×
ঢাকা, শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬

ইনসাইডার ট্রেডিংয়ের জালে ফেঁসে যাচ্ছে তালিকাভুক্ত কয়েক কোম্পানি

২০২৬ অক্টোবর ১০ ০৭:৫৫:৫৭
ইনসাইডার ট্রেডিংয়ের জালে ফেঁসে যাচ্ছে তালিকাভুক্ত কয়েক কোম্পানি

নিজস্ব প্রতিবেদক: শেয়ারবাজারের স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনা, প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ এবং সাধারণ বিনোযোগকারীদের পুঁজির সুরক্ষা প্রদানে কঠোর অবস্থান নিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। এর অংশ হিসেবে খুলনা পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড (কেপিসিএল), ইউনাইটেড পাওয়ার জেনারেশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডসহ (ইউপিজিডিসিএল) আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার কেনাবেচায় সংঘটিত সম্ভাব্য ইনসাইডার ট্রেডিং ও বাজার কারসাজির অভিযোগ গভীরভাবে খতিয়ে দেখার নির্দেশ জারি করেছে কমিশন।

বিএসইসি থেকে গত ৭ অক্টোবর প্রকাশিত সংশোধিত নির্দেশে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, উক্ত লেনদেনগুলোতে ইউনাইটেড গ্রুপের চিফ অ্যাডভাইজার হাসান মাহমুদ রাজা এবং ইউনাইটেড এন্টারপ্রাইজ অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেডের (ইউইসিএল) চেয়ারম্যান মঈনউদ্দিন হাসান রশিদের কোনো পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিল কি না, তা গভীরভাবে পরীক্ষা করা হবে।

বিষয়টি সুষ্ঠুভাবে তদন্ত করতে বিএসইসির পরিচালক মোহাম্মদ শামসুর রহমানকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্য বিশিষ্ট একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিশনের প্রতিনিধি হিসেবে এই কমিটিতে যুক্ত হয়েছেন যুগ্ম পরিচালক জিয়াউর রহমান এবং সহকারী পরিচালক আলী আহসান। সংশোধিত বিজ্ঞপ্তি জারির দিন থেকে পরবর্তী ৬০ কার্যদিবসের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত সম্পন্ন করে কমিশনে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

নিয়ন্ত্রক সংস্থার মার্কেট ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্টের পরিদর্শন ও তদন্ত শাখা থেকে জারি করা এই আদেশে উল্লেখ করা হয় যে, শেয়ারবাজারের শৃঙ্খলা ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থরক্ষায় এই স্পর্শকাতর অনিয়মের অভিযোগটি বিস্তারিত অনুসন্ধান করা জরুরি বলে মনে করছে কমিশন।

অভিযোগকারী এম এম হাবিবুল্লাহ এবং নুরুজ্জামান জিন্নাহর পেশ করা আবেদনের প্র প্রেক্ষিতেই মূলত এই তদন্ত কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। অভিযোগকারীদের দাবি, অন্যের নামে খোলা বেনামি বিও ও ট্রেডিং অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে মূল মালিকানা আড়াল করা হয়েছে এবং এর মাধ্যমে অবৈধ ইনসাইডার ট্রেডিং ও শেয়ার দর কারসাজি সংঘটিত হয়েছে।

এই প্রক্রিয়ায় ইউনাইটেড পাওয়ার, তাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠান, মালিকানা সংশ্লিষ্ট সংস্থা, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী, সহযোগী ও নিকটাত্মীয়দের নামে থাকা প্রাসঙ্গিক সব ব্যাংক হিসাব, বিও ও ট্রেডিং অ্যাকাউন্টের বিস্তারিত তথ্য তদারক করবে তদন্ত দল। একই সাথে এসব হিসাবের পেছনে মূল নিয়ন্ত্রক বা পরিচালনাকারী কে ছিলেন এবং কারা মূলত সুবিধা ভোগ করেছেন, সেটিও উদ্ঘাটন করা হবে।

