×
ঢাকা, মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬

বৈদেশিক মুদ্রার লোকসান কমায় মুনাফায় বড় উল্লম্ফন, ডিভিডেন্ডে কী সিদ্ধান্ত আসছে?

২০২৬ অক্টোবর ২১ ১৫:০০:১০
বৈদেশিক মুদ্রার লোকসান কমায় মুনাফায় বড় উল্লম্ফন, ডিভিডেন্ডে কী সিদ্ধান্ত আসছে?

নিজস্ব প্রতিবেদক: শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত বারাকা পতেঙ্গা পাওয়ার লিমিটেডের (বিপিপিএল) আর্থিক প্রতিবেদনে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে উল্লেখযোগ্য উন্নতি দেখা গেছে। আগের অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে শেয়ারপ্রতি লোকসানে থাকা কোম্পানিটি এবার মুনাফায় ফিরেছে। পরবর্তী দুই প্রান্তিকেও শেয়ারপ্রতি আয় বৃদ্ধির ধারাবাহিকতা বজায় রয়েছে। ফলে ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত নয় মাসে কোম্পানিটির সমন্বিত শেয়ারপ্রতি আয় আগের অর্থবছরের একই সময়ের ৭৪ পয়সা থেকে বেড়ে ২ টাকা ৮৬ পয়সায় দাঁড়িয়েছে।

শতকরা হিসাবে আয় বেড়েছে প্রায় ২৮৬ দশমিক ৪৯ শতাংশ। একই সময়ে শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্যও প্রায় ৯ দশমিক ৪৫ শতাংশ বেড়েছে। তবে মুনাফা বৃদ্ধির বিপরীতে পরিচালন কার্যক্রম থেকে নিট নগদ প্রবাহের পরিস্থিতি দুর্বল হয়েছে। এমন অবস্থায় আগের অর্থবছরের ২ শতাংশ ক্যাশ ডিভিডেন্ডের তুলনায় এবার কোম্পানিটি বেশি ডিভিডেন্ড দেবে কি না, তা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।

কোম্পানিটির প্রকাশিত অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে সমন্বিত শেয়ারপ্রতি আয় হয়েছে ২ টাকা ৮৬ পয়সা। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই আয় ছিল ৭৪ পয়সা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে শেয়ারপ্রতি আয় বেড়েছে ২ টাকা ১২ পয়সা। আয় বৃদ্ধির প্রধান কারণ হিসেবে কোম্পানিটি সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর মুনাফা বৃদ্ধির কথা জানিয়েছে। আগের বছরের তুলনায় বৈদেশিক মুদ্রাজনিত লোকসান কমে আসা এবং অর্থায়ন ব্যয় হ্রাস পাওয়ায় সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক ফলাফলে উন্নতি হয়েছে। এর প্রভাব সমন্বিত মুনাফায় পড়েছে।

প্রথম প্রান্তিকে লোকসান কাটিয়ে মুনাফায় ফেরার কারণ

২০২৫ সালের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রথম প্রান্তিকে বারাকা পতেঙ্গা পাওয়ারের সমন্বিত শেয়ারপ্রতি আয় হয়েছে ৬৬ পয়সা। আগের অর্থবছরের একই সময়ে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি আয় ছিল ঋণাত্মক ১৩ পয়সা। অর্থাৎ আগের বছরের লোকসান থেকে মুনাফায় ফেরার পাশাপাশি শেয়ারপ্রতি আর্থিক ফলাফলে উন্নতি হয়েছে ৭৯ পয়সা।

কোম্পানির ব্যাখ্যা অনুযায়ী, প্রথম প্রান্তিকে মুনাফা বৃদ্ধির প্রধান কারণ ছিল সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর মুনাফা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়া। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় বৈদেশিক মুদ্রাজনিত লোকসান কমে আসায় এসব প্রতিষ্ঠানের আর্থিক প্রতিবেদন উন্নত হয়েছে। ফলে সমন্বিত হিসাবে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি আয় ঋণাত্মক অবস্থা থেকে ইতিবাচক পর্যায়ে ফিরে আসে।

বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারের পরিবর্তন কোনো প্রতিষ্ঠানের বৈদেশিক মুদ্রায় থাকা দায়, ঋণ বা লেনদেনের মূল্যায়নে প্রভাব ফেলতে পারে। এ ধরনের লেনদেন থেকে লোকসান কমে গেলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মুনাফায় ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। বারাকা পতেঙ্গা পাওয়ারের ক্ষেত্রেও কোম্পানির প্রকাশিত ব্যাখ্যা অনুযায়ী, বৈদেশিক মুদ্রাজনিত লোকসান হ্রাস সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর মুনাফা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

প্রথম প্রান্তিকে পরিচালন নগদ প্রবাহেও আগের বছরের তুলনায় উন্নতি দেখা যায়। ২০২৫ সালের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর সময়ে সমন্বিত শেয়ারপ্রতি নিট পরিচালন নগদ প্রবাহ ছিল ঋণাত্মক ৫২ পয়সা। আগের বছরের একই সময়ে তা ছিল ঋণাত্মক ১২ টাকা ১৪ পয়সা। অর্থাৎ শেয়ারপ্রতি নগদ প্রবাহের ঘাটতি কমেছে ১১ টাকা ৬২ পয়সা। কোম্পানির ব্যাখ্যা অনুযায়ী, আগের বছরের তুলনায় সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর সরবরাহকারীদের কম অর্থ পরিশোধ করায় এই উন্নতি হয়েছে।

তবে নগদ প্রবাহের ঘাটতি কমে আসার অর্থ এই নয় যে কোম্পানির পরিচালন কার্যক্রম থেকে নগদ অর্থের প্রবাহ পুরোপুরি ইতিবাচক হয়ে গেছে। প্রথম প্রান্তিকেও সূচকটি ঋণাত্মক ছিল। ফলে আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি নগদ অর্থের প্রকৃত অবস্থাও মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

এদিকে ২০২৫ সালের ৩০ জুন কোম্পানিটির সমন্বিত শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য ছিল ২৭ টাকা ৭২ পয়সা। প্রথম প্রান্তিক শেষে ৩০ সেপ্টেম্বর তা বেড়ে দাঁড়ায় ২৮ টাকা ৩৬ পয়সায়। অর্থাৎ তিন মাসে শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য বেড়েছে ৬৪ পয়সা। মুনাফা বৃদ্ধির সঙ্গে সম্পদমূল্যের এই অগ্রগতি কোম্পানিটির আর্থিক অবস্থার ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।

দ্বিতীয় প্রান্তিকেও মুনাফা বৃদ্ধির ধারাবাহিকতা

প্রথম প্রান্তিকে মুনাফায় ফেরার পর দ্বিতীয় প্রান্তিকেও বারাকা পতেঙ্গা পাওয়ারের শেয়ারপ্রতি আয় বেড়েছে। ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর সময়ে কোম্পানিটির সমন্বিত শেয়ারপ্রতি আয় হয়েছে ৭৭ পয়সা। আগের বছরের একই সময়ে এই আয় ছিল মাত্র ১ পয়সা। অর্থাৎ দ্বিতীয় প্রান্তিকে শেয়ারপ্রতি আয় বেড়েছে ৭৬ পয়সা। তুলনামূলক হিসাবে আগের বছরের ভিত্তি খুব কম হওয়ায় প্রবৃদ্ধির হার অনেক বেশি দেখালেও প্রকৃত পরিবর্তন বোঝার জন্য টাকার অঙ্কে আয় বৃদ্ধিও বিবেচনা করা জরুরি।

প্রথম দুই প্রান্তিক মিলিয়ে ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ছয় মাসে বারাকা পতেঙ্গা পাওয়ারের সমন্বিত শেয়ারপ্রতি আয় হয়েছে ১ টাকা ৪৩ পয়সা। আগের অর্থবছরের একই সময়ে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি আয় ছিল ঋণাত্মক ১২ পয়সা। অর্থাৎ ছয় মাসের হিসাবে শেয়ারপ্রতি আর্থিক ফলাফলে উন্নতি হয়েছে ১ টাকা ৫৫ পয়সা। আগের বছরের লোকসান থেকে বেরিয়ে এসে কোম্পানিটি চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধে ইতিবাচক মুনাফা অর্জন করেছে।

