×
ঢাকা, সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬

সংকট ও ঋণমানের চাপে বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন

২০২৬ অক্টোবর ১২ ১০:৩২:২৪
সংকট ও ঋণমানের চাপে বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন

নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ব্যাংক খাতের দুর্বলতা ও আন্তর্জাতিক ঋণমান নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে নতুন সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) কমেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে দেশে নতুন বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে ৭ কোটি ৭৪ লাখ ২০ হাজার ডলার। গত বছরের একই সময়ে এ বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ৮ কোটি ১৩ লাখ ডলার। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে নতুন বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে ৪ দশমিক ৭৭ শতাংশ।

এ নিয়ে টানা দুই প্রান্তিকে নতুন বিদেশি বিনিয়োগ কমল। এর আগে ২০২৬ সালের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় নতুন বিদেশি বিনিয়োগ কমেছিল ৭০ দশমিক ৩৪ শতাংশ। অর্থনীতিবিদদের মতে, দেশের আন্তর্জাতিক ঋণমান, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা ও খেলাপি ঋণের উচ্চ হার বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্তে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

নতুন বিনিয়োগ কমলেও বার্ষিক হিসাবে বেড়েছে নিট এফডিআই

নতুন বিদেশি বিনিয়োগ কমলেও ২০২৬ সালের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে মোট নিট বিদেশি বিনিয়োগ গত বছরের একই সময়ের তুলনায় বেড়েছে। নতুন মূলধন, মুনাফার পুনর্বিনিয়োগ এবং বিদেশি কোম্পানিগুলোর আন্তঃপ্রতিষ্ঠান ঋণ—এই তিনটি উৎস মিলিয়ে আলোচ্য প্রান্তিকে নিট বিদেশি বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে ৩৪ কোটি ৬৯ লাখ ৪০ হাজার ডলারে। গত বছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ৩০ কোটি ৭৬ লাখ ২০ হাজার ডলার। অর্থাৎ, এক বছরে নিট বিদেশি বিনিয়োগ বেড়েছে প্রায় ১২ শতাংশ।

তবে আগের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকের তুলনায় এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে নিট বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে ২২ শতাংশ। ফলে বার্ষিক হিসাবে বিনিয়োগ বাড়লেও প্রান্তিক হিসাবে বিনিয়োগের প্রবাহে দুর্বলতা দেখা যাচ্ছে।

বিদ্যমান বিদেশি কোম্পানির পুনর্বিনিয়োগেই বড় অবদান

বাংলাদেশে আগে থেকেই ব্যবসা পরিচালনা করা বিদেশি কোম্পানিগুলোর মুনাফার পুনর্বিনিয়োগ মোট বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে বড় ভূমিকা রেখেছে। এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে এ খাতে নিট বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে ২৬ কোটি ৯ লাখ ১০ হাজার ডলারে। গত বছরের একই সময়ে এ পরিমাণ ছিল ১৬ কোটি ৮২ লাখ ডলার।

আলোচ্য প্রান্তিকে বিদেশি কোম্পানিগুলোর মুনাফা পুনর্বিনিয়োগ বাবদ ৬৬ কোটি ৪৩ লাখ ৫০ হাজার ডলার দেশে এসেছে। বিপরীতে এ খাতে দেশ থেকে বেরিয়ে গেছে ৪০ কোটি ৩৪ লাখ ৫০ হাজার ডলার। ফলে নিট পুনর্বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৬ কোটি ৯ লাখ ডলার।

মুনাফার পুনর্বিনিয়োগ বলতে বাংলাদেশে কার্যক্রম পরিচালনাকারী বিদেশি কোম্পানিগুলোর অর্জিত মুনাফার যে অংশ দেশে রেখে আবার ব্যবসায় বিনিয়োগ করা হয়, তাকে বোঝায়। এ ধরনের বিনিয়োগ বাড়লে মোট এফডিআইয়ের পরিমাণ বাড়তে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে একই হারে নতুন বিদেশি বিনিয়োগকারী বা নতুন প্রকল্প দেশে আসছে।