তদন্তকারী কর্মকর্তারা সংশ্লিষ্ট শেয়ার ক্রয়ে ব্যবহৃত অর্থের মূল উৎস ও ট্রানজেকশন প্রবাহ অনুসন্ধান করবেন। ইউইসিএল কিংবা তার কোনো অঙ্গ প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির পক্ষ থেকে কোনো সন্দেহজনক অর্থ লেনদেন হয়েছে কি না, তা বিশেষ নজরে থাকবে। পাশাপাশি শেয়ার লেনদেনের মাধ্যমে প্রাপ্ত ক্যাশ ডিভিডেন্ড এবং অন্যান্য আয়ের চূড়ান্ত সুবিধাভোগী কারা, তা নিশ্চিত করতে অর্থের উৎস ট্র্যাকিং করা হবে।

সন্দেহভাজন বিও অ্যাকাউন্টে রক্ষিত শেয়ারের প্রকৃত স্বত্বাধিকারী এবং কার্যনির্বাহী ক্ষমতা কার হাতে ছিল, তাও বিএসইসির গঠিত কমিটি নিবিড়ভাবে যাচাই করবে। কোনো জটিল ব্যাংকিং বা প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার মাধ্যমে আসল মালিকের পরিচয় ঢেকে রাখার চেষ্টা করা হয়েছিল কি না, সে বিষয়টিতেও আলোকপাত করা হবে।

একই সঙ্গে ইউনাইটেড পাওয়ার ও কেপিসিএলসহ অন্যান্য কোম্পানির শেয়ারে কৃত্রিম দরবৃদ্ধি, প্রতারণামূলক স্কিম বা সংঘবদ্ধ কারসাজি সংঘটিত হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখবে এই কমিটি। শেয়ারের সংবেদনশীল ও অপ্রকাশিত মূল্যসংবেদনশীল তথ্য (পিএসআই) ব্যবহার করে অসাধু লেনদেন করা হয়েছে কি না, তথ্য কার কাছে ছিল এবং কীভাবে তা আদান-প্রদান করা হয়েছে—তদন্তে সেই বিষয়গুলোও গুরুত্ব পাবে।

ইউনাইটেড গ্রুপের হাসান মাহমুদ রাজা ও মঈনউদ্দিন হাসান রশিদের পাশাপাশি অভিযোগকারী এম এম হাবিবুল্লাহ ও নুরুজ্জামান জিন্নাহসহ অন্য কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বেআইনি কোনো সম্পৃক্ততা ছিল কি না, তাও নিরূপণ করা হবে।

তদন্তের পরিধি কেবল অভিযুক্তদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; সংশ্লিষ্ট শেয়ার ব্রোকার হাউস, মার্চেন্ট ব্যাংক, বাণিজ্যিক ব্যাংক, সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিডিবিএল) এবং আর্থিক মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর তৎকালীন ভূমিকাও স্ক্যানারের আওতায় আসবে। হিসাব খোলা, শেয়ার ক্রয়ের আদেশ কার্যকর করা এবং লভ্যাংশ ও অর্থ স্থানান্তরে এসব প্রতিষ্ঠানের কোনো অবহেলা বা ইন্ধন ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে।

মূলত সিকিউরিটিজ আইন, ইনসাইডার ট্রেডিং নিষিদ্ধকরণ বিধিমালা, অননুমোদিত হিসাব পরিচালনা এবং সুবিধাজনক মালিকানা গোপন সংক্রান্ত আইন লঙ্ঘন হয়েছে কি না—তা চিহ্নিত করাই এই তদন্তের মূল লক্ষ্য।

বিএসইসির এমন কঠোর পদক্ষেপকে শেয়ারবাজারে সুশাসন ও সার্বিক সংস্কারের নিয়মিত প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে দেখছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করা সম্ভব হলে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হারানো আস্থা ফেরাতে তা ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

উল্লেখ্য, আদেশে আরও বলা হয়েছে, নির্ধারিত বিষয়াবলির বাইরে যদি এই অনিয়ম সম্পর্কিত অন্য কোনো চাঞ্চল্যকর তথ্য বা প্রমাণ তদন্ত চলাকালে প্রকাশ পায়, তবে তাও তদন্তের আওতাভুক্ত করার সুযোগ রাখা হয়েছে।

এসউদ্দিন/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর

উ
প
রে