×
ঢাকা, বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬

ছয় গ্রুপের পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারে সরকারের নতুন উদ্যোগ

২০২৬ অক্টোবর ২১ ০৬:৫৮:১১
ছয় গ্রুপের পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারে সরকারের নতুন উদ্যোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক: বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ও সম্পদ দেশে ফিরিয়ে আনতে ফৌজদারি তদন্তের পাশাপাশি দেওয়ানি আইনি পদক্ষেপ জোরদার করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রাথমিক পর্যায়ে ছয়টি বড় ঋণগ্রহীতা গ্রুপের বিদেশে থাকা সম্পদ শনাক্ত ও উদ্ধারে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান নিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংকগুলো। সম্পদ উদ্ধার না হলে পারিশ্রমিক না দেওয়ার ‘নো রিকভারি, নো ফি’ মডেল অনুসরণ করা হচ্ছে।

২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর দুর্নীতি, অর্থপাচার ও ব্যাংক খাতের অনিয়মের বিরুদ্ধে ১১টি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত মামলা ও অনুসন্ধানে যৌথ তদন্ত দল (জেআইটি) গঠন করা হয়। নতুন দুদক কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর অর্থ উদ্ধার কার্যক্রমে গতি এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। অপরাধের তদন্তের পাশাপাশি বিদেশে থাকা সম্পদ শনাক্ত, সংরক্ষণ ও ফেরত আনার উদ্যোগ চলছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের নেতৃত্বে গঠিত অ্যাসেট রিকভারি টাস্কফোর্স (এআরটিএফ) এই কার্যক্রম সমন্বয় করছে। বিএফআইইউ টাস্কফোর্সকে সাচিবিক সহায়তা দিচ্ছে। এতে দুদক, সিআইডি, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল এবং কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিরা রয়েছেন।

প্রাথমিক পর্যায়ে এস আলম, বেক্সিমকো, সাইফুজ্জামান চৌধুরী, সিকদার, নাসা ও ওরিয়ন গ্রুপকে দেওয়ানি কার্যক্রমের জন্য নির্বাচন করা হয়েছে। এসব গ্রুপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট খেলাপি ঋণের পরিমাণ আনুমানিক ১২ বিলিয়ন ডলার। দ্বিতীয় ধাপে আরও ৪২টি প্রতিষ্ঠানের বিদেশে থাকা সম্পদ উদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্ট ঋণের পরিমাণ প্রায় দুই বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশ ব্যাংকের সিআইবি তথ্য অনুযায়ী, ২০০ কোটি টাকার বেশি খেলাপি ঋণ রয়েছে—এমন প্রতিষ্ঠানগুলোকে এ পর্যায়ে চিহ্নিত করা হয়েছে।

ব্যাংকগুলো ছয়টি কনসোর্টিয়ামের মাধ্যমে সম্মিলিতভাবে কাজ করছে। আটটি ব্যাংক এসব কনসোর্টিয়ামের নেতৃত্ব দিচ্ছে। এই পর্যন্ত ১০টি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান আগ্রহ প্রকাশ করেছে এবং ব্যাংকগুলোর সঙ্গে কাজ শুরু করেছে। সম্পদ অনুসন্ধান ও আইনি কার্যক্রমে গ্র্যান্ট থর্নটন, বেকার ম্যাকেঞ্জি, পিডব্লিউসি, ডিএল পাইপার, ক্রোল, ইওয়াই ও ডেন্টনসের মতো প্রতিষ্ঠানের নাম রয়েছে। এ উদ্যোগে আটটি আন্তর্জাতিক আইনি ও পেশাদার পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের সহায়তাও নেওয়া হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৯ আগস্ট পর্যন্ত আদালতের আদেশে দেশে-বিদেশে প্রায় ৭৬ হাজার ৯৮৩ কোটি টাকা মূল্যের সম্পদ সংযুক্ত, জব্দ বা অবরুদ্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে দেশে স্থাবর সম্পদ ১০ হাজার ৭৬ কোটি ৬৯ লাখ টাকা এবং অস্থাবর সম্পদ ৪৭ হাজার ২৪৯ কোটি ২৪ লাখ টাকা। বিদেশে স্থাবর সম্পদ ১৫ হাজার ১২৪ কোটি ১ লাখ টাকা এবং অস্থাবর সম্পদ ৪ হাজার ৫৩৩ কোটি ৯৯ লাখ টাকা।

এসব সম্পদের মধ্যে জমি, বাড়ি, ফ্ল্যাট, ব্যাংক হিসাব, কোম্পানির শেয়ার, ব্যবসায়িক স্বার্থ, ট্রাস্ট ও বিনিয়োগ তহবিল রয়েছে। তবে সম্পদ জব্দ বা অবরুদ্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া মানেই অর্থ দেশে ফেরত এসেছে—এমন নয়। সম্পদের অবস্থান শনাক্ত, মালিকানা যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট দেশের আদালতে আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।

চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত সম্পদ পাচার ও সংশ্লিষ্ট অপরাধের অভিযোগে ১৪২টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ১৬টিতে অভিযোগপত্র দাখিল এবং ছয়টিতে আদালতের রায় হয়েছে। মামলাগুলোতে ৭৬২ জনের বেশি সাক্ষী অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিদেশে পালানো বা সম্পদ সরিয়ে নেওয়া ঠেকাতে ১৫৮ জনের ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। ১০ জনের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের রেড নোটিশ জারির জন্য আদালতের আদেশও নেওয়া হয়েছে।

বিদেশে সম্পদ শনাক্ত ও ফেরত আনতে ১৬টি বিচারব্যবস্থার কাছে ৩০টি পারস্পরিক আইনি সহায়তার অনুরোধ (এমএলএআর) পাঠানো হয়েছে। মালয়েশিয়া, হংকং ও চীনের সঙ্গে পারস্পরিক আইনি সহায়তা চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। সম্ভাব্য সম্পদ অনুসন্ধানের গন্তব্য হিসেবে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কানাডা, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, হংকং ও থাইল্যান্ডসহ ১২টি দেশকে বিবেচনায় রাখা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান জানান, আন্তর্জাতিক তদন্তকারী ও আইনি প্রতিষ্ঠানগুলো সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের তথ্যের ভিত্তিতে বিদেশে থাকা সম্পদের অবস্থান, ধরন ও মূল্য শনাক্ত করছে। সম্পদ শনাক্ত হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট দেশের আইন অনুযায়ী তা জব্দ বা অবরুদ্ধ করার ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পরে আদালতের নির্দেশে সম্পদ বিক্রি বা নিষ্পত্তির মাধ্যমে অর্থ দেশে ফেরত আনার আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।

দুদকের পরিচালক মোহাম্মদ নাজমুল হাসান জানিয়েছেন, যৌথ তদন্ত দলের কার্যক্রম তদারক করা হচ্ছে এবং কোনো মামলা বা অনুসন্ধান বন্ধ নেই। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বিদেশে পাচার হওয়া সম্পদ ফেরত আনা দীর্ঘমেয়াদি ও জটিল প্রক্রিয়া। সম্পদ শনাক্তকরণ, মালিকানা যাচাই এবং বিদেশি বিচারব্যবস্থার আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে কয়েক বছরও লেগে যেতে পারে।

মিজান/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর

উ
প
রে