×
ঢাকা, শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

দুর্বল ৫ ব্যাংকের পরিণতিতে নতুন মোড়, গ্রাহকদের আচরণে স্বস্তি

২০২৬ সেপ্টেম্বর ১২ ১২:০৯:৪১
দুর্বল ৫ ব্যাংকের পরিণতিতে নতুন মোড়, গ্রাহকদের আচরণে স্বস্তি

নিজস্ব প্রতিবেদক : দুর্বল পাঁচটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক একীভূত করে গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক নিয়ে শুরুতে আমানতকারীদের মধ্যে যে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল, কার্যক্রম শুরুর পর আপাতত তার বড় ধরনের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। বরং প্রত্যাশার তুলনায় আমানত উত্তোলনের চাপ কম থাকায় কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে বাংলাদেশ ব্যাংক ও ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনায়।

দীর্ঘদিন ধরে তারল্য সংকট, আমানত ফেরত পেতে ভোগান্তি এবং আর্থিক দুর্বলতার কারণে একীভূত হওয়া পাঁচ ব্যাংকের গ্রাহকদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছিল। নতুন ব্যাংক কার্যক্রম শুরু করলে বিপুলসংখ্যক গ্রাহক একযোগে টাকা তুলে নিতে পারেন—এমন আশঙ্কাও ছিল। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশ ব্যাংক আগেই বিশেষ তারল্য সহায়তার ব্যবস্থা করে।

তবে বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, টাকা ফেরতের সুযোগ পাওয়ার পরও আবেদন করা পুরো অর্থ তুলছেন না অধিকাংশ গ্রাহক। বরং ব্যাংকে নতুন করে আমানতও জমা পড়ছে। এতে প্রাথমিকভাবে আমানতকারীদের আস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, নতুন ব্যাংকটির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল আমানতকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার করা। কারণ একীভূত হওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো দীর্ঘদিন আর্থিক দুর্বলতা ও তারল্য সংকটে ছিল।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশ ব্যাংক সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংককে একসঙ্গে ৫ হাজার কোটি টাকা বিশেষ তারল্য সহায়তা দিয়েছে। কার্যক্রম শুরুর পর যাতে ব্যাংকটি তারল্য সংকটে না পড়ে, সে বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে অর্থের সংস্থান রাখা হয়।

তিনি বলেন, প্রত্যাশার তুলনায় আমানত উত্তোলনের চাপ কম থাকায় ব্যাংকটির ওপর তারল্য ব্যবস্থাপনার চাপও কিছুটা কমেছে।

ব্যাংক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ১ থেকে ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মোট ১ লাখ ২৪ হাজার ৮৭৭ জন আমানতকারী ৫ হাজার ৫১১ কোটি টাকা ফেরতের আবেদন করেন।কিন্তু এর বিপরীতে এখন পর্যন্ত ৩৫ হাজার ৯০৭ জন গ্রাহক ১ হাজার ৪৩১ কোটি টাকা উত্তোলন করেছেন।অর্থাৎ আবেদন করা অর্থের প্রায় তিন-চতুর্থাংশই এখনো উত্তোলন করা হয়নি।

প্রথম দিকে প্রতিদিন যে পরিমাণ অর্থ ফেরত দেওয়ার প্রস্তুতি রাখা হয়েছিল, বাস্তবে তার তুলনায় অনেক কম অর্থ উত্তোলন করেছেন গ্রাহকরা।

১ সেপ্টেম্বর করা আবেদনের ভিত্তিতে ৭ সেপ্টেম্বর মোট ১ হাজার ৩২৫ কোটি টাকা ফেরত দেওয়ার প্রস্তুতি ছিল। ওইদিন ৮ হাজার ১২৫ জন গ্রাহক মোট ৩১৯ কোটি টাকা উত্তোলন করেন।পরদিন ১ হাজার ১৬ কোটি টাকা ফেরতের চাহিদার বিপরীতে ৭ হাজার ২৩৪ জন গ্রাহক উত্তোলন করেন ৩৪০ কোটি টাকা।

