×
ঢাকা, সোমবার, ৫ অক্টোবর ২০২৬

ব্যাংকিং খাতে উদ্বৃত্ত তারল্য ৪ লাখ কোটি টাকা অতিক্রম, তবুও কাটেনি সংকট

২০২৬ অক্টোবর ০৫ ১৮:১৮:২১
ব্যাংকিং খাতে উদ্বৃত্ত তারল্য ৪ লাখ কোটি টাকা অতিক্রম, তবুও কাটেনি সংকট

নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের ব্যাংক খাতে অলস বা উদ্বৃত্ত তারল্যের পরিমাণ আগের বছরের চেয়ে ৪৫ শতাংশ বেড়ে ৪ লাখ কোটি টাকার ঘর অতিক্রম করেছে। তবে এই বিপুল পরিমাণের সিংহভাগ অর্থই বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বা ঋণ হিসেবে না গিয়ে পড়ে রয়েছে সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে।

অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চতুর্থ বৈঠকে উপস্থাপিত বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৪ আসনের সংসদ সদস্য মুশফিকুর রহমানের সভাপতিত্বে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

ব্যাংক খাতের দ্বিধাবিভক্ত চিত্র

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের আর্থিক খাত বর্তমানে এক বিপরীতমুখী বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ভালো অবস্থায় থাকা প্রথাগত (কনভেনশনাল) ব্যাংকগুলোতে উদ্বৃত্ত তারল্যের পাহাড় জমলেও শরীয়াহভিত্তিক ইসলামি ব্যাংকসহ বেশ কয়েকটি দুর্বল ব্যাংক তীব্র তারল্য সংকটে ভুগছে।

গত বছরের আগস্টে যেখানে ব্যাংক খাতের মোট তরল সম্পদ (নগদ টাকা ও সরকারি সিকিউরিটিজ) ছিল ৩.১ লাখ কোটি টাকা, চলতি বছরের আগস্ট শেষে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪.৫ লাখ কোটি টাকায়। প্রবাসী আয় (রেমিট্যান্স) বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ইতিবাচক পরিবর্তন এবং আমানতকারীদের আস্থা কিছুটা ফেরায় এ তারল্য বেড়েছে বলে জানায় বাংলাদেশ ব্যাংক।

তবে দুর্বল ব্যাংকগুলোকে ধস থেকে বাঁচাতে জরুরি ভিত্তিতে 'লেন্ডার অব লাস্ট রিসোর্ট' হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক ৮৪,৯৪৫.৭১ কোটি টাকার বিশেষ তারল্য সহায়তা (ডিমান্ড লোন) দিয়েছে। সবচেয়ে বেশি ১৭,০০০ কোটি টাকা সহায়তা পেয়েছে ইসলামী ব্যাংক। এছাড়া ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক (১৫,৮১০.৩২ কোটি টাকা), সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক (১০,৮৪৩ কোটি টাকা), এক্সিম ব্যাংক (১০,৫৬৮ কোটি টাকা), ন্যাশনাল ব্যাংক (১০,৫০৮ কোটি টাকা) ও ইউনিয়ন ব্যাংকসহ (৫,৪২১ কোটি টাকা) অন্যান্য ব্যাংকগুলোকে এ সহায়তা দেওয়া হয়।

নীতিগত সুদের হার হ্রাস

কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতিগত সুদের হার (পলিসি রেট) ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৯.৫০ শতাংশ করায় আন্তঃব্যাংক কলমানি রেটেও প্রভাব পড়েছে। গত ২৭ সেপ্টেম্বর কলমানি রেট কমে দাঁড়িয়েছে ৮.৭২ শতাংশে, যা আগের বছরের একই দিনে ছিল ৯.৯৪ শতাংশ।

মূলধন ঘাটতি ও পাহাড়সম খেলাপি ঋণ

উদ্বৃত্ত তারল্য থাকলেও রেকর্ড পরিমাণ খেলাপি ঋণ ও মূলধন ঘাটতির কারণে ব্যাংকগুলো নতুন করে ঋণ সম্প্রসারণ করতে পারছে না।

মূলধন ঘাটতি: চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত দেশের ৬৩টি ব্যাংকের মধ্যে ১৫টি ব্যাংকই ঋণাত্মক বা নেতিবাচক মূলধন নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। ব্যাংক খাতের সার্বিক মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত (CRAR) নেমে এসেছে ঋণাত্মক ৩.১৭ শতাংশে। সবচেয়ে করুণ অবস্থা শরীয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলোর, যাদের ক্যাপিটাল এডিকুয়েসি রেশিও মারাত্মকভাবে কমে দাঁড়িয়েছে ঋণাত্মক ৪৪.৭৭ শতাংশে।

খেলাপি ঋণ: জুন শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫,৮১,২৪৭ কোটি টাকায়, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ৩১.৪১ শতাংশ। এছাড়া মোট শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬,০৬,৫৫৫ কোটি টাকায় (৩২.৭৮%)।

বিপুল লোকসান: বছরের প্রথম প্রান্তিকে ব্যাংকগুলো ৭৮৯ কোটি টাকা পরিচালন মুনাফা করলেও উচ্চ প্রভিশনিং এবং সম্ভাব্য ঋণ লোকসান সমন্বয়ের পর পুরো খাত ৮,৪১৭ কোটি টাকার নিট লোকসানে পড়েছে। বর্তমানে ২২টি ব্যাংকের পুঞ্জীভূত লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২,৫৩,৯৩৮ কোটি টাকায়।

আইনি সংস্কারের উদ্যোগ

ব্যাংক খাতের এ বিশৃঙ্খলা দূর করতে এবং খেলাপি সম্পদ নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংক স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। এর অংশ হিসেবে ব্যাংক কোম্পানি আইন ২০২৬, অর্থ ঋণ আদালত আইন ২০২৬ এবং আসন্ন দেউলিয়া ও পুনর্গঠন আইন ২০২৬ সংশোধনের কাজ চলছে। এছাড়া ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের তালিকা জনসম্মুখে প্রকাশের আইনি পথও খতিয়ে দেখছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা।

অর্থ মন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম মনিসহ কমিটির অন্যান্য সদস্যরা বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। সংসদীয় কমিটি ব্যাংক খাতের স্বচ্ছতা ও সুশাসন নিশ্চিত করতে অর্থ মন্ত্রণালয়কে পরবর্তী বৈঠকে আরও বিস্তারিত ও পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্য উপস্থাপনের নির্দেশ দিয়েছে।

এসউদ্দিন/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর

উ
প
রে