×
ঢাকা, মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬

বারাকা পাওয়ারের মুনাফায় বড় উল্লম্ফন, ডিভিডেন্ডে কী সিদ্ধান্ত আসছে?

২০২৬ অক্টোবর ২১ ১৬:২০:০১
বারাকা পাওয়ারের মুনাফায় বড় উল্লম্ফন, ডিভিডেন্ডে কী সিদ্ধান্ত আসছে?

নিজস্ব প্রতিবেদক: শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী কোম্পানি বারাকা পাওয়ার লিমিটেডের (বারাকা পাওয়ার) ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসের আর্থিক ফলাফলে উল্লেখযোগ্য উন্নতি দেখা গেছে। প্রথম প্রান্তিকে শেয়ারপ্রতি আয় বাড়লেও দ্বিতীয় প্রান্তিকে লোকসানের মুখে পড়ে কোম্পানিটি। তবে তৃতীয় প্রান্তিকে শেয়ারপ্রতি আয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যাওয়ায় নয় মাসের সম্মিলিত হিসাবে মুনাফায় বড় প্রবৃদ্ধি হয়েছে।

২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত নয় মাসে কোম্পানিটির সমন্বিত শেয়ারপ্রতি আয় আগের অর্থবছরের একই সময়ের ২৯ পয়সা থেকে বেড়ে ৮৭ পয়সায় দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে শেয়ারপ্রতি আয় বেড়েছে ৫৮ পয়সা বা ২০০ শতাংশ। কোম্পানিটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে আয় বৃদ্ধি এই প্রবৃদ্ধির প্রধান কারণ। তবে মুনাফা বাড়লেও পরিচালন কার্যক্রম থেকে নিট নগদ প্রবাহ ইতিবাচক অবস্থায় নেই।

এমন পরিস্থিতিতে আগের অর্থবছরে কোনো ডিভিডেন্ড না দেওয়া কোম্পানিটি এবার ক্যাশ বা অন্য কোনো ধরনের ডিভিডেন্ড দেবে কি না, তা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।

কোম্পানিটির প্রকাশিত অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে সমন্বিত শেয়ারপ্রতি আয় হয়েছে ৮৭ পয়সা। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই আয় ছিল ২৯ পয়সা। অর্থাৎ শেয়ারপ্রতি আয় বেড়েছে প্রায় তিন গুণ। তবে এই প্রবৃদ্ধিকে শুধু মূল ব্যবসার বিক্রি বা পরিচালন আয় বৃদ্ধির ফল হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।

কোম্পানির ব্যাখ্যা অনুযায়ী, সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে অর্জিত আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়াই শেয়ারপ্রতি আয় বৃদ্ধির প্রধান কারণ। অন্যদিকে পরিচালন নগদ প্রবাহের অবনতি দেখাচ্ছে, হিসাব অনুযায়ী মুনাফা বাড়লেও নগদ অর্থের প্রবাহ একইভাবে উন্নত হয়নি।

প্রথম প্রান্তিকে আয় বাড়লেও নগদ প্রবাহে অবনতি

২০২৫ সালের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রথম প্রান্তিকে বারাকা পাওয়ারের সমন্বিত শেয়ারপ্রতি আয় হয়েছে ১৮ পয়সা। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই আয় ছিল ১২ পয়সা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে শেয়ারপ্রতি আয় বেড়েছে ৬ পয়সা বা ৫০ শতাংশ।

কোম্পানির ব্যাখ্যা অনুযায়ী, সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ায় প্রথম প্রান্তিকে শেয়ারপ্রতি আয় বৃদ্ধি পেয়েছে। অর্থাৎ কোম্পানিটির আর্থিক ফলাফলে সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর অবদান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এই আয় বৃদ্ধির ফলে প্রথম প্রান্তিকে মুনাফার চিত্র আগের বছরের তুলনায় উন্নত হয়েছে।

