×
ঢাকা, রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ভারতে সফল এসআইপি মডেল, বাংলাদেশে মিউচুয়াল ফান্ডের নতুন দিগন্ত

২০২৬ সেপ্টেম্বর ২৭ ১৯:২৬:২৬
ভারতে সফল এসআইপি মডেল, বাংলাদেশে মিউচুয়াল ফান্ডের নতুন দিগন্ত

নিজস্ব প্রতিবেদক: বিশ্ব অর্থনীতিতে দীর্ঘ দিন ধরেই সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আর্থিক লক্ষ্য পূরণের প্রধান মাধ্যম হিসেবে মিউচুয়াল ফান্ড ব্যবহৃত হয়ে আসছে। যুক্তরাষ্ট্রে অর্ধেকেরও বেশি পরিবার মিউচুয়াল ফান্ডের মাধ্যমে তাদের সঞ্চয় বিনিয়োগ করে থাকে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও ‘সিস্টেমেটিক ইনভেস্টমেন্ট প্ল্যান’ (এসআইপি)-এর মাধ্যমে ক্ষুদ্র ও নিয়মিত বিনিয়োগ সাধারণ মানুষের মাঝে মিউচুয়াল ফান্ডকে অত্যন্ত জনপ্রিয় করে তুলেছে।

বাংলাদেশে ঐতিহ্যগতভাবে সঞ্চয়পত্র, ব্যাংক আমানত এবং সরাসরি শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের ওপর সাধারণ মানুষ নির্ভর করলেও তা জীবনের বিভিন্ন ধাপে পরিবর্তিত আর্থিক চাহিদা পুরোপুরি মেটাতে পারে না। ১৯৮০-এর দশকে ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি)-র হাত ধরে সূচনা হলেও, দেশে মিউচুয়াল ফান্ড খাত এতদিন প্রধানত প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী কেন্দ্রিক ছিল। সাধারণ মানুষের দোড়গোড়ায় পেশাদারভাবে পরিচালিত এই ফান্ডগুলো পৌঁছাতে পারেনি।

খুচরা রূপান্তরের সুফল ও বর্তমান নীতি সহায়তা

মিউচুয়াল ফান্ডে খুচরা বা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের সম্পৃক্ত করা কেবল এই খাতের সম্পদ বাড়ানোর বিষয় নয়; বরং এটি পেশাদার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে গৃহস্থালির সঞ্চয়কে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া এবং শেয়ারবাজারকে আরও গভীর ও স্থিতিশীল করার একটি মূল হাতিয়ার।

সম্প্রতি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, বিএসইসি ও এনবিআর কর্তৃক গৃহীত পদক্ষেপগুলো এ খাতে ইতিবাচক মোড় এনেছে। বিশেষ করে কর রেয়াতের জন্য মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগের সীমা ৭৫ লাখ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি এবং শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ড উভয় লভ্যাংশ আয়ের ওপর ফ্ল্যাট ১৫% চূড়ান্ত কর নির্ধারণ একটি সময়োপযোগী পদক্ষেপ। তবে এই খাতের প্রকৃত সম্ভাবনা উন্মোচনে এখনো কিছু কাঠামোগত বাধা দূর করা প্রয়োজন।

ভারতের আদলে ৫০ বিলিয়ন ডলারের বাজারের সম্ভাবনা

বাংলাদেশের শেয়ারবাজার এখনও অতিরিক্ত খুচরা বিনিয়োগকারী-নির্ভর; যেখানে দৈনিক লেনদেনের প্রায় ৮৫ শতাংশই আসে সাধারণ বা ব্যক্তিশ্রেণী বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে। এর ফলে বাজারে প্রায়ই অনুমাননির্ভর (Speculative) অস্থিরতা দেখা যায়। এই সঞ্চয়কে যদি পেশাদার ফান্ডের মাধ্যমে বাজারে আনা যায়, তবে বাজার অনেক স্থিতিশীল হবে।

ভারতে বর্তমানে মিউচুয়াল ফান্ড খাতের আকার প্রায় ৯০০ বিলিয়ন ডলার (০.৯ ট্রিলিয়ন), যা প্রধানত এসআইপি প্রবাহের ওপর ভর করে গড়ে উঠেছে। ভারতের তুলনায় বাংলাদেশের মাথাপিছু ব্যাংক আমানত প্রায় অর্ধেক। কিন্তু বাংলাদেশ যদি ভারতের মাথাপিছু মিউচুয়াল ফান্ড সম্পদের অর্ধেক অর্জনেও সক্ষম হয়, তবে বর্তমানে ১ বিলিয়ন ডলারের নিচে থাকা এই মিউচুয়াল ফান্ড খাতের আকার দাঁড়িয়ে যেতে পারে ৪৫ থেকে ৫০ বিলিয়ন ডলারে!

মিউচুয়াল ফান্ড খাতকে জনপ্রিয় করার ৪ মূল অগ্রাধিকার

১. ডিজিটাল রূপান্তর ও সহজ প্রক্রিয়া: কাগজে-কলমে ম্যানুয়াল স্বাক্ষরভিত্তিক জটিল প্রক্রিয়া বাদ দিয়ে পুরোপুরি ডিজিটাল এবং এপিআই (API) ভিত্তিক ইকোসিস্টেম তৈরি করতে হবে। বিনিয়োগ প্রক্রিয়াটি যেন বিকাশ বা রকেটে ডিপোজিট ডিপিএস খোলার মতোই সহজ ও মসৃণ হয়, যা কোটি কোটি মানুষের কাছে মোবাইল স্কিনেই মিউচুয়াল ফান্ডকে পৌঁছে দেবে।

২. খুচরা বিক্রয় ও ডিস্ট্রিবিউশন নেটওয়ার্ক জোরদার: বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি ও সুফল সম্পর্কে সচেতন করতে পেশাদার সেলস টিম এবং শক্তিশালী ডিস্ট্রিবিউশন নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে হবে।

৩. হাইব্রিড ফান্ড ও বৈচিত্র্যময় পণ্য প্রবর্তন: বর্তমানে বাজারের বেশিরভাগ ফান্ডই ইকুইটি বা শেয়ারকেন্দ্রিক, যা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকিতে ফেলে। সাধারণ ও শরিয়াহ উভয় ধারায় নির্দিষ্ট ‘হাইব্রিড ফান্ড’ (ইকুইটি ও বন্ডের মিশ্রণ) প্রবর্তন করলে ঝুঁকি কমবে এবং বিনিয়োগকারীদের পছন্দ করার সুযোগ বাড়বে।

৪. উন্নত মানের সিকিউরিটিজের জোগান: বাজারে ভালো মানের শেয়ার ও বন্ডের সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে মিউচুয়াল ফান্ডগুলো সাধারণ মানুষের সঞ্চয় সফলভাবে দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ করতে পারে।

একটি শিক্ষণীয় ও দূরদর্শী নিয়ন্ত্রক কাঠামো গড়ে তোলার মাধ্যমে দেশের গৃহস্থালির ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সঞ্চয়কে দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক মূলধনে রূপান্তর করা সম্ভব। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের শেয়ারবাজারকে আরও গভীর, স্থিতিশীল ও শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো যেতে পারে বলে মনে করছেন শেয়ারবাজার সংশ্লিষ্ট বিশিষ্টজনরা।

এসউদ্দিন/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর

উ
প
রে