৯ সেপ্টেম্বর ৯২৩ কোটি টাকা ফেরত দেওয়ার কথা থাকলেও ১০ হাজার ৬৯৭ জন গ্রাহক উত্তোলন করেন ৩৮১ কোটি টাকা। সর্বশেষ ৬ সেপ্টেম্বরের আবেদনের বিপরীতে ৬৫৭ কোটি টাকা ফেরতের ব্যবস্থা থাকলেও ৯ হাজার ৪১ জন গ্রাহক উত্তোলন করেন ৩৯১ কোটি টাকা।

শুধু টাকা উত্তোলনের হার কম নয়, ব্যাংকে নতুন করে আমানতও জমা পড়ছে। অর্থ ফেরত কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর ৭ সেপ্টেম্বর ব্যাংকে নতুন করে ১৪১ কোটি টাকা জমা হয়।

পরদিন জমা পড়ে ১৯৫ কোটি টাকা। এরপর ৯ ও ১০ সেপ্টেম্বর যথাক্রমে ২৪৪ কোটি এবং ৩১৪ কোটি টাকা নতুন করে জমা হয়েছে।অর্থাৎ চার দিনে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে নতুন করে মোট ৮৯৪ কোটি টাকা আমানত জমা হয়েছে।ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. আবেদুর রহমান সিকদারের মতে, এ প্রবণতা গ্রাহকদের মধ্যে ব্যাংকের প্রতি আস্থা ফেরার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

তার দাবি, অনেক গ্রাহক টাকা ফেরতের জন্য আবেদন করলেও পরে তা উত্তোলন করছেন না। ব্যাংক থেকে যোগাযোগ করা হলে কেউ কেউ জানিয়েছেন, আপাতত টাকা তোলার প্রয়োজন নেই।

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীদের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগের একটি বিষয় ছিল আমানতের ওপর সম্ভাব্য ‘হেয়ারকাট’। অর্থাৎ নির্দিষ্ট অংশ বাদ দিয়ে আমানত ফেরত দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে গ্রাহকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল।

পরবর্তী সময়ে গ্রাহকদের চাপের মুখে এ সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে বাংলাদেশ ব্যাংক। গত ২৫ আগস্ট বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান জানান, আমানতের ওপর কোনো ধরনের হেয়ারকাট প্রযোজ্য হবে না।এরপর ৭ সেপ্টেম্বর থেকে আমানতকারীদের প্রয়োজন অনুযায়ী অর্থ উত্তোলনের সুযোগ দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়।

এ ঘোষণার পর বিপুলসংখ্যক গ্রাহক টাকা তুলতে ব্যাংকে ভিড় করবেন বলে ধারণা করা হলেও বাস্তবে সে ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়নি।সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠনের জন্য একীভূত করা হয়েছে—এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক

এর মধ্যে এক্সিম ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে শেখ হাসিনা-ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী নজরুল ইসলাম মজুমদারের নাম এবং বাকি চার ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান সাইফুল আলমের নাম আলোচিত হয়েছে।

এসব ব্যাংকের বিরুদ্ধে অতীতে অনিয়ম, ঋণ বিতরণে দুর্বলতা ও বড় অঙ্কের আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। এসব কারণে ব্যাংকগুলোর আর্থিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে এবং আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার সক্ষমতা নিয়ে সংকট তৈরি হয়।

নতুন সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন ধরা হয়েছে ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকার ২০ হাজার কোটি টাকা দেওয়ার কথা জানিয়েছে। বাকি ১৫ হাজার কোটি টাকা আমানতকারীদের শেয়ার হিসেবে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।এ ছাড়া আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়াকে কাঠামোর মধ্যে আনতে আমানত বীমা তহবিল থেকেও অর্থ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