কোম্পানির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দ্বিতীয় প্রান্তিকেও সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর উন্নত আর্থিক ফলাফল, বৈদেশিক মুদ্রাজনিত লোকসান কমে আসা এবং অর্থায়ন ব্যয় হ্রাস মুনাফা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে। অর্থাৎ প্রথম প্রান্তিকে যে আর্থিক পরিবর্তনের কারণে কোম্পানি লোকসান কাটিয়ে মুনাফায় ফিরেছিল, পরবর্তী প্রান্তিকেও সেই অনুকূল পরিস্থিতির প্রভাব অব্যাহত ছিল।

দ্বিতীয় প্রান্তিক শেষে নগদ প্রবাহেও বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যায়। ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ছয় মাসে শেয়ারপ্রতি নিট পরিচালন নগদ প্রবাহ দাঁড়ায় ৪ টাকা ৮০ পয়সা। আগের অর্থবছরের একই সময়ে তা ছিল ঋণাত্মক ৭ টাকা ৯৫ পয়সা। অর্থাৎ ছয় মাসের হিসাবে শেয়ারপ্রতি নগদ প্রবাহের উন্নতি হয়েছে ১২ টাকা ৭৫ পয়সা। আগের বছরের তুলনায় সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর সরবরাহকারীদের কম অর্থ পরিশোধ করায় এই উন্নতি হয়েছে বলে কোম্পানি জানিয়েছে।

একই সময়ে শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য ২০২৫ সালের ৩০ জুনের ২৭ টাকা ৭২ পয়সা থেকে বেড়ে ৩১ ডিসেম্বর ২৮ টাকা ৯০ পয়সায় পৌঁছায়। অর্থাৎ প্রথম ছয় মাসে শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য বেড়েছে ১ টাকা ১৮ পয়সা। মুনাফা বৃদ্ধির পাশাপাশি সম্পদমূল্যের এই অগ্রগতি কোম্পানিটির আর্থিক ফলাফলের আরেকটি ইতিবাচক দিক।

তৃতীয় প্রান্তিকে মুনাফা আরও বেড়েছে

২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত তৃতীয় প্রান্তিকে বিপিপিএলের সমন্বিত শেয়ারপ্রতি আয় হয়েছে ১ টাকা ৪৩ পয়সা। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই আয় ছিল ৮৭ পয়সা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে তৃতীয় প্রান্তিকে শেয়ারপ্রতি আয় বেড়েছে ৫৬ পয়সা বা প্রায় ৬৪ দশমিক ৩৭ শতাংশ।

তৃতীয় প্রান্তিকের ফলাফল থেকে দেখা যায়, মুনাফা বৃদ্ধির প্রবণতা শুধু প্রথম ছয় মাসে সীমাবদ্ধ ছিল না। বরং অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকেও আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় শেয়ারপ্রতি আয় বেশি হয়েছে। কোম্পানির ব্যাখ্যা অনুযায়ী, সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর উন্নত আর্থিক ফলাফল, বৈদেশিক মুদ্রাজনিত লোকসান হ্রাস এবং অর্থায়ন ব্যয় কমে আসা সম্মিলিত মুনাফা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে।

তিন প্রান্তিকের ফলাফল একত্রে বিবেচনা করলে আয় বৃদ্ধির চিত্র আরও স্পষ্ট হয়। ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত নয় মাসে সমন্বিত শেয়ারপ্রতি আয় হয়েছে ২ টাকা ৮৬ পয়সা। আগের বছরের একই সময়ে তা ছিল ৭৪ পয়সা। অর্থাৎ শেয়ারপ্রতি আয় বেড়েছে ২ টাকা ১২ পয়সা বা প্রায় ২৮৬ দশমিক ৪৯ শতাংশ। আগের বছরের তুলনায় আয় প্রায় ৩ দশমিক ৮৬ গুণ হয়েছে।

এখানে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, প্রথম প্রান্তিকে লোকসান থেকে মুনাফায় ফেরা, দ্বিতীয় প্রান্তিকে মুনাফা ধরে রাখা এবং তৃতীয় প্রান্তিকে আগের বছরের তুলনায় আরও বেশি আয়—এই তিনটি পর্যায়ের সম্মিলিত ফলাফলেই নয় মাসের প্রবৃদ্ধি তৈরি হয়েছে। তবে এই আয় বৃদ্ধির প্রধান কারণ হিসেবে কোম্পানি কোনো নতুন ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত বা একক প্রকল্পের কথা উল্লেখ করেনি। বরং সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর মুনাফা বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রাজনিত লোকসান হ্রাস এবং অর্থায়ন ব্যয় কমে আসার বিষয়গুলোকে প্রধান কারণ হিসেবে তুলে ধরেছে।

মুনাফা বাড়লেও নগদ প্রবাহে কেন উদ্বেগ?