তবে একই সময়ে পরিচালন কার্যক্রম থেকে নিট নগদ প্রবাহের চিত্র ছিল বিপরীতমুখী। প্রথম প্রান্তিকে সমন্বিত শেয়ারপ্রতি নিট পরিচালন নগদ প্রবাহ ছিল ঋণাত্মক ১৬ পয়সা। আগের বছরের একই সময়ে এই সূচক ইতিবাচক ১ টাকা ৪৭ পয়সা ছিল। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে শেয়ারপ্রতি পরিচালন নগদ প্রবাহে অবনতি হয়েছে ১ টাকা ৬৩ পয়সা।

কোম্পানির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নিজস্ব কার্যক্রমে গ্রাহকদের কাছ থেকে অর্থ আদায় কমে যাওয়া এবং সহযোগী প্রতিষ্ঠানের সরবরাহকারীদের বেশি অর্থ পরিশোধের কারণে নগদ প্রবাহে এই অবনতি হয়েছে। ফলে প্রথম প্রান্তিকে আয় বাড়লেও নগদ অর্থের প্রবাহে চাপ তৈরি হয়।

এদিকে ২০২৫ সালের ৩০ জুন কোম্পানিটির সমন্বিত শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য ছিল ২২ টাকা ৬৩ পয়সা। প্রথম প্রান্তিক শেষে ৩০ সেপ্টেম্বর তা বেড়ে দাঁড়ায় ২২ টাকা ৮১ পয়সায়। অর্থাৎ তিন মাসে শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য বেড়েছে ১৮ পয়সা। এটি কোম্পানিটির আর্থিক অবস্থার একটি ইতিবাচক দিক হলেও নগদ প্রবাহের দুর্বলতা আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

দ্বিতীয় প্রান্তিকে কেন লোকসান হলো?

প্রথম প্রান্তিকে আয় বৃদ্ধির পরও দ্বিতীয় প্রান্তিকে বারাকা পাওয়ারের শেয়ারপ্রতি লোকসান হয়েছে। ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর সময়ে কোম্পানিটির সমন্বিত শেয়ারপ্রতি আয় ছিল ঋণাত্মক ৭ পয়সা। আগের অর্থবছরের একই সময়ে শেয়ারপ্রতি লোকসান ছিল ৯ পয়সা। অর্থাৎ লোকসান থাকলেও আগের বছরের তুলনায় তা ২ পয়সা কমেছে।

এখানে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, দ্বিতীয় প্রান্তিকে লোকসান হলেও কোম্পানিটির প্রথমার্ধের সম্মিলিত শেয়ারপ্রতি আয় ইতিবাচক ছিল। ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ছয় মাসে শেয়ারপ্রতি আয় হয়েছে ১১ পয়সা। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই আয় ছিল ৪ পয়সা। ফলে ছয় মাসের হিসাবে শেয়ারপ্রতি আয় বেড়েছে ৭ পয়সা বা ১৭৫ শতাংশ।

অর্থাৎ দ্বিতীয় প্রান্তিকে ঋণাত্মক আয় হলেও প্রথম প্রান্তিকে অর্জিত ১৮ পয়সা আয় সেই লোকসান সামলে ছয় মাসের সম্মিলিত হিসাবে ইতিবাচক ফলাফল ধরে রাখতে সহায়তা করেছে। প্রথম দুই প্রান্তিকের ফলাফল থেকে বোঝা যায়, কোম্পানিটির মুনাফা ধারাবাহিকভাবে একই গতিতে বাড়েনি; বরং এক প্রান্তিকে আয় বৃদ্ধি এবং পরবর্তী প্রান্তিকে লোকসানের কারণে আয়ে ওঠানামা ছিল।

কোম্পানির প্রকাশিত ব্যাখ্যায় দ্বিতীয় প্রান্তিকে লোকসানের জন্য নির্দিষ্ট কোনো একক কারণ উল্লেখ করা হয়নি। তবে সামগ্রিক আর্থিক প্রতিবেদনে সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে আয় বৃদ্ধির বিষয়টি শেয়ারপ্রতি আয় বাড়ার প্রধান কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। তাই দ্বিতীয় প্রান্তিকের লোকসানকে নির্দিষ্ট কোনো ব্যয়, বিদ্যুৎ উৎপাদন হ্রাস কিংবা জ্বালানি সংকটের ফল বলে নিশ্চিতভাবে উল্লেখ করার মতো তথ্য নেই।

