×
ঢাকা, শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তি সত্ত্বেও বদলে গেলো পৃথিবীর মানচিত্র!

২০২৬ সেপ্টেম্বর ১২ ১০:১৯:০৪
যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তি সত্ত্বেও বদলে গেলো পৃথিবীর মানচিত্র!

নিজস্ব প্রতিবেদক : পৃথিবীর মানচিত্র নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্কে এবার নতুন মোড় এসেছে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ‘Correct the Map’ নামে একটি প্রস্তাব গ্রহণ করেছে, যার লক্ষ্য হলো বিশ্ব মানচিত্রে দেশ ও মহাদেশগুলোর আয়তনকে আরও বাস্তবসম্মতভাবে উপস্থাপনের জন্য বিকল্প মানচিত্র-প্রজেকশন ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া। ভোটাভুটিতে ১৬৪টি দেশ প্রস্তাবের পক্ষে অবস্থান নেয়, ছয়টি দেশ ভোটদানে বিরত থাকে এবং যুক্তরাষ্ট্র একমাত্র দেশ হিসেবে এর বিরোধিতা করে। ফলে ঘটনাটি শুধু মানচিত্রের প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং এটি আন্তর্জাতিক রাজনীতি, ঔপনিবেশিক ইতিহাস এবং বিশ্বকে উপস্থাপনের ক্ষমতা নিয়েও নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে।

এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—পৃথিবীর দেশগুলোর সীমানা বা ভৌগোলিক আয়তন বদলে যায়নি। পরিবর্তনের বিষয়টি মূলত মানচিত্রে পৃথিবীকে কীভাবে দেখানো হবে তা নিয়ে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বহুল ব্যবহৃত মার্কেটর প্রজেকশনে উত্তর ও দক্ষিণ মেরুর দিকে থাকা ভূখণ্ডগুলো বাস্তবের তুলনায় অনেক বড় দেখায়। ফলে গ্রিনল্যান্ডকে আফ্রিকার কাছাকাছি বিশাল মনে হয়, যদিও বাস্তবে আফ্রিকার আয়তন গ্রিনল্যান্ডের প্রায় ১৪ গুণ। একই কারণে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার কিছু অংশও মানচিত্রে তাদের প্রকৃত আয়তনের তুলনায় বড় দেখায়। নতুন উদ্যোগে আয়তনকে তুলনামূলকভাবে সঠিকভাবে উপস্থাপন করতে Equal Earth-এর মতো equal-area projection ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

এই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে জেরার্ডাস মার্কেটারের ১৫৬৯ সালের প্রজেকশন। মার্কেটর মূলত এমন একটি মানচিত্র তৈরি করেছিলেন যা সমুদ্রযাত্রায় দিক নির্ধারণের ক্ষেত্রে অত্যন্ত কার্যকর ছিল। অর্থাৎ এর প্রধান উদ্দেশ্য ছিল নেভিগেশন, মহাদেশের আয়তনকে রাজনৈতিকভাবে বড় বা ছোট করে দেখানো নয়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে এই মানচিত্র বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে পরিচিত মানচিত্রগুলোর একটি হয়ে ওঠে। স্কুলের বই, দেয়ালের মানচিত্র, সংবাদমাধ্যম এবং বিভিন্ন শিক্ষামূলক উপকরণে এর ব্যাপক ব্যবহার মানুষের পৃথিবী সম্পর্কে একটি নির্দিষ্ট ভিজ্যুয়াল ধারণা তৈরি করে। পরবর্তী সময়ে সমালোচকেরা প্রশ্ন তোলেন, এই উপস্থাপন কি অনিচ্ছাকৃতভাবে ইউরোপ ও উত্তরাঞ্চলীয় দেশগুলোকে বড় এবং আফ্রিকা ও বিষুবীয় অঞ্চলকে তুলনামূলক ছোট হিসেবে দেখিয়ে একটি ইউরোপকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গিকে শক্তিশালী করেছে?

