×
ঢাকা, রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬

‘রাজুর স্ত্রী’ পরিচয়ে হোটেলে ওঠেন তাজমিন, বয়স দেখান ১৮

২০২৬ অক্টোবর ১১ ১৫:৫৪:৩৩
‘রাজুর স্ত্রী’ পরিচয়ে হোটেলে ওঠেন তাজমিন, বয়স দেখান ১৮

নিজস্ব প্রতিবেদক: কুমিল্লায় ধর্ষণের পর হত্যার শিকার স্কুলছাত্রী জান্নাতুল তাজমিনের (১৫) কক্সবাজার সফর ঘিরে নতুন নতুন তথ্য সামনে আসছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত ৬ অক্টোবর সন্ধ্যায় কক্সবাজারের কলাতলীতে কুটুমবাড়ি রোডের শেষ প্রান্তে অবস্থিত মেঘলা রিসোর্টে রিয়াজ উদ্দিন ওরফে রাজুর সঙ্গে উঠেছিলেন তিনি। হোটেলে নিজেকে রাজুর স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দেন তাজমিন। তবে রেজিস্টারে তার নাম লেখা হয় ‘তানজু আক্তার’ এবং বয়স উল্লেখ করা হয় ১৮ বছর। পরদিন ৭ অক্টোবর হোটেল ছেড়ে কুমিল্লার উদ্দেশে রওনা হন তিনি। কিন্তু বাড়ি ফেরার পথে সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক মো. সুমন মিয়ার হাতে ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হন এই স্কুলছাত্রী।

অনুসন্ধান এবং পরিবহণসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজারের একটি আবাসিক হোটেলে চাকরি করেন রিয়াজ উদ্দিন ওরফে রাজু। ফেসবুকে পরিচয়ের আগে ইনস্টাগ্রামেও তাজমিনের সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল বলে জানা গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিয়মিত বার্তা আদান-প্রদানের পাশাপাশি তারা একে অপরকে রিলস পাঠাতেন। তাজমিন কীভাবে কক্সবাজারে গেলেন, সেখানে কোথায় ছিলেন এবং বাড়ি ফেরার জন্য কীভাবে বাসের টিকিট সংগ্রহ করলেন—এসব বিষয়ে বিভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। তবে রাজুর সঙ্গে তাজমিনের পরিচয় ও কক্সবাজারে যাওয়ার ঘটনা এবং তার হত্যাকাণ্ডে কারও সংশ্লিষ্টতার বিষয় দুটি পৃথকভাবে তদন্তের বিষয়।

পুলিশ জানিয়েছে, এ হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক মো. সুমন মিয়া (৩৫)। তাকে গ্রেফতারের পর আদালতে হাজির করা হলে তিনি হত্যার দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন।

তথ্য অনুযায়ী, গত ৬ অক্টোবর সন্ধ্যায় তাজমিন ও রাজু কলাতলীর ওই আবাসিক হোটেলের ৩০২ নম্বর কক্ষে ওঠেন। পরদিন ৭ অক্টোবর বেলা ১১টার দিকে তারা হোটেল ছাড়েন। এরপর রাজু তাজমিনকে কুমিল্লাগামী একটি বাসে তুলে দেন বলে জানা গেছে। হোটেলের রেজিস্টার, সিসিটিভি ফুটেজ এবং রাজুর ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে কক্সবাজারে তাজমিনের অবস্থানের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে।

বাড়ি ফেরার পথে ৭ অক্টোবর সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক সুমনের হাতে ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হন তাজমিন। পরদিন সকালে কুমিল্লার লালমাই উপজেলার ভোরালজগপুর উত্তরপাড়া গ্রামের একটি ধানখেতের আইল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় দায়ের করা হত্যা মামলায় সুমনকে চট্টগ্রাম থেকে গ্রেফতার করা হয়। পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তাজমিনের ব্যবহৃত আইফোন উদ্ধার করা হয়েছে।