বারাকা পতেঙ্গা পাওয়ারের আর্থিক প্রতিবেদনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিপরীত চিত্রটি দেখা যায় পরিচালন কার্যক্রম থেকে নিট নগদ প্রবাহে। প্রথম ছয় মাসে নগদ প্রবাহে বড় উন্নতি হলেও নয় মাসের সম্মিলিত হিসাবে পরিস্থিতি আবার দুর্বল হয়েছে।

২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত নয় মাসে কোম্পানিটির সমন্বিত শেয়ারপ্রতি নিট পরিচালন নগদ প্রবাহ ছিল ঋণাত্মক ৮ টাকা ৬২ পয়সা। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই সূচক ছিল ঋণাত্মক ৫ টাকা ৪৮ পয়সা। অর্থাৎ শেয়ারপ্রতি নগদ প্রবাহের ঘাটতি বেড়েছে ৩ টাকা ১৪ পয়সা। শতকরা হিসাবে আগের বছরের ঘাটতির তুলনায় তা প্রায় ৫৭ দশমিক ৩০ শতাংশ বেশি।

কোম্পানির ব্যাখ্যা অনুযায়ী, নয় মাসে নগদ প্রবাহের অবনতির প্রধান কারণ হলো কোম্পানি ও এর সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে গ্রাহকদের অর্থপ্রাপ্তি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় কমে যাওয়া। অর্থাৎ প্রথমার্ধে সরবরাহকারীদের কম অর্থ পরিশোধের কারণে নগদ প্রবাহে যে সুবিধা দেখা গিয়েছিল, পরবর্তী সময়ে গ্রাহকদের কাছ থেকে অর্থ আদায় কমে যাওয়ায় সেই সুবিধা বজায় থাকেনি।

এই বিষয়টি ডিভিডেন্ড মূল্যায়নের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কোনো কোম্পানি হিসাব অনুযায়ী মুনাফা অর্জন করলেও গ্রাহকদের কাছ থেকে বিক্রির অর্থ সময়মতো আদায় করতে না পারলে নগদ অর্থের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। সে ক্ষেত্রে দৈনন্দিন পরিচালন ব্যয়, সরবরাহকারীদের পাওনা, ঋণের কিস্তি এবং ভবিষ্যৎ বিনিয়োগের প্রয়োজন মেটাতে বাড়তি অর্থের প্রয়োজন হতে পারে।

বারাকা পতেঙ্গা পাওয়ারের ক্ষেত্রে নয় মাসে শেয়ারপ্রতি আয় ২ টাকা ৮৬ পয়সায় পৌঁছালেও পরিচালন নগদ প্রবাহ ঋণাত্মক ৮ টাকা ৬২ পয়সা। এই দুই সূচকের পার্থক্য দেখায় যে মুনাফা বৃদ্ধি এবং নগদ অর্থের প্রাপ্যতা এক বিষয় নয়। তাই শুধু শেয়ারপ্রতি আয় বৃদ্ধির ভিত্তিতে কোম্পানিটির লভ্যাংশ বাড়বে বলে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।

সম্পদমূল্য বেড়েছে প্রায় ৯ শতাংশ

মুনাফা বৃদ্ধির সঙ্গে বিপিপিএলের নিট সম্পদমূল্যেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। ২০২৫ সালের ৩০ জুন কোম্পানিটির সমন্বিত শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য ছিল ২৭ টাকা ৭২ পয়সা। ২০২৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর তা বেড়ে ২৮ টাকা ৩৬ পয়সা এবং ৩১ ডিসেম্বর ২৮ টাকা ৯০ পয়সায় দাঁড়ায়। সর্বশেষ ২০২৬ সালের ৩১ মার্চ শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য বেড়ে হয়েছে ৩০ টাকা ৩৪ পয়সা।

অর্থাৎ ২০২৫ সালের ৩০ জুনের তুলনায় ২০২৬ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত নয় মাসে শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য বেড়েছে ২ টাকা ৬২ পয়সা বা প্রায় ৯ দশমিক ৪৫ শতাংশ। কোম্পানির ব্যাখ্যা অনুযায়ী, সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর উল্লেখযোগ্য মুনাফা বৃদ্ধির কারণে এই উন্নতি হয়েছে।