দ্বিতীয় প্রান্তিকে পরিচালন নগদ প্রবাহের পরিস্থিতিও আরও দুর্বল হয়েছে। ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ছয় মাসে সমন্বিত শেয়ারপ্রতি নিট পরিচালন নগদ প্রবাহ ছিল ঋণাত্মক ৮৮ পয়সা। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই সূচক ইতিবাচক ২ টাকা ১৬ পয়সা ছিল। অর্থাৎ ছয় মাসের হিসাবে শেয়ারপ্রতি পরিচালন নগদ প্রবাহের অবনতি হয়েছে ৩ টাকা ৪ পয়সা।

কোম্পানির ব্যাখ্যা অনুযায়ী, গ্রাহকদের কাছ থেকে অর্থ আদায় কমে যাওয়া এবং সহযোগী প্রতিষ্ঠানের সরবরাহকারীদের বেশি অর্থ পরিশোধ করার কারণে নগদ প্রবাহে চাপ তৈরি হয়েছে। ফলে দ্বিতীয় প্রান্তিকে শুধু শেয়ারপ্রতি আয়েই দুর্বলতা ছিল না, নগদ অর্থের প্রবাহও আগের বছরের তুলনায় খারাপ হয়েছে।

এ সময় শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্যও কিছুটা কমে যায়। ২০২৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর ২২ টাকা ৮১ পয়সা থেকে ৩১ ডিসেম্বর তা নেমে দাঁড়ায় ২২ টাকা ৭৪ পয়সায়। অর্থাৎ দ্বিতীয় প্রান্তিকে শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য কমেছে ৭ পয়সা। তবে ২০২৫ সালের ৩০ জুনের তুলনায় ছয় মাস শেষে সম্পদমূল্য তখনো ১১ পয়সা বেশি ছিল।

তৃতীয় প্রান্তিকে মুনাফা বাড়ল যেভাবে

দ্বিতীয় প্রান্তিকে লোকসানের পর তৃতীয় প্রান্তিকে বারাকা পাওয়ারের আর্থিক ফলাফলে বড় পরিবর্তন দেখা যায়। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ সময়ে কোম্পানিটির সমন্বিত শেয়ারপ্রতি আয় হয়েছে ৭৬ পয়সা। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই আয় ছিল ২৬ পয়সা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে তৃতীয় প্রান্তিকে শেয়ারপ্রতি আয় বেড়েছে ৫০ পয়সা বা প্রায় ১৯২ দশমিক ৩১ শতাংশ।

প্রথম দুই প্রান্তিকের তুলনায় তৃতীয় প্রান্তিকের এই আয় বৃদ্ধিই নয় মাসের সম্মিলিত ফলাফলকে শক্তিশালী করেছে। কোম্পানির ব্যাখ্যা অনুযায়ী, সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ায় তৃতীয় প্রান্তিকেও শেয়ারপ্রতি আয় বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে কোম্পানিটি প্রকাশিত তথ্যে এমন কোনো নির্দিষ্ট নতুন প্রকল্প, ব্যবসায়িক চুক্তি বা পরিচালন সিদ্ধান্তের কথা জানায়নি, যার কারণে তৃতীয় প্রান্তিকে হঠাৎ মুনাফা বেড়েছে বলে নিশ্চিতভাবে বলা যায়।

তাই তৃতীয় প্রান্তিকের মুনাফা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ব্যাখ্যা হলো সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে আয় বৃদ্ধি। এই আয় বৃদ্ধির প্রকৃত উৎস, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক ফলাফল এবং ভবিষ্যতে একই প্রবণতা বজায় থাকবে কি না, তা আরও বিস্তারিত আর্থিক তথ্য ছাড়া নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।

তৃতীয় প্রান্তিকে মুনাফা বৃদ্ধির কারণে নয় মাসের সম্মিলিত শেয়ারপ্রতি আয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত আয় দাঁড়িয়েছে ৮৭ পয়সা, যেখানে আগের অর্থবছরের একই সময়ে তা ছিল ২৯ পয়সা। অর্থাৎ শেয়ারপ্রতি আয় বেড়েছে ৫৮ পয়সা বা ২০০ শতাংশ।

