×
ঢাকা, শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সব ধর্মে একজন স্বামীর একাধিক স্ত্রী হলে সম্পত্তি ভাগ হবে যেভাবে

২০২৬ সেপ্টেম্বর ১২ ১১:৩২:৪০
সব ধর্মে একজন স্বামীর একাধিক স্ত্রী হলে সম্পত্তি ভাগ হবে যেভাবে

নিজস্ব প্রতিবেদক : একজন মুসলিম পুরুষের একাধিক স্ত্রী থাকলে তার মৃত্যুর পর উত্তরাধিকার আইনে সম্পত্তি কীভাবে ভাগ হবে—এ নিয়ে অনেকের মধ্যেই রয়েছে নানা ধরনের প্রশ্ন। বিশেষ করে একাধিক স্ত্রী থাকলে প্রত্যেক স্ত্রী কি সমান অংশ পাবেন, নাকি স্ত্রীসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে স্বামীর সম্পত্তিতে তাদের অংশও পরিবর্তিত হবে—এ বিষয়টি নিয়ে প্রায়ই বিভ্রান্তি দেখা যায়।

বাংলাদেশের মুসলিম উত্তরাধিকার আইনে স্ত্রী একজন হোন কিংবা একাধিক—স্বামীর রেখে যাওয়া সম্পত্তিতে স্ত্রীদের সম্মিলিত অংশ নির্দিষ্ট। তবে সেই অংশের পরিমাণ নির্ভর করে মৃত ব্যক্তির সন্তান বা অন্যান্য উত্তরাধিকারী জীবিত আছেন কি না, তার ওপর।

সম্প্রতি এমনই একটি ঘটনা সামনে এসেছে কুমিল্লার বাসিন্দা আজফর হোসেনকে ঘিরে। তার ছিল দুই স্ত্রী। প্রথম স্ত্রী ও তার সন্তানরা দ্বিতীয় স্ত্রীর বিষয়ে জানতেন না। আজফর হোসেন ২০২২ সালে করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়ার পর সম্পত্তি ভাগাভাগির সময় পরিবারের কাছে বিষয়টি প্রকাশ পায়।

রাজধানীর ধানমন্ডিতে তার একটি পাঁচতলা ভবনসহ একাধিক ফ্ল্যাট ও প্লট ছিল। নিজ জেলাতেও ছিল বিপুল সম্পত্তি। কিন্তু ধানমন্ডির পাঁচতলা ভবনটি কাগজে-কলমে দ্বিতীয় স্ত্রীর নামে রেজিস্ট্রি ও নামজারি করা থাকায় মৃত্যুর পর সম্পত্তি নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়।

আজফর হোসেনের প্রথম স্ত্রীর তিন মেয়ে রয়েছে। দ্বিতীয় স্ত্রীর ঘরে রয়েছে এক ছেলে। ফলে উত্তরাধিকার আইনে কার কতটুকু অংশ হবে, তা নিয়ে পরিবারের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দেয়।

বাংলাদেশে মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী, একজন মুসলিম পুরুষ একই সময়ে সর্বোচ্চ চারজন স্ত্রী রাখতে পারেন। একাধিক স্ত্রী থাকলেও স্বামীর মৃত্যুর পর তারা প্রত্যেকে আলাদা করে নির্দিষ্ট অংশ পান না; বরং স্ত্রীদের জন্য নির্ধারিত মোট অংশ সবাই মিলে ভাগ করে নেন।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, মৃত ব্যক্তির সন্তান থাকলে স্ত্রী একজন বা একাধিক—সব স্ত্রী মিলে স্বামীর সম্পত্তির এক-অষ্টমাংশ (১/৮) পাবেন।

অর্থাৎ, একজন স্ত্রী থাকলে তিনি একাই এক-অষ্টমাংশ পাবেন। কিন্তু দুই স্ত্রী থাকলে ওই এক-অষ্টমাংশ দুই স্ত্রীর মধ্যে সমানভাবে ভাগ হবে। তিন স্ত্রী হলে তিনজনের মধ্যে এবং চার স্ত্রী হলে চারজনের মধ্যে সমানভাবে ভাগ হবে।

উদাহরণ হিসেবে, কোনো মুসলিম ব্যক্তি যদি ৮০ লাখ টাকা রেখে মারা যান এবং তার একাধিক স্ত্রী ও সন্তান থাকে, তাহলে স্ত্রীদের সম্মিলিত অংশ হবে ১০ লাখ টাকা। দুই স্ত্রী থাকলে প্রত্যেকে পাবেন ৫ লাখ টাকা করে।