নিট সম্পদমূল্যের এই অগ্রগতি কোম্পানির আর্থিক অবস্থার ইতিবাচক দিক। তবে নিট সম্পদমূল্য বাড়া মানেই কোম্পানির হাতে একই পরিমাণ নগদ অর্থ রয়েছে, এমন নয়। সম্পদমূল্য হিসাব করা হয় কোম্পানির সম্পদ ও দায়ের পার্থক্যের ভিত্তিতে। তাই লভ্যাংশ দেওয়ার সক্ষমতা নির্ধারণে মুনাফা ও সম্পদমূল্যের পাশাপাশি নগদ প্রবাহ এবং বিতরণযোগ্য অর্থের পরিমাণও গুরুত্বপূর্ণ।

ঋণমান ও আর্থিক অবস্থার মূল্যায়ন

ক্রেডিট রেটিং এজেন্সি অব বাংলাদেশ লিমিটেড বারাকা পতেঙ্গা পাওয়ারকে দীর্ঘমেয়াদে ‘এএ২’ এবং স্বল্পমেয়াদে ‘এসটি-২’ ঋণমান দিয়েছে। কোম্পানিটির ঋণমানের পূর্বাভাস স্থিতিশীল রাখা হয়েছে। ২০২৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন এবং রেটিং ঘোষণার তারিখ পর্যন্ত অন্যান্য প্রাসঙ্গিক পরিমাণগত ও গুণগত তথ্যের ভিত্তিতে এই মূল্যায়ন করা হয়েছে।

ঋণমান কোম্পানির আর্থিক সক্ষমতা ও ঋণ পরিশোধের ঝুঁকি মূল্যায়নে একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক। তবে স্থিতিশীল পূর্বাভাস বা ভালো ঋণমান থাকার অর্থ এই নয় যে কোম্পানি অবশ্যই আগের বছরের চেয়ে বেশি লভ্যাংশ দেবে। লভ্যাংশ নির্ধারণের ক্ষেত্রে পরিচালনা পর্ষদকে মুনাফা, নগদ অর্থের প্রাপ্যতা, ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ এবং অন্যান্য আর্থিক দায় বিবেচনা করতে হয়।

এবার কি ২ শতাংশের বেশি ক্যাশ ডিভিডেন্ড দেবে বারাকা পতেঙ্গা পাওয়ার?

বিপিপিএল ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জন্য ২ শতাংশ ক্যাশ ডিভিডেন্ড সুপারিশ করেছিল। এবার ২০২৫-২৬ অর্থবছরের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন বিবেচনার জন্য কোম্পানিটির পরিচালনা পর্ষদের সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ২০২৬ সালের ২৮ অক্টোবর, বুধবার বিকেল ৩টা ৪৫ মিনিটে। ওই সভায় ২০২৬ সালের ৩০ জুন সমাপ্ত অর্থবছরের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনসহ অন্যান্য বিষয় বিবেচনা করা হবে। চলতি অর্থবছরের ডিভিডেন্ডের পরিমাণ এখনো ঘোষণা করা হয়নি।

এবার ডিভিডেন্ড বাড়ার পক্ষে সবচেয়ে শক্তিশালী যুক্তি হলো শেয়ারপ্রতি আয়ের উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি। নয় মাসে আয় ৭৪ পয়সা থেকে বেড়ে ২ টাকা ৮৬ পয়সায় পৌঁছেছে। প্রথম প্রান্তিকে লোকসান থেকে মুনাফায় ফেরা এবং পরবর্তী দুই প্রান্তিকে মুনাফার ধারাবাহিকতা বজায় থাকা কোম্পানির আয় সক্ষমতার উন্নতি নির্দেশ করে। একই সঙ্গে শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য প্রায় ৯ দশমিক ৪৫ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়াও ইতিবাচক।

যদি অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকেও মুনাফার ধারা অব্যাহত থাকে এবং পূর্ণ বছরের নিরীক্ষিত হিসাবে পর্যাপ্ত মুনাফা ও বিতরণযোগ্য অর্থ পাওয়া যায়, তাহলে আগের বছরের ২ শতাংশ ক্যাশ ডিভিডেন্ডের তুলনায় বেশি ডিভিডেন্ড দেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর মুনাফা বৃদ্ধির প্রবণতা বজায় থাকলে এবং বৈদেশিক মুদ্রাজনিত লোকসান ও অর্থায়ন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে থাকলে কোম্পানির পূর্ণ বছরের আর্থিক ফলাফল আরও শক্তিশালী হতে পারে।