কক্সবাজারের কলাতলীতে কুটুমবাড়ি-সংলগ্ন সড়কের শেষ প্রান্তে অবস্থিত তিনতলা আবাসিক হোটেলটির রেজিস্টার অনুযায়ী, গত ৬ অক্টোবর সন্ধ্যা ৭টা ২৫ মিনিটে রিয়াজ উদ্দিন ওরফে রাজুর সঙ্গে ৩০২ নম্বর কক্ষ ভাড়া নেন তাজমিন। সেখানে তাকে রাজুর স্ত্রী হিসেবে দেখানো হয়। রেজিস্টারে তার নাম লেখা হয় ‘তানজু আক্তার’ এবং বয়স ১৮ বছর উল্লেখ করা হয়। একই নথিতে রিয়াজের পরিচয় হিসেবে বান্দরবানের লামা এলাকার মনির আহমদের ছেলের তথ্য লেখা রয়েছে।

হোটেলের এক কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, এক রাত অবস্থানের পর ৭ অক্টোবর বেলা ১১টার দিকে তাজমিন ও রাজু হোটেল ছেড়ে চলে যান। হোটেলের রেজিস্টারে রিয়াজের দুটি মুঠোফোন নম্বর ও একটি জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) নম্বর নথিভুক্ত রয়েছে। এর মধ্যে একটি নম্বর পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য দেওয়া হয়েছিল বলে জানা গেছে।

রাজুর এক সহকর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, তারা একই জায়গায় কাজ করেন। তাজমিন হত্যাকাণ্ডের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর রিয়াজ তার কাছে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন। একই সঙ্গে তাকে বাঁচানোর জন্য আকুতি জানান এবং হত্যাকাণ্ডে নিজের কোনো সম্পৃক্ততা নেই বলে দাবি করেন।

ওই সহকর্মীর ভাষ্য অনুযায়ী, ফেসবুকে পরিচয়ের প্রায় ১৭ দিন আগে তাজমিনের সঙ্গে রিয়াজের প্রথম যোগাযোগ ও ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। পরে তাজমিন কক্সবাজারে এসে ঘোরাফেরা করে আবার ফিরে যান। ঘটনার আগে রিয়াজ ‘আইকনিক এক্সপ্রেস’ বাসের টিকিট কেটে তাকে বাসে তুলে দেন। রিয়াজের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, টিকিটের দাম ছিল ৯০০ টাকা। ঘটনার পর থেকে রিয়াজ আপাতত হোটেলে অনুপস্থিত রয়েছেন এবং ছুটিতে আছেন বলে জানান ওই সহকর্মী।

তবে রিয়াজের ঘনিষ্ঠ আরেকটি সূত্রের দাবি, তাজমিনের সঙ্গে তার পরিচয় হয়েছিল প্রায় পাঁচ মাস আগে। এরপর থেকে তাদের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ ছিল।

কক্সবাজারের কক্সেস প্যানোরামিক ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুর এজেন্সির আবদুল্লাহ গণমাধ্যমকে জানান, ৬ অক্টোবর রাত ৮টার পর তাজমিন ও রাজু তাদের টিকিট কাউন্টারে যান। সেখানে রাজু পরদিন বুধবারের জন্য আইকনিক এক্সপ্রেসের একটি টিকিট বুক করেন। রাজুর বক্তব্য অনুযায়ী, বুধবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে তিনি তাজমিনকে বাসে তুলে দেন। বাসটি দুপুরের দিকে কক্সবাজার থেকে কুমিল্লার উদ্দেশে ছেড়ে যায়।

সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, ৭ অক্টোবর রাত পৌনে ১২টার দিকে কক্সবাজার থেকে আসা আইকনিক এক্সপ্রেসের বাস থেকে কুমিল্লার পদুয়ারবাজার বিশ্বরোডের হোটেল নূরজাহানের সামনে নামেন তাজমিন। এরপর শহরের রেসকোর্স এলাকার বাসায় যাওয়ার জন্য তিনি একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা ভাড়া করেন। কিন্তু সেই যাত্রায় আর বাড়ি ফেরা হয়নি তার।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, অটোরিকশাচালক সুমন তাজমিনকে নির্জন স্থানে নিয়ে ধর্ষণ করেন এবং পরে গলায় গামছা পেঁচিয়ে হত্যা করেন। ৮ অক্টোবর সকালে কুমিল্লার লালমাই উপজেলার জগতপুর গ্রামের একটি ধানখেত থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে চট্টগ্রাম থেকে সুমনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তাজমিনের ব্যবহৃত আইফোনটিও উদ্ধার করা হয়েছে।

পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় তাজমিন মাকে বলেছিলেন, তিনি এক বান্ধবীর বাসায় যাচ্ছেন। কিন্তু বান্ধবীর নাম কিংবা তার মা-বাবার পরিচয় জানতে চাওয়া হলে তিনি কিছু জানাননি। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রথমে তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় যান। পরে কুমিল্লায় ফিরে সেখান থেকে কক্সবাজারের উদ্দেশে রওনা হন।

তাজমিনের মা কেয়া খাতুন সাংবাদিকদের জানান, বৃহস্পতিবার বিকেলে মেয়ের সঙ্গে তার সর্বশেষ কথা হয়েছিল। সে সময় তাজমিন জানিয়েছিলেন, তিনি এক বান্ধবীর সঙ্গে আছেন। মা তাকে বান্ধবীর বাড়ি থেকে নিয়ে আসতে চাইলেও মেয়েটি কার সঙ্গে রয়েছে, সে বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য দিতে পারেননি।

পরিবারের সূত্রে আরও জানা গেছে, গত ৪ অক্টোবর এক বান্ধবীকে হাতঘড়ি দেওয়া নিয়ে মায়ের সঙ্গে তাজমিনের মনোমালিন্য হয়। এরপর বাড়ি ছেড়ে প্রথমে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এক বান্ধবীর কাছে যান তিনি। সেখান থেকে মুঠোফোনে রিয়াজের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি তাজমিনকে কক্সবাজারে যাওয়ার জন্য বিকাশের মাধ্যমে ৫০০ টাকা পাঠান বলে জানা গেছে।

রিয়াজের সহকর্মীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কুমিল্লায় ফেরার পথে অটোরিকশায় ওঠার পরও তাজমিনের সঙ্গে রিয়াজের মুঠোফোনে কথা হচ্ছিল। যাত্রাপথে অটোরিকশাচালকের বিস্তারিত তথ্যও তাজমিন তাকে জানিয়েছিলেন বলে ওই সহকর্মী দাবি করেন। তবে রাত দেড়টার দিকে তাজমিনের মুঠোফোনের লাইভ লোকেশন বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর তার সঙ্গে আর যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। পরদিন বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে তাজমিনের ধর্ষণ ও হত্যার খবর দেখে রিয়াজ স্তম্ভিত হয়ে পড়েন বলে জানান ওই সহকর্মী।

তিনি আরও জানান, রিয়াজ গত তিন বছর ধরে কক্সবাজারের একটি আবাসিক হোটেলে কাজ করছেন। ঘটনার পর থেকে তার মুঠোফোন বন্ধ থাকায় যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

লালমাই থানার ওসি মিজানুর রহমান জানান, তাজমিনের মুঠোফোনের কললিস্টসহ অন্যান্য বিষয় খতিয়ে দেখে তদন্ত চলছে। আসামি হত্যার কথা স্বীকার করেছেন। তদন্ত শেষ হলে ঘটনার বাকি বিষয়গুলো জানা যাবে বলে জানান তিনি।

তাজমিনের শিক্ষক সাদ বিন এরশাদ জানান, মেয়েটি ছিল অত্যন্ত চঞ্চল স্বভাবের। মা অসুস্থ থাকলে সে তার দুই যমজ ছোট ভাইয়ের দেখাশোনা করত। তার বাবা একটি ওষুধ কোম্পানিতে চাকরি করতেন; সকালে বাসা থেকে বের হয়ে রাতে ফিরতেন। তবে মেয়েকে তিনি খুব আদর করতেন। শিক্ষকের ভাষ্য অনুযায়ী, রাগ হলে তাজমিন কখনো কখনো হঠাৎ করে বাসা থেকে বেরিয়ে যেত।

সিরাজ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

জাতীয় এর সর্বশেষ খবর

জাতীয় - এর সব খবর

উ
প
রে