মৃত ব্যক্তির কোনো সন্তান না থাকলে স্ত্রী বা একাধিক স্ত্রী মিলে স্বামীর সম্পত্তির এক-চতুর্থাংশ (১/৪) পাবেন।এ ক্ষেত্রেও স্ত্রীসংখ্যা বাড়লে সম্মিলিত অংশ বাড়ে না। বরং নির্ধারিত এক-চতুর্থাংশ অংশ স্ত্রীদের মধ্যে সমানভাবে ভাগ হয়।

অর্থাৎ, সন্তান না থাকা অবস্থায় একজন স্ত্রী থাকলে তিনি এক-চতুর্থাংশ পাবেন। দুই স্ত্রী থাকলে দুজন মিলে এক-চতুর্থাংশ পাবেন এবং প্রত্যেকে তার অর্ধেক করে পাবেন।

একজন পুরুষের কতজন স্ত্রী রয়েছে—এটি গুরুত্বপূর্ণ হলেও সম্পত্তির উত্তরাধিকার নির্ধারণে এটিই একমাত্র বিষয় নয়। মৃত ব্যক্তির সন্তান আছে কি না, ছেলে না মেয়ে, বাবা-মা জীবিত কি না এবং অন্যান্য বৈধ উত্তরাধিকারী কারা আছেন—এসব বিষয়ও হিসাবের মধ্যে আসে।

তাই শুধু ‘দুই স্ত্রী থাকলে অর্ধেক অর্ধেক’ বা ‘চার স্ত্রী থাকলে চার ভাগ’—এভাবে সরাসরি হিসাব করা ঠিক নয়। প্রথমে মৃত ব্যক্তির মোট উত্তরাধিকারী নির্ধারণ করতে হয়। এরপর আইন অনুযায়ী প্রত্যেকের অংশ হিসাব করা হয়।

আইনজীবীদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি জীবিত থাকা অবস্থায় তার উত্তরাধিকারীদের জন্য সম্পত্তির অংশ তৈরি হয় না। তিনি জীবিত থাকাকালে তার নিজের সম্পত্তি বিক্রি, হেবা বা বৈধভাবে দান করতে পারেন।

উত্তরাধিকার সৃষ্টি হয় তার মৃত্যুর পর। তখন তার রেখে যাওয়া সম্পত্তি আইন অনুযায়ী বৈধ উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বণ্টনের প্রশ্ন আসে।

তবে জীবদ্দশায় করা কোনো দান, হেবা বা সম্পত্তি হস্তান্তর বৈধ কি না—তা আলাদা আইনি প্রশ্ন। এ ধরনের দলিল থাকলে সম্পত্তি বণ্টনের আগে সেটির বৈধতা যাচাই করা প্রয়োজন।

মুসলিম আইনে কোনো স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার পর স্বামী মারা গেলে সাধারণত তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রী উত্তরাধিকারী হিসেবে স্বামীর সম্পত্তির অংশ পান না, যদি মৃত্যুর সময় বৈধ দাম্পত্য সম্পর্ক না থাকে।

তবে তার পাওনা দেনমোহর বা প্রযোজ্য ভরণপোষণের বিষয় আলাদা। অন্যদিকে, ওই স্ত্রীর ঘরে জন্ম নেওয়া মৃত ব্যক্তির সন্তান বাবার বৈধ সন্তান হলে বাবার সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হতে পারে।অর্থাৎ স্ত্রী উত্তরাধিকার থেকে বাদ পড়লেও তার সন্তান বাবার উত্তরাধিকার থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাদ পড়ে না।

হিন্দু আইনে পরিস্থিতি ভিন্ন

বাংলাদেশে হিন্দু উত্তরাধিকার আইনের কাঠামো মুসলিম আইনের মতো নয়। প্রচলিতভাবে হিন্দু উত্তরাধিকারে দায়ভাগ পদ্ধতির প্রভাব রয়েছে।

আইনজীবীদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, হিন্দু পুরুষের একাধিক বিয়ের ক্ষেত্রে প্রথম স্ত্রী জীবিত থাকা অবস্থায় পরবর্তী বিয়ের বৈধতা নিয়ে গুরুতর আইনি প্রশ্ন তৈরি হয়। প্রথম বিবাহ বহাল থাকা অবস্থায় দ্বিতীয় বিয়ে করলে তা দ্বিবিবাহ বা বাইগ্যামির আইনি জটিলতার জন্ম দিতে পারে।