‘Correct the Map’ উদ্যোগের অন্যতম চালিকাশক্তি আফ্রিকান ইউনিয়ন। আফ্রিকার দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে, প্রচলিত মানচিত্রে মহাদেশটির বিশাল আয়তন যথাযথভাবে দৃশ্যমান হয় না। আফ্রিকা প্রায় ৩০.৩৭ মিলিয়ন বর্গকিলোমিটার এলাকা নিয়ে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মহাদেশ। কিন্তু মার্কেটর প্রজেকশনে এর প্রকৃত বিশালতা অনেকটাই আড়ালে চলে যায়। নতুন equal-area ধরনের মানচিত্রে আফ্রিকার আকার অনেক বেশি বাস্তবসম্মতভাবে দৃশ্যমান হয়। এই পরিবর্তনের সমর্থকদের মতে, এটি শুধু গাণিতিক সংশোধন নয়; বরং বিশ্ববাসীর কাছে আফ্রিকার প্রকৃত ভৌগোলিক গুরুত্ব তুলে ধরার একটি প্রতীকী পদক্ষেপ।

ভোটাভুটিতে যুক্তরাষ্ট্র একমাত্র বিরোধী দেশ হওয়ায় বিষয়টি আরও আলোচনায় এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের জাতিসংঘ মিশন ভোটের আগে ‘Correct the Map’ প্রস্তাব নিয়ে নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছিল। সমালোচকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র এই উদ্যোগকে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি রাজনৈতিক ও আদর্শিক প্রকল্প হিসেবে দেখেছে। অন্যদিকে প্রস্তাবের সমর্থকদের যুক্তি হলো, মানচিত্রের বিকৃতি সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করা এবং আরও ভারসাম্যপূর্ণ মানচিত্র ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া কোনো দেশের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক পদক্ষেপ নয়; বরং বৈশ্বিক তথ্য উপস্থাপনের ক্ষেত্রে অধিক বাস্তবসম্মত পদ্ধতির দিকে যাওয়া।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের এই সিদ্ধান্তকে এমনভাবে দেখা ঠিক হবে না যে পরদিন থেকেই পৃথিবীর সব স্কুল, গুগল ম্যাপ বা বিশ্বের সব মানচিত্রে একই নতুন নকশা বাধ্যতামূলক হয়ে গেছে। সাধারণ পরিষদের অধিকাংশ প্রস্তাব সদস্যরাষ্ট্রের জন্য আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক নয়। এই উদ্যোগ মূলত একটি আন্তর্জাতিক নীতিগত ও প্রতীকী দিকনির্দেশনা তৈরি করেছে—বিশ্বের ভূগোল উপস্থাপনের ক্ষেত্রে আরও বাস্তবসম্মত প্রজেকশন ব্যবহারের জন্য। বিভিন্ন কাজের জন্য বিভিন্ন প্রজেকশন প্রয়োজন হতে পারে। নেভিগেশনে মার্কেটর এখনও কার্যকর হতে পারে, আবার মহাদেশের আয়তন তুলনার ক্ষেত্রে Equal Earth-এর মতো প্রজেকশন বেশি উপযোগী।

মানচিত্রকে সাধারণত নিরপেক্ষ তথ্যের ছবি মনে হলেও বাস্তবে কোন বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হবে, কোন প্রজেকশন ব্যবহার করা হবে এবং কোন অঞ্চলকে কীভাবে দেখানো হবে—এসব সিদ্ধান্তের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি থাকে। ঔপনিবেশিক যুগে ইউরোপীয় শক্তিগুলো পৃথিবীর বিশাল অংশ নিয়ন্ত্রণ করত। সেই সময়ে ইউরোপীয় নৌযাত্রা, বাণিজ্য ও সাম্রাজ্য বিস্তারের সঙ্গে মানচিত্র তৈরিরও ব্যাপক উন্নতি ঘটে। ফলে মানচিত্রের ইতিহাসকে ঔপনিবেশিক ইতিহাস থেকে পুরোপুরি আলাদা করা যায় না। যদিও মার্কেটর প্রজেকশনের মূল উদ্দেশ্য ছিল নেভিগেশন, এর দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহার পৃথিবীকে কীভাবে দেখা হয়, সেই মানসিক কাঠামোর ওপর প্রভাব ফেলেছে—এমন যুক্তিই এখন সামনে আনা হচ্ছে।

