×
ঢাকা, বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

১২ই ডিসেম্বর রাতে চুক্তি শেষ — পরদিন সকালে পদ্মায় পানি থাকবে?

২০২৬ সেপ্টেম্বর ১৬ ০৮:৪১:৩৮
১২ই ডিসেম্বর রাতে চুক্তি শেষ — পরদিন সকালে পদ্মায় পানি থাকবে?

নিজস্ব প্রতিবেদক: ১৯৯৬ সালে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার সময় ঘনিয়ে আসায় নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। দীর্ঘদিনের পানি বিরোধের প্রেক্ষাপটে করা এই চুক্তির কার্যকারিতা, সীমাবদ্ধতা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে এখন দুই দেশের মধ্যে নতুন করে আলোচনা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ফারাক্কা পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ফারাক্কা বাঁধকে কেন্দ্র করে প্রায় তিন দশক ধরে চলা বিরোধ ও অস্থিরতার অবসান ঘটিয়ে গঙ্গার পানি বণ্টনের একটি কাঠামো তৈরি করাই ছিল চুক্তিটির অন্যতম উদ্দেশ্য।

চুক্তিতে আরও বলা হয়েছে, কোনো ১০ দিনের সময়ে ফারাক্কায় পানির প্রবাহ ৫০ হাজার কিউসেকের নিচে নেমে গেলে দুই দেশকে জরুরি ভিত্তিতে আলোচনায় বসে পরিস্থিতি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। অর্থাৎ, পানির প্রবাহ অত্যন্ত কমে গেলেও চুক্তিতে বাংলাদেশের জন্য সারা বছর একটি নির্দিষ্ট ন্যূনতম পানির নিশ্চয়তা দেওয়া হয়নি।

এ কারণে ১২ ডিসেম্বরের পর কী হবে—এ প্রশ্নটি মূলত ‘পদ্মায় পানি থাকবে কি না’ তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে পানি বণ্টনের কোন নিয়মে এবং কী নিশ্চয়তায় হবে, সেটি নিয়ে। ২০২৬ সালের শেষ দিকে চুক্তি নবায়ন নিয়ে দুই দেশের আলোচনা চলমান রয়েছে এবং নতুন সমঝোতার বিষয়টি তাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

ফারাক্কা চুক্তি নিয়ে আলোচনায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গার পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ার বিষয়টি। চুক্তির নির্দিষ্ট ধারায় পানিপ্রবাহের বিভিন্ন স্তরের ভিত্তিতে পানি ভাগের ব্যবস্থা থাকলেও, নদীতে পানির প্রবাহ অত্যন্ত কমে গেলে বাংলাদেশের জন্য একটি নির্দিষ্ট সর্বনিম্ন পরিমাণ পানি নিশ্চিত করার বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গার পানিপ্রবাহ অনেক সময় চুক্তিতে বিবেচিত মাত্রার নিচে নেমে যায়। এ অবস্থায় পানি বণ্টনের কাঠামো বাংলাদেশের প্রয়োজনীয় পানি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কতটা কার্যকর—সেটি নতুন করে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

বিভিন্ন বছরে শুষ্ক মৌসুমে পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ার ফলে বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে সেচের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে রাজশাহী ও কুষ্টিয়াসহ গঙ্গা অববাহিকাভুক্ত এলাকায় কৃষি, ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার এবং পরিবেশের ওপর এর প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।

বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি অনেকাংশে সেচনির্ভর। শুষ্ক মৌসুমে নদীতে পানির প্রবাহ কমে গেলে সেচের জন্য ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা বাড়তে পারে। এতে কৃষকের উৎপাদন খরচ বাড়ার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এ ছাড়া নদীতে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ কমে গেলে নদীর জীববৈচিত্র্য, নৌপথ, মৎস্যসম্পদ ও স্থানীয় পরিবেশের ওপরও প্রভাব পড়তে পারে। ফলে ফারাক্কা পানি বণ্টনের বিষয়টি শুধু দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে কৃষি, পরিবেশ ও স্থানীয় অর্থনীতিও সরাসরি জড়িত।

ফারাক্কা চুক্তি নিয়ে ভারতের অভ্যন্তরেও বিভিন্ন সময়ে পানি ব্যবহারের চাহিদা ও স্বার্থের বিষয়টি সামনে এসেছে। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারের মতো গঙ্গা অববাহিকার রাজ্যগুলোর পানি ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা রয়েছে।

ফলে ভারত-বাংলাদেশ পানি বণ্টন আলোচনায় শুধু দুই দেশের কেন্দ্রীয় সরকারের অবস্থান নয়, সংশ্লিষ্ট রাজ্যগুলোর পানি ব্যবস্থাপনা ও অভ্যন্তরীণ চাহিদার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বিশ্লেষক মাহবুব হাসানের মতে, পানি নিয়ে বাংলাদেশের কূটনৈতিক আলোচনাকে এখন আরও বিস্তৃত কাঠামোয় নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। তার বিশ্লেষণে পানি ইস্যুর সঙ্গে ট্রানজিট, বন্দর ও বাণিজ্যসহ পারস্পরিক স্বার্থের বিষয়গুলোকে আলোচনার অংশ করার প্রয়োজনীয়তার কথা উঠে এসেছে।

তার মতে, নদীর পানিপ্রবাহ, বৃষ্টিপাত, উজানের পানি প্রত্যাহারসহ বিভিন্ন বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য ও উপাত্তের ভিত্তিতে আলোচনা করা গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে স্যাটেলাইট ডেটা ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে নদীর পানিপ্রবাহ পর্যবেক্ষণ করা ভবিষ্যৎ আলোচনায় সহায়ক হতে পারে।

ফারাক্কা চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে নতুন চুক্তি, নবায়ন কিংবা বিদ্যমান ব্যবস্থার সংশোধন নিয়ে আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু একটি চুক্তির ওপর নির্ভর না করে নদীর পানিপ্রবাহের তথ্য সংগ্রহ, বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ এবং বিকল্প পানি ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।

ফারাক্কা চুক্তির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে দুই দেশের পারস্পরিক আলোচনা, অভিন্ন নদীর পানিপ্রবাহের বাস্তব পরিস্থিতি এবং উভয় দেশের অভ্যন্তরীণ পানির চাহিদা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তাই ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের আগে এ বিষয়ে কী ধরনের কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া হয়, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সালমান ফারসি/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

জাতীয় এর সর্বশেষ খবর

জাতীয় - এর সব খবর



রে