এ কারণে দ্বিতীয় স্ত্রী সাধারণত প্রথম স্ত্রীর মতো উত্তরাধিকারী হিসেবে একই অধিকার দাবি করতে পারেন না। তবে দ্বিতীয় স্ত্রীর সন্তানদের অধিকার নিয়ে আলাদা আইনি বিধান ও ব্যাখ্যা রয়েছে।

হিন্দু বিধবার সম্পত্তির অধিকারও মুসলিম বিধবার অধিকার থেকে ভিন্ন। ঐতিহাসিকভাবে হিন্দু বিধবার সম্পত্তিতে ‘জীবনস্বত্ব’-এর ধারণা ছিল। অর্থাৎ নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে তিনি সম্পত্তি ভোগ করতে পারলেও সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষমতা সীমিত ছিল। তবে সংশ্লিষ্ট আইন ও পরবর্তী বিচারিক ব্যাখ্যার কারণে বাস্তব প্রয়োগের ক্ষেত্রে বিষয়টি অত্যন্ত জটিল।

খ্রিস্টানদের ক্ষেত্রে বহুবিবাহের সুযোগ নেই

খ্রিস্টান পারিবারিক আইনে একই সময়ে একাধিক বিবাহের অনুমতি নেই। ফলে একজন খ্রিস্টান পুরুষের একাধিক স্ত্রী থাকার পরিস্থিতি আইনগতভাবে স্বাভাবিক উত্তরাধিকার কাঠামোর মধ্যে পড়ে না।

তবে বৈধ স্ত্রী স্বামীর মৃত্যুর পর আইন অনুযায়ী সম্পত্তিতে অংশ পাওয়ার অধিকারী হতে পারেন। তার অংশ নির্ধারণের ক্ষেত্রে সন্তানসহ অন্যান্য উত্তরাধিকারীর অবস্থাও বিবেচনা করা হয়।

বৌদ্ধদের উত্তরাধিকার

বাংলাদেশে বৌদ্ধদের উত্তরাধিকার আইনের ক্ষেত্রে ঐতিহাসিকভাবে হিন্দু আইনের বিধান অনুসরণের বিষয়টি আলোচনায় আসে। ফলে বৌদ্ধ পুরুষের একাধিক বিয়ে এবং পরবর্তী উত্তরাধিকার নির্ধারণেও হিন্দু আইনসংক্রান্ত বিধান ও বিচারিক ব্যাখ্যার প্রভাব রয়েছে।

একাধিক স্ত্রী থাকলে সম্পত্তি ভাগের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—স্ত্রীরা মিলে একটি নির্দিষ্ট অংশ পান; স্ত্রীসংখ্যা বাড়লে সেই মোট অংশ বাড়ে না।

মুসলিম আইনে সংক্ষেপে বিষয়টি এভাবে বোঝা যায়—

সন্তান থাকলে: সব স্ত্রী মিলে স্বামীর সম্পত্তির ১/৮ অংশ পাবেন।

সন্তান না থাকলে: সব স্ত্রী মিলে ১/৪ অংশ পাবেন।

একাধিক স্ত্রী থাকলে: নির্ধারিত ওই অংশ স্ত্রীদের মধ্যে সমানভাবে ভাগ হবে।

তবে: সম্পত্তির চূড়ান্ত বণ্টনে সন্তান, বাবা-মা ও অন্যান্য বৈধ উত্তরাধিকারীর উপস্থিতি অনুযায়ী অবশিষ্ট সম্পত্তির হিসাবও করতে হবে।

তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রী: সাধারণভাবে মৃত্যুর সময় বৈধ দাম্পত্য সম্পর্ক না থাকলে উত্তরাধিকারী হন না; তবে দেনমোহরসহ অন্যান্য পাওনা আলাদা বিষয়।

তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রীর সন্তান: মৃত ব্যক্তির বৈধ সন্তান হলে বাবার সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হতে পারে।

তবে বাস্তবে কোনো ব্যক্তির সম্পত্তি বণ্টনের আগে তার মৃত্যুর সময়কার বৈবাহিক অবস্থা, বৈধ উত্তরাধিকারী, সম্পত্তির ধরন, দলিলপত্র, হেবা বা দানের ইতিহাস এবং প্রযোজ্য ব্যক্তিগত আইন যাচাই করা জরুরি। তাই নির্দিষ্ট কোনো পরিবারের সম্পত্তি ভাগের ক্ষেত্রে সাধারণ নিয়ম দেখে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না নিয়ে সংশ্লিষ্ট আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।

মুয়াজ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

ধর্ম ও জীবন এর সর্বশেষ খবর

ধর্ম ও জীবন - এর সব খবর



রে