এই ফলাফল থেকে বোঝা যায়, দ্বিতীয় প্রান্তিকে লোকসানের কারণে তৈরি হওয়া দুর্বলতা তৃতীয় প্রান্তিকের ভালো আয় অনেকটাই কাটিয়ে উঠেছে। তবে একটি প্রান্তিকে বেশি আয় হওয়া মানেই পরবর্তী সময়েও একই হারে মুনাফা বাড়বে, এমন নিশ্চয়তা নেই। সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর আয়, কোম্পানির নিজস্ব পরিচালন ফলাফল এবং ব্যয় পরিস্থিতির ধারাবাহিকতা এখানে গুরুত্বপূর্ণ।

মুনাফা বাড়লেও পরিচালন নগদ প্রবাহ ঋণাত্মক

বারাকা পাওয়ারের আর্থিক প্রতিবেদনে সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো পরিচালন কার্যক্রম থেকে নিট নগদ প্রবাহের অবনতি। ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত নয় মাসে কোম্পানিটির সমন্বিত শেয়ারপ্রতি নিট পরিচালন নগদ প্রবাহ ছিল ঋণাত্মক ৪০ পয়সা। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই সূচক ইতিবাচক ৪ টাকা ৩৭ পয়সা ছিল।

অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে শেয়ারপ্রতি পরিচালন নগদ প্রবাহের অবনতি হয়েছে ৪ টাকা ৭৭ পয়সা। আগের বছরের ইতিবাচক নগদ প্রবাহ এবার ঋণাত্মক হয়ে যাওয়ায় কোম্পানির আয় বৃদ্ধির সঙ্গে নগদ অর্থের প্রবাহের পার্থক্য আরও স্পষ্ট হয়েছে।

কোম্পানির ব্যাখ্যা অনুযায়ী, সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর সরবরাহকারীদের বেশি অর্থ পরিশোধের কারণে নয় মাসের পরিচালন নগদ প্রবাহ কমেছে। প্রথম প্রান্তিকে গ্রাহকদের কাছ থেকে অর্থ আদায় কমে যাওয়া এবং সরবরাহকারীদের বেশি অর্থ পরিশোধের বিষয়টিও নগদ প্রবাহে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল।

এখানে মনে রাখতে হবে, শেয়ারপ্রতি আয় হিসাবভিত্তিক মুনাফার নির্দেশক, আর পরিচালন নগদ প্রবাহ দেখায় ব্যবসার কার্যক্রম থেকে নগদ অর্থের প্রকৃত প্রবাহ। কোম্পানি মুনাফা করলেও গ্রাহকদের কাছ থেকে অর্থ আদায় কম হলে কিংবা সরবরাহকারীদের বেশি অর্থ পরিশোধ করতে হলে নগদ অর্থের ঘাটতি তৈরি হতে পারে। এ কারণে ডিভিডেন্ড দেওয়ার সক্ষমতা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে শুধু শেয়ারপ্রতি আয় নয়, নগদ প্রবাহও গুরুত্বপূর্ণ।

বারাকা পাওয়ারের নয় মাসের শেয়ারপ্রতি আয় ৮৭ পয়সা হলেও একই সময়ে পরিচালন নগদ প্রবাহ ঋণাত্মক ৪০ পয়সা। ফলে মুনাফা বৃদ্ধির পুরো চিত্রকে নগদ অর্থের অবস্থার সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে হবে। বিশেষ করে বছর শেষে ডিভিডেন্ড ঘোষণার আগে কোম্পানির হাতে কতটা নগদ অর্থ রয়েছে এবং চলতি দায় মেটানোর সক্ষমতা কেমন, তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

নয় মাসে নিট সম্পদমূল্য বেড়েছে প্রায় ৩.৮৪ শতাংশ

আয়ের পাশাপাশি বারাকা পাওয়ারের শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্যেও উন্নতি হয়েছে। ২০২৫ সালের ৩০ জুন কোম্পানিটির সমন্বিত শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য ছিল ২২ টাকা ৬৩ পয়সা। ৩০ সেপ্টেম্বর তা বেড়ে ২২ টাকা ৮১ পয়সা হলেও ৩১ ডিসেম্বর নেমে দাঁড়ায় ২২ টাকা ৭৪ পয়সায়। পরে ২০২৬ সালের ৩১ মার্চ তা বেড়ে ২৩ টাকা ৫০ পয়সায় পৌঁছায়।

