×
ঢাকা, শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

১২ টাকার বিদ্যুৎ ৪ টাকায়, ছাদ বিক্রি করছে বিদ্যুৎ

২০২৬ সেপ্টেম্বর ১২ ১০:০৫:৫৮
১২ টাকার বিদ্যুৎ ৪ টাকায়, ছাদ বিক্রি করছে বিদ্যুৎ

নিজস্ব প্রতিবেদক : বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ধীরে ধীরে বড় ধরনের পরিবর্তন আনছে সৌরশক্তি। জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহে ঘাটতি কিংবা আকস্মিক বিভ্রাট দেখা দিলে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে শিল্পকারখানায়। বিশেষ করে রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানা, বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও উৎপাদননির্ভর কারখানাগুলোর জন্য কয়েক ঘণ্টার বিদ্যুৎ বিভ্রাটও বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির কারণ হতে পারে। এই বাস্তবতায় অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান এখন জাতীয় গ্রিডের পাশাপাশি নিজস্ব ছাদকে বিকল্প বিদ্যুৎ উৎপাদনের উৎস হিসেবে ব্যবহার করছে। দেশের শিল্প খাতে ইতোমধ্যে ৬০০ মেগাওয়াটের বেশি রুফটপ সোলার বা ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপিত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট তথ্য থেকে জানা যাচ্ছে। অর্থাৎ, শিল্পকারখানার বিশাল ছাদগুলো এখন শুধু ভবনের অংশ নয়, বরং ক্রমেই ছোট ছোট বিদ্যুৎকেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে।

শিল্প খাতে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহারকে শুধু বিদ্যুৎ বিল কমানোর উদ্যোগ হিসেবে দেখলে এর পুরো অর্থনৈতিক গুরুত্ব বোঝা যাবে না। বরং অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কাছে এটি উৎপাদন সচল রাখার একটি কৌশল। জাতীয় গ্রিড থেকে সরবরাহে সমস্যা দেখা দিলে নিজস্ব সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠানগুলোকে আংশিকভাবে হলেও বিকল্প জোগান দিতে পারে। ফলে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমে এবং বিদ্যুৎ সরবরাহের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীলতা কিছুটা কমে আসে। দিনের বেলায় সূর্যের আলো কাজে লাগিয়ে উৎপাদিত বিদ্যুৎ সরাসরি কারখানার বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ও কার্যক্রমে ব্যবহার করা সম্ভব হওয়ায় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য এটি দীর্ঘমেয়াদি ব্যয় সাশ্রয়ের সুযোগও তৈরি করছে।

দেশের বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলো ইতোমধ্যে এই প্রবণতায় যুক্ত হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে ওয়ালটন গ্রুপের কারখানাগুলোতে প্রায় ৩২ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে , যা প্রতিষ্ঠানটির মোট বিদ্যুৎ চাহিদার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ পূরণ করছে। একইভাবে আকিজ বশির গ্রুপসহ বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান তাদের কারখানার ছাদে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করছে। এর ফলে শিল্পকারখানাগুলো একদিকে নিজেদের বিদ্যুৎ ব্যয়ের চাপ কমাতে পারছে, অন্যদিকে জ্বালানি সরবরাহের ঝুঁকিও কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছে। রপ্তানিমুখী শিল্পের ক্ষেত্রে এর আরেকটি সুবিধা হলো, উৎপাদন প্রক্রিয়ায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়লে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ব্যবস্থার প্রমাণ দেখানো সহজ হয়।

সৌরবিদ্যুতে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর আগ্রহ বাড়ার অন্যতম কারণ এর সম্ভাব্য উৎপাদন ব্যয়। দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জাতীয় গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ নিতে প্রতি ইউনিটে প্রায় ১২ টাকা ৮৫ পয়সা খরচ হলেও সৌর প্যানেল থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের ইউনিটপ্রতি ব্যয় প্রায় ৪ টাকা ২০ পয়সার মতো হতে পারে। অর্থাৎ দীর্ঘমেয়াদে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের মাধ্যমে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ সাশ্রয় করতে পারে। প্রাথমিকভাবে সৌর প্যানেল, ইনভার্টার, স্থাপনা ও অন্যান্য সরঞ্জামের জন্য বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন হলেও দীর্ঘ সময় ধরে উৎপাদন চালিয়ে গেলে সেই বিনিয়োগের অর্থ উঠে আসার সম্ভাবনা থাকে। প্রদত্ত হিসাব অনুযায়ী, যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রায় আড়াই বছরের মধ্যে প্রাথমিক বিনিয়োগ ফেরত আসার সুযোগ রয়েছে। তবে প্রকৃত পে-ব্যাক সময় নির্ভর করবে স্থাপনার আকার, সৌর বিকিরণ, যন্ত্রপাতির মান, রক্ষণাবেক্ষণ এবং প্রতিষ্ঠানের বিদ্যুৎ ব্যবহারের ধরনসহ বিভিন্ন বিষয়ের ওপর।

