×
ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর ২০২৬

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে যে চিত্র, সতর্ক সবাই

২০২৬ অক্টোবর ০৮ ১০:৪৮:৩৪
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে যে চিত্র, সতর্ক সবাই

নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশের অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকে দুর্বলতার চিত্র উঠে এসেছে বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে। কর্মসংস্থান কমে যাওয়া, দারিদ্র্য বৃদ্ধি, বিনিয়োগ ও রপ্তানিতে ধীরগতি, বিদ্যুৎ-জ্বালানি সংকট, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা এবং রাজস্ব আদায়ে ঘাটতিসহ নানা বিষয় নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সংস্থাটি। প্রতিবেদন প্রকাশের পর দেশের অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৩ দশমিক ৪ শতাংশে। একই অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি আরও কমে ২ দশমিক ২ শতাংশে দাঁড়ায়। ২০২২-২৩ অর্থবছরে এই প্রবৃদ্ধি ছিল ৫ দশমিক ৮ শতাংশ। করোনা মহামারির পর কোনো প্রান্তিকে এটিই সর্বনিম্ন প্রবৃদ্ধি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণে প্রবৃদ্ধি কমার অন্যতম কারণ হিসেবে বিনিয়োগের সংকোচনকে চিহ্নিত করা হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বেসরকারি বিনিয়োগ ০ দশমিক ৫ শতাংশ এবং সরকারি বিনিয়োগ ০ দশমিক ৭ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে পণ্য ও সেবার প্রকৃত রপ্তানি কমেছে ৪ দশমিক ৮ শতাংশ।

শিল্প খাতেও দুর্বলতার চিত্র উঠে এসেছে। গত অর্থবছরে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ২ শতাংশ। তবে অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে শিল্প উৎপাদন ০ দশমিক ৩ শতাংশ কমেছে। করোনা মহামারির পর কোনো প্রান্তিকে শিল্প খাতে এমন সংকোচন প্রথমবারের মতো দেখা গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট শিল্প উৎপাদনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক কারখানা তাদের সক্ষমতার তুলনায় কম উৎপাদন করেছে। কোথাও কর্মঘণ্টা কমানো হয়েছে, আবার কোথাও উৎপাদন বন্ধ রাখা বা কর্মী ছাঁটাইয়ের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

গ্যাসের ক্ষেত্রেও আমদানিনির্ভরতা বেড়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের মোট গ্যাসের চাহিদার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আমদানির মাধ্যমে পূরণ করতে হচ্ছে। কয়েকটি বড় গ্যাসক্ষেত্র ও মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের ওপর বেশি নির্ভরতার কারণে কোনো একটি স্থাপনায় সমস্যা দেখা দিলে সরবরাহ ব্যবস্থায় তার প্রভাব পড়ছে।

বাড়ছে দারিদ্র্য, কমছে কর্মসংস্থান

অর্থনীতির দুর্বলতার প্রভাব পড়েছে মানুষের জীবনযাত্রায়ও। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, দেশে দারিদ্র্যের হার টানা চতুর্থ বছরের মতো বেড়েছে। ২০২২ সালে দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা আনুমানিক ২২ দশমিক ৫ শতাংশে উঠেছে। অর্থাৎ এক বছরে প্রায় ২১ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

মূল্যস্ফীতিও এখনো অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ১০ শতাংশ। পরবর্তী অর্থবছরে তা কমে ৮ দশমিক ৭ শতাংশে দাঁড়ালেও সাধারণ মানুষের ওপর মূল্যস্ফীতির চাপ পুরোপুরি কমেনি। গত আগস্টে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩ শতাংশ।

ব্যাংক খাতেও বাড়ছে ঝুঁকি

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের দুর্বলতাকে অর্থনীতির অন্যতম গুরুতর ঝুঁকি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের হার ছিল ২০ দশমিক ২ শতাংশ। ২০২৬ সালের জুনে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৩ দশমিক ২ শতাংশে।

ইসলামী ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের হার ৫৮ দশমিক ৯ শতাংশ এবং রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে ৪৩ দশমিক ২ শতাংশে পৌঁছেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সময়ে ব্যাংকগুলোর সামগ্রিক মূলধন ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬ শতাংশে নেমে এসেছে, যেখানে ন্যূনতম নিয়ন্ত্রক হার ১০ শতাংশ থাকার কথা।

বেসরকারি খাতেও ঋণপ্রবাহে বড় ধরনের ধীরগতি দেখা যাচ্ছে। জুনে ব্যক্তি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ঋণ প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে এসেছে, যা ৩৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। বিপরীতে সরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩০ দশমিক ৪ শতাংশ।

কমেছে বিদেশি বিনিয়োগ

উচ্চ সুদের হার ও জ্বালানি সংকটের কারণে বেসরকারি বিনিয়োগ টানা দ্বিতীয় বছরের মতো সংকুচিত হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) ১৫ শতাংশ কমে ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। নতুন ইকুইটি বিনিয়োগের পরিমাণ কমেছে ৭০ দশমিক ৩ শতাংশ।

রাজস্ব আদায়েও কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের রাজস্ব আদায় ছিল জিডিপির মাত্র ৮ দশমিক ৩ শতাংশ। এর ফলে বাজেট ঘাটতি বেড়ে জিডিপির ৩ দশমিক ৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এতে সরকারের উন্নয়ন ব্যয় পরিচালনাও কঠিন হয়ে পড়েছে বলে বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ব্যবসাবান্ধব নীতির দাবি

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন নিয়ে ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদদের অনেকে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে দ্রুত সংস্কার এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরির ওপর জোর দিয়েছেন।

এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক ও বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি ফজলুল হক মনে করেন, বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনের সামগ্রিক চিত্রের সঙ্গে খুব বেশি দ্বিমত করার সুযোগ নেই। তার মতে, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং নীতি-কৌশলের সংস্কার প্রয়োজন।

এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদও অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক হিসেবে উল্লেখ করে ব্যবসার খরচ কমানো, প্রশাসনিক সংস্কার এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।

অন্যদিকে, আমেরিকান চেম্বার অব কমার্সের (অ্যামচেম) সাবেক সভাপতি সৈয়দ এরশাদ আহমেদ বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নের জন্য আইনশৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার পাশাপাশি অবকাঠামো, বিদ্যুৎ-জ্বালানি সরবরাহ এবং বন্দর ব্যবস্থার উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।

রেমিট্যান্সে এখনো আশার আলো

অর্থনীতির বেশির ভাগ সূচকে দুর্বলতা থাকলেও প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্সকে ইতিবাচক দিক হিসেবে দেখেছে বিশ্বব্যাংক। গত অর্থবছরে দেশে রেকর্ড ৩৫ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। এটি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধু রেমিট্যান্স বাড়লেই অর্থনীতির সামগ্রিক সংকট কাটবে না। এই অর্থের একটি অংশ যাতে উৎপাদনশীল বিনিয়োগে ব্যবহৃত হয়, সে বিষয়েও নজর দেওয়া প্রয়োজন।

সব মিলিয়ে বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অর্থনীতির বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সূচকে দুর্বলতার চিত্র উঠে এসেছে। ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদদের মতে, এখন বিনিয়োগ বাড়ানো, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ব্যাংক খাতের সংস্কার, জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং ব্যবসায়ীদের আস্থা ফেরানোর দিকে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

মুয়াজ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

অর্থনীতি এর সর্বশেষ খবর

অর্থনীতি - এর সব খবর

উ
প
রে