অর্থাৎ ২০২৫ সালের ৩০ জুনের তুলনায় ২০২৬ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত নয় মাসে শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য বেড়েছে ৮৭ পয়সা বা প্রায় ৩ দশমিক ৮৪ শতাংশ। দ্বিতীয় প্রান্তিকে সামান্য কমলেও তৃতীয় প্রান্তিক শেষে সম্পদমূল্য আগের অবস্থান ছাড়িয়ে গেছে।

নিট সম্পদমূল্য বৃদ্ধির অর্থ হলো হিসাব অনুযায়ী শেয়ারপ্রতি সম্পদের বিপরীতে দায় বাদ দেওয়ার পর অবশিষ্ট মূল্য বেড়েছে। এটি কোম্পানির আর্থিক অবস্থার ইতিবাচক দিক হলেও সম্পদমূল্য বৃদ্ধি সরাসরি নগদ অর্থের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করে না। তাই সম্পদমূল্য ও মুনাফার উন্নতির পাশাপাশি পরিচালন নগদ প্রবাহের দুর্বলতা বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

ঋণমান স্থিতিশীল, তবে ডিভিডেন্ডের নিশ্চয়তা নেই

ক্রেডিট রেটিং এজেন্সি অব বাংলাদেশ লিমিটেড বারাকা পাওয়ারকে দীর্ঘমেয়াদে ‘এএ৩’ এবং স্বল্পমেয়াদে ‘এসটি-২’ ঋণমান দিয়েছে। কোম্পানিটির ঋণমানের পূর্বাভাস স্থিতিশীল রাখা হয়েছে। ২০২৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন এবং রেটিং ঘোষণার তারিখ পর্যন্ত অন্যান্য প্রাসঙ্গিক পরিমাণগত ও গুণগত তথ্যের ভিত্তিতে এই মূল্যায়ন করা হয়েছে।

এই ঋণমান কোম্পানিটির ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা ও আর্থিক ঝুঁকি মূল্যায়নের ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক। তবে স্থিতিশীল ঋণমান থাকলেই কোম্পানি ডিভিডেন্ড দেবে বা আগের বছরের তুলনায় বেশি ডিভিডেন্ড দেবে, এমন নিশ্চয়তা পাওয়া যায় না। ডিভিডেন্ডের সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে পূর্ণ বছরের নিরীক্ষিত মুনাফা, নগদ অর্থের প্রাপ্যতা, আর্থিক দায় এবং ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক প্রয়োজনের ওপর।

এবার কি ডিভিডেন্ড দেবে বারাকা পাওয়ার?

বারাকা পাওয়ার ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জন্য কোনো ডিভিডেন্ড সুপারিশ করেনি। এবার ২০২৫-২৬ অর্থবছরের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন বিবেচনার জন্য কোম্পানিটির পরিচালনা পর্ষদের সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ২০২৬ সালের ২৮ অক্টোবর, বুধবার বিকেল ৫টা ৪৫ মিনিটে। ওই সভায় ২০২৬ সালের ৩০ জুন সমাপ্ত অর্থবছরের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনসহ অন্যান্য বিষয় বিবেচনা করা হবে। চলতি অর্থবছরের ডিভিডেন্ডের বিষয়ে এখনো কোনো সুপারিশ ঘোষণা করা হয়নি।

এবার ডিভিডেন্ড দেওয়ার পক্ষে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যুক্তি হলো শেয়ারপ্রতি আয় বৃদ্ধি। নয় মাসে শেয়ারপ্রতি আয় আগের বছরের ২৯ পয়সা থেকে বেড়ে ৮৭ পয়সায় পৌঁছেছে। তৃতীয় প্রান্তিকে শেয়ারপ্রতি আয় ২৬ পয়সা থেকে বেড়ে ৭৬ পয়সা হওয়ায় কোম্পানিটির সম্মিলিত মুনাফায় বড় উন্নতি হয়েছে। পাশাপাশি শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্যও বেড়েছে।

