×
ঢাকা, বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

যমযমের পানি ও আইয়ূব (আ.)-কে নিয়ে মানুষের দুটি বড় ভুল ধারণা

২০২৬ সেপ্টেম্বর ২৩ ১৭:৫১:৫৩
যমযমের পানি ও আইয়ূব (আ.)-কে নিয়ে মানুষের দুটি বড় ভুল ধারণা

নিজস্ব প্রতিবেদক: ইসলামি ইতিহাস ও নবী-রাসুলদের জীবনী নিয়ে মানুষের মধ্যে অনেক সময় এমন কিছু কথা প্রচলিত হয়ে যায়, যেগুলোর নির্ভরযোগ্য ভিত্তি নেই। বিশেষ করে হজরত ইসমাঈল (আ.) ও হজরত আইয়ূব (আ.)-এর ঘটনা নিয়ে বেশ কিছু বর্ণনা দীর্ঘদিন ধরে মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত রয়েছে।

সম্প্রতি শায়েখ আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়ার আলোচনায় এমন দুটি প্রচলিত ভুলের সংশোধন তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে নির্ভরযোগ্য সূত্রের আলোকে এসব বিষয়ের ব্যাখ্যা দেওয়া হয়।

যমযমের পানি কীভাবে প্রকাশিত হয়েছিল?

প্রচলিত একটি ধারণা হলো, শিশু ইসমাঈল (আ.) তীব্র পিপাসায় মাটির ওপর পা নড়াচড়া করার পর যমযমের পানির উৎস প্রকাশিত হয়েছিল। তখন তাঁর মা হজরত হাজেরা (আ.) পানি খুঁজছিলেন—এমন কথাই অনেকের কাছে পরিচিত।

তবে সহিহ বুখারির বর্ণনা অনুযায়ী, যমযমের স্থানে একজন ফেরেশতা উপস্থিত হয়ে মাটিতে আঘাত করার পর পানি প্রকাশিত হয়। হাদিসে এসেছে, ফেরেশতা তাঁর গোড়ালি দিয়ে—অথবা বর্ণনাকারীর ভাষ্য অনুযায়ী, ডানা দিয়ে—মাটিতে আঘাত করেন। এরপর সেখানে পানি প্রকাশিত হলে হজরত হাজেরা (আ.) তা চারপাশে ছড়িয়ে পড়া থেকে রক্ষা করতে হাত দিয়ে পানি আটকে পাত্রে সংগ্রহ করতে থাকেন।

এই ঘটনা সহিহ বুখারী, হাদিস ৩৩৬৪-এ বর্ণিত হয়েছে। একই ঘটনার উল্লেখ মুসনাদে আহমাদেও রয়েছে।

এই বর্ণনার ভিত্তিতে যমযমের সঙ্গে জিবরীল (আ.)-এর আঘাতের সম্পর্ক বোঝাতে কিছু নামও উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ‘হাযমাতু জিবরীল’—অর্থাৎ জিবরীল (আ.)-এর আঘাতে সৃষ্ট স্থান এবং ‘রাকদ্বাতু জিবরীল’—অর্থাৎ জিবরীল (আ.)-এর পদাঘাত।

ইবনুল কাইয়্যিম তাঁর যাদুল মা‘আদ গ্রন্থে যমযমের এসব নামের উল্লেখ করেছেন।

আইয়ূব (আ.)-এর রোগ নিয়ে প্রচলিত নানা কথা

হজরত আইয়ূব (আ.)-এর পরীক্ষা ও অসুস্থতা নিয়েও মানুষের মধ্যে বিভিন্ন অতিরঞ্জিত ও ভিত্তিহীন বর্ণনা প্রচলিত রয়েছে। এর মধ্যে তাঁর শরীর থেকে মাংস খসে পড়া, চামড়া ছিঁড়ে যাওয়া, দুর্গন্ধের কারণে মানুষ তাঁকে এড়িয়ে চলা কিংবা তাঁকে ময়লার স্তূপে ফেলে রাখার মতো নানা কাহিনি বলা হয়।

এ ছাড়া তাঁর স্ত্রী খাবারের ব্যবস্থা করতে নিজের চুলের বেণি বিক্রি করেছিলেন—এমন বর্ণনাও কোথাও কোথাও প্রচলিত আছে।

তবে এসব বিস্তারিত কাহিনির নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে আলেমদের মধ্যে আপত্তি রয়েছে। ইবনু কাসীরও আইয়ূব (আ.)-এর পরীক্ষা সম্পর্কে প্রচলিত এসব বর্ণনার বিশুদ্ধতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। ফলে কুরআন ও নির্ভরযোগ্য হাদিসে যেসব তথ্য নেই, সেগুলোকে নিশ্চিত ঘটনা হিসেবে প্রচার না করাই সতর্কতার বিষয়।

কুরআনে আইয়ূব (আ.)-এর পরীক্ষার মূল শিক্ষা

কুরআনে আল্লাহ তাআলা আইয়ূব (আ.)-এর অসুস্থতার বিস্তারিত বিবরণ দেননি। বরং তাঁর বিপদ, আল্লাহর কাছে দোয়া এবং ধৈর্যের বিষয়টিকে বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

সূরা আল-আম্বিয়ায় আল্লাহ তাআলা বলেন, আইয়ূব (আ.) তাঁর রবকে ডেকে বলেছিলেন— ‘নিশ্চয়ই আমি বিপদে পড়েছি, আর আপনি তো সর্বাধিক দয়ালুদের মধ্যে সর্বাধিক দয়ালু।’

এরপর আল্লাহ তাঁর দোয়া কবুল করেন, তাঁর বিপদ দূর করে দেন এবং তাঁর পরিবার-পরিজন ও তাদের অনুরূপ আরও অনেকে তাঁকে দান করেন। কুরআনে এটিকে ইবাদতকারীদের জন্য শিক্ষা ও আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। — সূরা আল-আম্বিয়া, ২১:৮৩–৮৪

অন্যদিকে সূরা সাদে আইয়ূব (আ.) সম্পর্কে আল্লাহ বলেন—‘নিশ্চয়ই আমরা তাকে ধৈর্যশীল পেয়েছি। সে কতই না উত্তম বান্দা! নিশ্চয়ই সে ছিল অধিক প্রত্যাবর্তনকারী।’ — সূরা সাদ, ৩৮:৪৪

একটি বর্ণনায় এসেছে, আইয়ূব (আ.) ১৮ বছর পরীক্ষার মধ্যে ছিলেন। এ সময়ে তাঁর নিকটাত্মীয় ও দূরাত্মীয়রা তাঁকে পরিত্যাগ করেছিল। তবে তাঁর দুইজন ঘনিষ্ঠ ভাই তাঁর সঙ্গে ছিলেন।

ইবনু হিব্বান ও আল-হাকিমসহ কয়েকটি গ্রন্থে এ বর্ণনা পাওয়া যায়। শায়েখ আলবানী আস-সিলসিলাতুস সহীহা-তে বর্ণনাটিকে সহিহ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

আইয়ূব (আ.)-এর ঘটনা থেকে মূল শিক্ষা হলো—বিপদ যত দীর্ঘ বা কঠিনই হোক, আল্লাহর ওপর আস্থা রেখে ধৈর্য ধারণ করা এবং বিপদের সময়ে তাঁর কাছেই সাহায্য ও রহমত প্রার্থনা করা।

মুয়াজ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

ধর্ম ও জীবন এর সর্বশেষ খবর

ধর্ম ও জীবন - এর সব খবর



রে