অন্যদিকে, নগদ প্রবাহের দুর্বলতা ডিভিডেন্ড বাড়ানোর ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। নয় মাসে পরিচালন নগদ প্রবাহ ঋণাত্মক ৮ টাকা ৬২ পয়সায় নেমে যাওয়ায় বোঝা যায়, কোম্পানির আয় বৃদ্ধির সঙ্গে নগদ অর্থের প্রবাহ একইভাবে উন্নত হয়নি। গ্রাহকদের কাছ থেকে অর্থ আদায় কম থাকলে কোম্পানিকে নগদ অর্থ ব্যবস্থাপনায় সতর্ক থাকতে হতে পারে। সে ক্ষেত্রে ভবিষ্যৎ পরিচালন ব্যয় ও অন্যান্য আর্থিক প্রয়োজন মেটাতে মুনাফার একটি অংশ সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।

আরেকটি বিষয় হলো, চলতি অর্থবছরের নয় মাসের মুনাফা বৃদ্ধির বড় অংশ এসেছে সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক ফলাফল উন্নত হওয়া থেকে। এই প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা নির্ভর করবে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার, অর্থায়ন ব্যয় এবং সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসায়িক পরিস্থিতির ওপর। এসব অনুকূল পরিস্থিতি বজায় না থাকলে পূর্ণ বছরের মুনাফা প্রত্যাশার তুলনায় কম হতে পারে।

লভ্যাংশ নির্ধারণের সময় পরিচালনা পর্ষদকে তাই শুধু নয় মাসের শেয়ারপ্রতি আয় বিবেচনা করলেই চলবে না। পূর্ণ বছরের নিরীক্ষিত মুনাফা, নগদ অর্থের প্রকৃত প্রাপ্যতা, গ্রাহকদের কাছ থেকে পাওনা আদায়ের অগ্রগতি, সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক অবস্থা এবং ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক প্রয়োজনও বিবেচনায় নিতে হবে। এসব সূচকে উন্নতি হলে লভ্যাংশ বাড়ানোর পক্ষে যুক্তি শক্তিশালী হবে। বিপরীতে নগদ প্রবাহের ঘাটতি অব্যাহত থাকলে আয় বৃদ্ধি সত্ত্বেও ডিভিডেন্ড অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত আসতে পারে।

সামগ্রিকভাবে বিপিপিএলের আর্থিক প্রতিবেদনে মুনাফা ও নিট সম্পদমূল্য বৃদ্ধির ইতিবাচক চিত্র রয়েছে। প্রথম প্রান্তিকে লোকসান থেকে মুনাফায় ফেরা, দ্বিতীয় প্রান্তিকে আয় বৃদ্ধি এবং তৃতীয় প্রান্তিকেও আগের বছরের তুলনায় বেশি শেয়ারপ্রতি আয়—সব মিলিয়ে নয় মাসে কোম্পানিটির আর্থিক ফলাফল উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হয়েছে। তবে পরিচালন নগদ প্রবাহের অবনতি ডিভিডেন্ড বাড়ানোর ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।

বিনিয়োগকারীদের জন্য তাই শুধু শেয়ারপ্রতি আয়ের প্রবৃদ্ধি নয়, গ্রাহকদের কাছ থেকে অর্থ আদায়, পরিচালন নগদ প্রবাহ, পূর্ণ বছরের নিরীক্ষিত মুনাফা এবং কোম্পানির নগদ অর্থের অবস্থাও পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। এসব ক্ষেত্রে উন্নতি হলে আগের বছরের ২ শতাংশ ক্যাশ ডিভিডেন্ডের তুলনায় বেশি দেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। তবে এখনই ডিভিডেন্ড বাড়বে বলে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো পর্যাপ্ত তথ্য নেই। আগামী ২৮ অক্টোবরের পরিচালনা পর্ষদের সভায় প্রকাশিত নিরীক্ষিত আর্থিক ফলাফল এবং ডিভিডেন্ডের সুপারিশই বিনিয়োগকারীদের জন্য সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য নির্দেশনা দেবে।

এসএ খান/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর

উ
প
রে