যদি অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে মুনাফার ধারা বজায় থাকে এবং পূর্ণ বছরের নিরীক্ষিত হিসাবে পর্যাপ্ত মুনাফা ও বিতরণযোগ্য অর্থ পাওয়া যায়, তাহলে আগের অর্থবছরে লভ্যাংশ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে এবার লভ্যাংশ দেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে কোম্পানি ক্যাশ ডিভিডেন্ড দেবে, নাকি অন্য কোনো ধরনের ডিভিডেন্ড বিবেচনা করবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।

অন্যদিকে, পরিচালন নগদ প্রবাহ ঋণাত্মক থাকায় ডিভিডেন্ড দেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা প্রয়োজন হতে পারে। গ্রাহকদের কাছ থেকে অর্থ আদায় কমে যাওয়া এবং সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর সরবরাহকারীদের বেশি অর্থ পরিশোধের কারণে নগদ অর্থের ওপর চাপ তৈরি হলে পরিচালনা পর্ষদ ভবিষ্যৎ পরিচালন ব্যয় ও আর্থিক দায় মেটানোর জন্য অর্থ সংরক্ষণ করতে পারে। সে ক্ষেত্রে মুনাফা বাড়লেও ডিভিডেন্ড না দেওয়ার সিদ্ধান্ত বহাল রাখা হতে পারে।

এ ছাড়া তৃতীয় প্রান্তিকে আয় বৃদ্ধির প্রধান কারণ সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে বেশি আয়। এই প্রবণতা ভবিষ্যতেও বজায় থাকবে কি না, তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসায়িক ফলাফল ও আর্থিক পরিস্থিতির ওপর। সহযোগী প্রতিষ্ঠান থেকে আয় কমে গেলে কিংবা কোম্পানির নিজস্ব কার্যক্রমে ব্যয় বেড়ে গেলে পূর্ণ বছরের মুনাফা প্রত্যাশার তুলনায় কম হতে পারে।

অন্যদিকে, গ্রাহকদের কাছ থেকে পাওনা আদায় বাড়লে এবং সরবরাহকারীদের অর্থ পরিশোধের পরও পর্যাপ্ত নগদ অর্থ অবশিষ্ট থাকলে লভ্যাংশ দেওয়ার সক্ষমতা শক্তিশালী হতে পারে। তাই চলতি বছরের ডিভিডেন্ড নির্ধারণে শুধু নয় মাসের শেয়ারপ্রতি আয় নয়, বছর শেষে পরিচালন নগদ প্রবাহের অবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

সামগ্রিকভাবে বারাকা পাওয়ারের আর্থিক প্রতিবেদনে মুনাফা ও নিট সম্পদমূল্য বৃদ্ধির ইতিবাচক চিত্র রয়েছে। প্রথম প্রান্তিকে আয় বৃদ্ধি, দ্বিতীয় প্রান্তিকে লোকসান এবং তৃতীয় প্রান্তিকে উল্লেখযোগ্য মুনাফা বৃদ্ধির ফলে নয় মাসের সম্মিলিত শেয়ারপ্রতি আয় আগের বছরের তুলনায় ২০০ শতাংশ বেড়েছে। তবে একই সময়ে পরিচালন নগদ প্রবাহ ইতিবাচক ৪ টাকা ৩৭ পয়সা থেকে ঋণাত্মক ৪০ পয়সায় নেমে এসেছে। এই বিপরীতমুখী পরিস্থিতিই ডিভিডেন্ড নিয়ে অনিশ্চয়তার প্রধান কারণ।

বিনিয়োগকারীদের জন্য তাই পূর্ণ বছরের নিরীক্ষিত মুনাফা, সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে আয়ের ধারাবাহিকতা, গ্রাহকদের কাছ থেকে অর্থ আদায় এবং পরিচালন নগদ প্রবাহের উন্নতি পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। এসব ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন হলে আগের বছরের ডিভিডেন্ড না দেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। বিপরীতে নগদ অর্থের ঘাটতি অব্যাহত থাকলে কোম্পানিটি এবারও ডিভিডেন্ড না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারে। আগামী ২৮ অক্টোবরের পরিচালনা পর্ষদের সভায় প্রকাশিত নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন ও ডিভিডেন্ডের

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর

উ
প
রে