আন্তঃপ্রতিষ্ঠান ঋণে বড় পতন

বিদেশি বিনিয়োগের আরেকটি উপাদান আন্তঃপ্রতিষ্ঠান ঋণেও উল্লেখযোগ্য পতন দেখা গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে এ খাতে নিট ঋণ এসেছে ৮৬ লাখ ১০ হাজার ডলার। আগের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে এর পরিমাণ ছিল ২ কোটি ৬১ লাখ ৩০ হাজার ডলার। অর্থাৎ, এক প্রান্তিকের ব্যবধানে নিট ঋণ কমেছে ৬৭ দশমিক ০৪ শতাংশ।

গত বছরের একই প্রান্তিকে এ খাতে নিট ঋণ এসেছিল ৫ কোটি ৮০ লাখ ৮০ হাজার ডলার। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে নিট আন্তঃপ্রতিষ্ঠান ঋণ কমেছে ৮৫ দশমিক ১৭ শতাংশ।

আলোচ্য সময়ে আন্তঃপ্রতিষ্ঠান ঋণ বাবদ ৩৩ কোটি ৩৮ লাখ ডলার দেশে এসেছে। বিপরীতে দেশ থেকে বেরিয়ে গেছে ৩২ কোটি ৫১ লাখ ৯০ হাজার ডলার। ফলে এ খাতে নিট বিনিয়োগে খুব সামান্য অর্থ যোগ হয়েছে।

ব্যাংক খাতের দুর্বলতা বিনিয়োগে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে

বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের দুর্বলতাকে অর্থনীতির অন্যতম ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে বিশ্বব্যাংক। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুনে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার দাঁড়িয়েছে ৩৩ দশমিক ২ শতাংশে। অন্যদিকে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ব্যাংক খাতের সামগ্রিক মূলধন পর্যাপ্ততার হার নেমে আসে ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬ শতাংশে, যেখানে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্ধারিত ন্যূনতম হার ১০ শতাংশ।

ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের উচ্চ হার, মূলধন ঘাটতি এবং আর্থিক খাতের অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি মূল্যায়নে প্রভাব ফেলতে পারে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এসব দুর্বলতা দূর করা না গেলে নতুন প্রকল্পে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা কঠিন হতে পারে।

আন্তর্জাতিক ঋণমান নিয়ে ভিন্ন মূল্যায়ন

রাজস্ব আদায়ে দুর্বলতা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ এবং ব্যাংক খাতের সংকট বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ঋণমান নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। তবে ২০২৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ঋণমান নির্ধারণকারী সংস্থার মূল্যায়নে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে।

গত সেপ্টেম্বরে মুডিস বাংলাদেশের ঋণমান ‘বি২’ অপরিবর্তিত রেখে ভবিষ্যৎ পরিস্থিতির পূর্বাভাস স্থিতিশীল করেছে। অন্যদিকে, এসঅ্যান্ডপি ও ফিচ বাংলাদেশের ঋণমান ‘বি+’ অপরিবর্তিত রাখলেও ভবিষ্যৎ পরিস্থিতির পূর্বাভাস নেতিবাচক করেছে।

কোনো দেশের ঋণমান বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে সেই দেশের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা ও সংশ্লিষ্ট ঝুঁকি মূল্যায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। তাই ঋণমানের পূর্বাভাস, ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নতুন বিদেশি বিনিয়োগের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে।

সব মিলিয়ে, বাংলাদেশে নতুন বিদেশি বিনিয়োগ কমলেও বিদ্যমান বিদেশি কোম্পানিগুলোর মুনাফার পুনর্বিনিয়োগের কারণে মোট নিট এফডিআই বার্ষিক হিসাবে বেড়েছে। তবে নতুন মূলধন প্রবাহের ধারাবাহিক দুর্বলতা বিনিয়োগ পরিবেশ, ব্যাংক খাতের সংস্কার এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার গুরুত্ব তুলে ধরছে।

মুয়াজ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

অর্থনীতি এর সর্বশেষ খবর

অর্থনীতি - এর সব খবর

উ
প
রে