর দাবি জানান তিনি।

অন্যদিকে, দুপুরের দিকে মাগুরা-২ আসনের সংসদ সদস্য ও সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরীও নিহত শাকিরের মরদেহ দেখতে হাসপাতালে উপস্থিত হন। সকাল থেকেই হাসপাতাল চত্বর ও বাস টার্মিনাল এলাকায় বিপুলসংখ্যক বিএনপি নেতাকর্মী জড়ো হন। দুপুর ১২টার দিকে তাঁরা নির্মম এই হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবিতে টার্মিনাল এলাকায় একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করেন এবং কিছু সময় ঢাকা-খুলনা মহাসড়ক অবরোধ করে রাখেন।

দুপুরে নিহত শাকের হোসেনের নিজ বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। তাঁর স্ত্রী, ভাই ও অন্যান্য স্বজনদের আহাজারিতে চার্লি ভারী হয়ে উঠেছে। স্বামী হারিয়ে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন স্ত্রী শারমিন আক্তার রুমা। তাঁদের সংসারে দুটি ছোট্ট সন্তান রয়েছে, যাদের মধ্যে একজন পড়াশোনা করছে পঞ্চম শ্রেণীতে এবং অন্যজন নার্সারীতে।

কারও সঙ্গে কোনো বিরোধ ছিল কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে রুমা জানান, স্বামীর সঙ্গে কারও কোনো ধরনের শত্রুতা বা খারাপ সম্পর্ক থাকার কথা তাঁর জানা নেই। সবার সঙ্গেই তাঁর স্বামী অত্যন্ত মিশুক ও হাসিখুশিভাবে চলতেন।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে শারমিন আক্তার রুমা আকুতি জানিয়ে বলেন, ‘আমার সন্তানদের বাবাকে যারা কেড়ে নিয়েছে, তাদের খুঁজে বের করে আমার সামনে এনে দিন।’ স্বামীহীন এই পৃথিবীতে অবুঝ দুই সন্তানকে নিয়ে কীভাবে আগামী দিনগুলো পার করবেন এবং তাদের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ কীভাবে রক্ষা হবে—সেই গভীর দুশ্চিন্তায় এখন দিশেহারা হয়ে পড়েছেন তিনি।

আমিন/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

জাতীয় এর সর্বশেষ খবর

জাতীয় - এর সব খবর

উ
প
রে