নতুন মানচিত্র নিয়ে ইতোমধ্যে অন্য দেশগুলোরও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। জাপান নতুন মানচিত্রে রাশিয়ার সঙ্গে বিতর্কিত কুরিল দ্বীপপুঞ্জের রঙ ব্যবহারের বিষয়টি নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে। টোকিওর আশঙ্কা, এমন উপস্থাপনাকে কেউ ভুলভাবে রাশিয়ার সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি হিসেবে ব্যাখ্যা করতে পারে। অর্থাৎ মানচিত্রে রঙ, সীমারেখা কিংবা ভূখণ্ডের অবস্থান—এসবও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয় হয়ে উঠতে পারে।

নতুন মানচিত্রে ভারত ও বাংলাদেশও বড় দেখাবে,Equal Earth-এর মতো আয়তন-সঠিক প্রজেকশন ব্যবহার করলে শুধু আফ্রিকাই বড় দেখাবে না; বিষুবরেখার কাছাকাছি ও মধ্য অক্ষাংশের অনেক দেশও তাদের বাস্তব আয়তনের তুলনায় আরও যথাযথভাবে দৃশ্যমান হবে। ভারতীয় উপমহাদেশের ক্ষেত্রেও পার্থক্যটি চোখে পড়বে। ফলে এশিয়া, আফ্রিকা ও অন্যান্য Global South অঞ্চলের ভূখণ্ডকে মানচিত্রে তুলনামূলকভাবে বড় ও বাস্তবসম্মতভাবে দেখা যাবে। এতে বিশ্ব সম্পর্কে মানুষের প্রচলিত ভিজ্যুয়াল ধারণায় পরিবর্তন আসতে পারে।

নতুন মানচিত্র আফ্রিকাকে বড় দেখালেও আফ্রিকার অর্থনৈতিক, সামরিক বা রাজনৈতিক ক্ষমতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাড়বে না। একইভাবে ইউরোপ বা উত্তর আমেরিকা মানচিত্রে তুলনামূলক ছোট দেখালেই তাদের বাস্তব বৈশ্বিক প্রভাব কমে যাবে না। তবে সমর্থকদের বক্তব্য হলো, মানুষের চিন্তায় প্রতীকী উপস্থাপনার গুরুত্ব রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে যদি কোনো অঞ্চলকে ছোট, প্রান্তিক বা কম গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হওয়ার মতো ভিজ্যুয়াল কাঠামো ব্যবহার করা হয়, তাহলে সেটি ধীরে ধীরে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ধারণাকে প্রভাবিত করতে পারে। সেই জায়গা থেকেই ‘Correct the Map’ উদ্যোগকে অনেকে একটি প্রতীকী সংশোধন হিসেবে দেখছেন।

সব মিলিয়ে, যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তি সত্ত্বেও জাতিসংঘের ‘Correct the Map’ উদ্যোগ বিশ্ব মানচিত্র নিয়ে পুরোনো ধারণায় বড় একটি প্রশ্ন তুলেছে। পৃথিবীর ভৌগোলিক বাস্তবতা বদলায়নি, বদলেছে সেটিকে উপস্থাপনের পদ্ধতি নিয়ে আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গি। ১৫৬৯ সালের নেভিগেশন-নির্ভর মার্কেটর প্রজেকশনের জায়গায় আয়তনকে আরও বাস্তবসম্মতভাবে দেখানোর দাবি এখন বৈশ্বিক আলোচনার কেন্দ্রে। তাই এই ঘটনা শুধু ‘নতুন মানচিত্র’ তৈরির গল্প নয়—এটি একই সঙ্গে ইতিহাস, ভূগোল, ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার এবং বিশ্বকে দেখার ক্ষমতা নিয়ে একটি বড় আন্তর্জাতিক বিতর্ক।

মুয়াজ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

আন্তর্জাতিক এর সর্বশেষ খবর

আন্তর্জাতিক - এর সব খবর



রে