×
ঢাকা, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ঋণ, আমানত ও সম্পদের হিসাবে বড় অসংগতি, নিরীক্ষায় যা বেরিয়ে এলো

২০২৬ সেপ্টেম্বর ২৫ ০৯:২১:৫০
ঋণ, আমানত ও সম্পদের হিসাবে বড় অসংগতি, নিরীক্ষায় যা বেরিয়ে এলো

নিজস্ব প্রতিবেদক: দীর্ঘদিনের লোকসান, মূলধন ঘাটতি ও নানা আর্থিক অসংগতিতে সংকটে থাকা বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি (বিআইএফসি) আরও দুর্বল আর্থিক অবস্থায় পড়েছে। ২০২৫ সালের শেষে প্রতিষ্ঠানটির মোট সম্পদের তুলনায় দায়ের পরিমাণ ১ হাজার ৩৪৪ কোটি ৮৯ লাখ টাকা বেশি হয়েছে। একই সময়ে কোম্পানিটির পুঞ্জীভূত লোকসান দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৪৯৯ কোটি ৭৮ লাখ টাকা।

প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে এমন পরিস্থিতিতে স্বাভাবিক কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন নিরীক্ষক। ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর সমাপ্ত হিসাব বছরের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে আহসান মঞ্জুর অ্যান্ড কোম্পানি। এর অংশীদার মো. আবদুল্লাহ আল আমিন প্রতিবেদনটিতে স্বাক্ষর করেছেন।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিআইএফসির বিতরণ করা ঋণ, লিজ ও অগ্রিমের বড় একটি অংশের বিপরীতে সানম্যান গ্রুপের গ্যারান্টি রয়েছে।

২০২৫ সালের শেষে প্রতিষ্ঠানটির মোট ঋণ, লিজ ও অগ্রিমের পরিমাণ ছিল ৭৬২ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। এর মধ্যে সানম্যান গ্রুপের প্রতিষ্ঠান গোল্ডেন হরাইজন লিমিটেডকে দেওয়া হয়েছে ৫৮ কোটি ৬১ লাখ টাকা। বাকি ৭০৩ কোটি ৮৬ লাখ টাকা অন্যান্য পক্ষকে দেওয়া হয়েছে।

এই ঋণ ও অগ্রিমের মধ্যে ৬১৯ কোটি ৫৮ লাখ টাকার বিপরীতে সানম্যান গ্রুপের গ্যারান্টি রয়েছে। অর্থাৎ মোট ঋণ, লিজ ও অগ্রিমের প্রায় ৮১ শতাংশই এই গ্যারান্টির আওতায় রয়েছে।

নিরীক্ষকের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এ ধরনের জামানত ব্যবস্থা ‘ফাইন্যান্স কোম্পানি আইন, ২০২৩’-এর ২৫ ধারার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।বিআইএফসির আরও ৭২৭ কোটি ৩৮ লাখ টাকার ঋণ ও আমানতের হিসাবের যথার্থতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন নিরীক্ষক।

এর মধ্যে অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক ও এজেন্টের কাছ থেকে নেওয়া ঋণের পরিমাণ ৩৪৭ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। এছাড়া ব্যাংক ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে থাকা মেয়াদি আমানত ২১১ কোটি ৪৭ লাখ এবং অন্যান্য উৎসের মেয়াদি আমানত ১৬৮ কোটি ১১ লাখ টাকা।

নিরীক্ষক জানিয়েছেন, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর কাছে চিঠি পাঠানো এবং বিকল্প নিরীক্ষা পদ্ধতি অনুসরণ করেও এসব হিসাবের বিষয়ে পর্যাপ্ত নিরীক্ষা প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে হিসাবগুলোর যথার্থতা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।

এ ছাড়া কয়েকটি ব্যাংক ও কোম্পানির হিসাবেও অমিল পাওয়া গেছে। নিরীক্ষার প্রতিবেদন প্রস্তুতের সময় পর্যন্ত এসব অমিল সমন্বয় করা হয়নি বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিআইএফসির স্থায়ী সম্পদের হিসাব নিয়েও আপত্তি জানিয়েছেন নিরীক্ষক। ২০২৫ সালের শেষে প্রতিষ্ঠানটির স্থায়ী সম্পদের মূল্য দেখানো হয়েছে ৪৫ কোটি ৭০ লাখ টাকা। এর মধ্যে রাজধানীর পল্টনে থাকা একটি জমির মূল্যই দেখানো হয়েছে ৪৪ কোটি টাকা।

তবে ওই জমির মালিকানা ও মূল্য যাচাইয়ের জন্য প্রয়োজনীয় নথিপত্র পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন নিরীক্ষক। এর মধ্যে মিউটেশন রেকর্ড, বিএস, আরএস, এসএ ও সিএস খতিয়ান এবং ভূমি কর পরিশোধের কাগজপত্রও রয়েছে।ফলে জমিটির প্রকৃত মালিকানা এবং দেখানো মূল্য যথাযথ কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত হতে পারেননি নিরীক্ষক।

টেলিপ্লাস নিউ ইয়র্ক লিমিটেডের একটি ঋণ হিসাবে অপরিশোধিত ১৮ কোটি ৮ লাখ টাকা সুদ হিসেবে যোগ করে বকেয়া ঋণের পরিমাণ বাড়ানো হয়েছে। নিরীক্ষকের মতে, এ ধরনের হিসাব বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট নির্দেশনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।এ ছাড়া বিআইএফসির ৪৩ লাখ ৪৭ হাজার টাকার অবণ্টিত লভ্যাংশ ক্যাপিটাল মার্কেট স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ডে (সিএমএসএফ) স্থানান্তর করা হয়নি।

কোম্পানিটির ৭ কোটি ৮৩ লাখ টাকার বকেয়া উৎসে করও সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়নি। এর ফলে ‘আয়কর আইন, ২০২৩’ অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটির অতিরিক্ত দায় তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন নিরীক্ষক।

বিআইএফসির বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে কোম্পানি সচিব আনিসুর রহমান আগামীর সময়কে বলেন, ২০১৫ সালে এস আলম ও পি কে হালদার কোম্পানিটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর বিভিন্ন অনিয়মের ঘটনা ঘটে। এতে প্রতিষ্ঠানটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

তিনি বলেন, বর্তমানে কোম্পানিটির কার্যত কোনো ব্যবসা নেই। এরপরও বিদ্যমান সমস্যাগুলো কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা চলছে।দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত লোকসান, মূলধন ঘাটতি এবং সম্পদের তুলনায় দায়ের বড় ব্যবধান প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক অবস্থাকে আরও সংকটপূর্ণ করে তুলেছে।

নিরীক্ষকের পর্যবেক্ষণ, হিসাবের অমিল, ঋণ ও আমানতের তথ্য যাচাইয়ে ঘাটতি, সম্পদের মালিকানা-সংক্রান্ত নথির অভাব এবং বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক অনিয়মের বিষয়গুলোও প্রতিষ্ঠানটির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব আর্থিক ও হিসাবসংক্রান্ত সমস্যা সমাধান করে নতুন করে স্বাভাবিক ব্যবসায়িক কার্যক্রমে ফেরার ক্ষেত্রে বিআইএফসিকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।

মুয়াজ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর

উ
প
রে