শিল্প খাতে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়াতে সরকারের পক্ষ থেকেও বিভিন্ন নীতিগত উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সরকারি ভবন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও হাসপাতালের ছাদে রুফটপ সোলার স্থাপনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি নেট মিটারিং ব্যবস্থার মাধ্যমে অতিরিক্ত সৌরবিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের সুযোগও তৈরি হয়েছে। ২০২৫ সালের নেট মিটারিং নির্দেশিকার আওতায় শিল্পপ্রতিষ্ঠান থেকে গ্রিডে সরবরাহ করা সৌরবিদ্যুতের জন্য ইউনিটপ্রতি ১০ টাকা ৫০ পয়সা পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এর ফলে কোনো প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ব্যবহারের পর অতিরিক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদিত হলে সেটিকে শুধু অপচয় না করে গ্রিডে সরবরাহ করে আর্থিক সুবিধা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। একই সঙ্গে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে কর ও অন্যান্য নীতিগত সুবিধা দেওয়ার উদ্যোগ শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগে আরও উৎসাহিত করতে পারে।

সৌরবিদ্যুতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো এটি শুধু নতুন শিল্পকারখানার জন্য নয়, দীর্ঘদিন ধরে লোকসানে থাকা পুরোনো শিল্পগুলোর ক্ষেত্রেও ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি করতে পারে। চিনি, খাদ্যসহ বিদ্যুৎনির্ভর বিভিন্ন ভারী শিল্পে জ্বালানি ব্যয় উৎপাদন খরচের একটি বড় অংশ। এসব কারখানায় আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে সৌরবিদ্যুৎ যুক্ত করা গেলে বিদ্যুৎ ব্যয় কমানো এবং উৎপাদন দক্ষতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে আখ বা অন্যান্য কৃষিপণ্যের উপজাত থেকে বিদ্যুৎ ও জৈব জ্বালানি উৎপাদনের মতো বহুমুখী উদ্যোগের সঙ্গে সৌরশক্তিকে যুক্ত করা গেলে একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের আয় ও সাশ্রয়ের একাধিক উৎস তৈরি হতে পারে।

বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের জন্য সৌরবিদ্যুতের গুরুত্ব শুধু অর্থনৈতিক নয়, আন্তর্জাতিক বাজারের দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের বড় ব্র্যান্ড ও ক্রেতারা এখন পণ্য উৎপাদনের সময় পরিবেশের ওপর প্রভাব, কার্বন নিঃসরণ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহারকে গুরুত্ব দিচ্ছে। ফলে বাংলাদেশের কারখানাগুলো যদি সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার বাড়াতে পারে, তাহলে তারা নিজেদের ‘গ্রিন ফ্যাক্টরি’ হিসেবে আরও শক্তিশালীভাবে উপস্থাপন করতে পারবে। এতে পরিবেশবান্ধব উৎপাদনের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণে সহায়তা মিলতে পারে এবং বিদেশি ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশের পণ্যের গ্রহণযোগ্যতাও বাড়তে পারে। বিশেষ করে পোশাক শিল্পের মতো রপ্তানিনির্ভর খাতে এ ধরনের বিনিয়োগ ভবিষ্যতে প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা দিতে পারে।

তবে সৌরশক্তির দ্রুত সম্প্রসারণের পথ পুরোপুরি চ্যালেঞ্জমুক্ত নয়। শিল্পকারখানার ছাদে বড় আকারের সৌর প্যানেল স্থাপনের জন্য প্রাথমিক বিনিয়োগ প্রয়োজন। পাশাপাশি পুরোনো ভবনের ছাদ কতটা ভার বহন করতে পারবে, যন্ত্রপাতির নিরাপত্তা, নিয়মিত পরিষ্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ, ইনভার্টারের কার্যক্ষমতা এবং সৌরবিদ্যুতের ওঠানামা ব্যবস্থাপনার মতো বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। শুধু প্যানেল স্থাপন করলেই কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যাবে না; দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করাও জরুরি। নেট মিটারিং ব্যবস্থার কার্যকারিতা, গ্রিডে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ গ্রহণের সক্ষমতা এবং বিদ্যুৎ ক্রয়-বিক্রয়ের নিয়মও বিনিয়োগকারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে।

সব মিলিয়ে বাংলাদেশের শিল্পখাতে সৌরবিদ্যুতের বিস্তারকে কেবল বিকল্প বিদ্যুতের ব্যবহার হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি একই সঙ্গে উৎপাদন ব্যয় কমানো, বিদ্যুৎ সরবরাহের ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ, শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানো এবং পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে তোলার একটি বড় সুযোগ। শিল্পকারখানার অব্যবহৃত ছাদ যদি বিদ্যুৎ উৎপাদনে কাজে লাগানো যায় এবং অতিরিক্ত বিদ্যুৎ নেট মিটারিংয়ের মাধ্যমে গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হয়, তাহলে ভবিষ্যতে হাজার হাজার শিল্পপ্রতিষ্ঠান নিজেদের আংশিক বিদ্যুৎ চাহিদা নিজেরাই পূরণ করতে পারবে। এর ফলে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কিছুটা কমতে পারে এবং জ্বালানি আমদানিনির্ভরতার ক্ষেত্রেও দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। সঠিক নীতি, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে সৌরশক্তি বাংলাদেশের শিল্প অর্থনীতির জন্য শুধু পরিবেশবান্ধব বিকল্প নয়, বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ নতুন অর্থনৈতিক মডেলে পরিণত হতে পারে।

মুয়াজ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

জাতীয় এর সর্বশেষ খবর

জাতীয় - এর সব খবর



রে