আমানতকারীদের টাকা ফেরত দেওয়ার প্রাথমিক ধাপ তুলনামূলক স্বস্তিদায়ক হলেও ব্যাংকটির সামনে এখন বড় ধরনের সাংগঠনিক ও আর্থিক পুনর্গঠনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে।একীভূত হওয়া পাঁচ ব্যাংকের সম্মিলিত জনবল প্রায় ১৬ হাজার। রয়েছে প্রায় ৭৫৯টি শাখা এবং প্রায় ৭০০টি উপশাখা।

অনেক এলাকায় একই ব্যাংকের একাধিক শাখা বা একীভূত পাঁচ ব্যাংকের শাখা পাশাপাশি রয়েছে। ফলে শাখা-উপশাখা পুনর্বিন্যাস, অতিরিক্ত জনবল ব্যবস্থাপনা এবং প্রযুক্তিগত অবকাঠামো একীভূত করা নতুন ব্যাংকটির জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ব্যাংকটির এমডি জানিয়েছেন, চলতি মাসেই একটি মডেল শাখা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। তবে পাঁচটি ব্যাংকের কোর ব্যাংকিং সিস্টেম একীভূত করে নতুন ব্যবস্থায় নিয়ে আসতে সময় প্রয়োজন হবে। নতুন সুইফট কোডসহ অন্যান্য প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাও করতে হবে।সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন শেষে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ।একীভূত হওয়া পাঁচ ব্যাংকের সম্মিলিত খেলাপি ঋণের পরিমাণই প্রায় ১ লাখ ৬৯ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা।

এর মধ্যে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৬০ হাজার ৬৪৫ কোটি টাকা, এক্সিম ব্যাংকের ৩৮ হাজার ৫২ কোটি, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের ২৯ হাজার ৭৯৯ কোটি, ইউনিয়ন ব্যাংকের ২৭ হাজার ১৩৪ কোটি এবং গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের ১৪ হাজার ২১৯ কোটি টাকা।ফলে নতুন ব্যাংকটির জন্য শুধু আমানত ফেরত দেওয়াই নয়, বিপুল খেলাপি ঋণ আদায় এবং আর্থিক ভিত্তি পুনর্গঠন করাও বড় দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, আমানতকারীরা এখনই ব্যাপক হারে টাকা তুলে না নেওয়ায় স্বস্তি পাওয়া গেলেও এটিকে স্থায়ী সাফল্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

ব্যাংকটির প্রতি আস্থা ধরে রাখতে হলে সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। আগের ব্যাংকগুলোর অনিয়ম ও দুর্নীতির পুনরাবৃত্তি বন্ধের পাশাপাশি খেলাপি ঋণ আদায়, তারল্য ব্যবস্থাপনা এবং স্বচ্ছ ব্যাংকিং কার্যক্রম নিশ্চিত করতে হবে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, দীর্ঘদিনের সংকটের পরও গ্রাহকরা ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর পুরোপুরি আস্থা হারাননি—এটি ইতিবাচক দিক। তবে নতুন ব্যাংকটি কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে এবং প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার সক্ষমতা কতটা ধরে রাখতে পারছে, তার ওপরই ভবিষ্যতের আস্থা অনেকাংশে নির্ভর করবে।

অর্থাৎ, আমানত উত্তোলনের চাপ কমে যাওয়ায় সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক আপাতত স্বস্তির জায়গায় থাকলেও প্রকৃত পরীক্ষা এখনো বাকি। আর্থিক পুনর্গঠন, খেলাপি ঋণ আদায়, সুশাসন এবং দীর্ঘমেয়াদি আস্থা—এই চার ক্ষেত্রেই সফলতা অর্জন করতে পারলেই নতুন ব্যাংকটির এই প্রাথমিক স্বস্তি টেকসই হবে।

মুয়াজ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

অর্থনীতি এর সর্বশেষ খবর

অর্থনীতি - এর সব খবর



রে